সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ ॥ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ফ হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ ১৯৯০ সন থেকে কাজ করে যাচ্ছে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। হাক্কানী মিশনের আহবান ‘সত্য বলুন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হোন, নিজে বাঁচুন দেশ ও জাতিকে বাঁচান।’ যে কোন জিনিসের একটা শুরু থাকে-থাকতেই হয়, শুরুর আগেও শুরু থাকে। কারণের পিছনেও কারণ থাকে, মূলে থাকে শুধু একটি কারণ। দৃশ্যমান কারণগুলো নিয়েই আমাদের যত কারবার। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যপারগুলো নিয়েই আমাদের গবেষনা। গবেষনায় কোন তথ্য উপাত্তই বাদ দেয়া যায়না। গবেষণায় সততা এবং স্বতস্ফুর্ততা থাকতে হয় তাহলেই কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যায়।

সত্য শাশ^ত, অপরিবর্তনীয়, চিরন্তন, এক, অদ্বিতীয়, অখন্ড এবং সবসময়ই বর্তমান। কিন্তু তার প্রকাশ বিকাশ বহুরূপে বহুভাবে যা বিজ্ঞানময় ও পরিবর্তন-বিবর্তন-রূপান্তরের মাধ্যমে গতিশীল। সত্য নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। বহুবিচিত্র, বিজ্ঞানময়, সত্যের প্রকাশিত, বিকশিত এই অবস্থা নিয়েই যত বিতর্ক।

ব্যক্তি থেকেই সবকিছুর শুরু। ব্যক্তি সত্য না হলে তার দ্বারা সত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। কাজেই যে কোন সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি সত্য প্রতিষ্ঠা করবেন -তার নিজের সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রাথমিক শর্ত। বিশ^ব্রহ্মান্ডে এমন কোন বস্তু নাই যার মধ্যে সত্য নাই। এমন কোন মানুষ নাই যার মধ্যে সত্য নাই। প্রজাতি হিসাবে মানুষ সত্য কিন্ত নিজের সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নয় তাই আহবান এসেছে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। তাদের জন্য এ আহবান যারা সত্যকে জীবনের লক্ষ্য  করে নিয়েছেন।

হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে প্রকাশিত হয় হাক্কানী সাধকদের সাধনালব্ধ ফসল। যা প্রকাশিত হয় বানীরূপে, অমৃতকথারূপে, নানানভাবে, নানান রূপে, নানান ছন্দে আসে আমাদের কাছে। প্রতিটি বানী এক একটি রাস্তা আমাদের জন্য। অন্তত একটি বানী নিজের জীবনে একশ ভাগ রূপায়িত করতে পারলে সত্যে নিয়ে যাবে। প্রতিটি বানীর সঙ্গেই রয়েছে মূলের সম্পর্ক, সত্যের সম্পর্ক। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে বহু উপদেশবাণী পেয়েছি আমরা সত্য এবং সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া নিয়ে।

সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিন শাহ কলন্দর গাউস পাকের বানী ‘সত্য দেখার আগে সত্য নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা শ্রেয়’।

‘তুমি প্রতিটি কর্মের মধ্যে সত্যকে অন্বেষণ কর তাহলে তোমার এবাদতের দ্বার খুলে যাবে’।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বানী।

‘দর্শন আর উপলব্ধিতে হয় সত্য অন্যের কথায় নয়’।

‘জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিথ্যাকে ধ্বংস এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্রতী হওয়ার জিহাদে রত থাকলে আত্মিক উন্নতি হবেই হবে’।

সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ এঁর বাণী-

‘সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্ম করলে সত্য আপেক্ষিক না’ ‘নিজেকে একটি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে আস্তে আস্তে এক এক করে সব সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে’।

‘সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে তবেই বিশ্বাসী হওয়া যাবে’।

‘সত্যের পূজা চিরস্থায়ী ও চিরঞ্জীব রাখে, শক্তির পূজা ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংস করে’।

‘সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্ম করলে সত্য আপেক্ষিক না’।

‘প্রত্যেকটি কর্মের মধ্যে একটি সত্য আছে, সেই সত্যকে ধারণ করতে পারলেই ওই কর্মে দিব্যজ্ঞানী হবে’।

‘ব্যক্তি জীবনে একজনের কাছে সত্যবাদী হলে সে শান্তির পথ খুঁজে পাবে’।

‘সংস্কারমুক্ত হয়ে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠার পথে পা বাড়াও তুমি তোমার আল্লাহ্র রহমত হতে বঞ্চিত হবে না’।

‘হাক্কানীর শক্তি হলো একটা সেটা হলো সত্য’।

‘সত্য একটা ‘আমি’ প্রত্যেকের ‘আমি’।’

‘জ্ঞানেরও শেষ নেই, প্রেমেরও শেষ নেই, সত্যেরও শেষ নেই, আবার এই তিনটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত’।

‘সত্য বলুন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠত হোন নিজে বাঁচুন দেশ ও জাতিকে বাঁচান’।

‘সত্য মানুষ হোন দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’। নিজের সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন কঠিন সাধনার।

ইচ্ছাশক্তি পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শক্তি। ইচ্ছাশক্তির বলে অসাধ্য সাধন করা যায়। ইচ্ছাশক্তি সমস্ত শক্তিগুলোকে উজ্জিবীত করে লক্ষ্য পানে ধাবিত করে।

স্বেচ্ছাশ্রম ছাড়া সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায়না। স্বেচ্ছাশ্রমে সতস্ফুর্ততা থাকে, থাকে আনন্দ, থাকে আন্তরিকতা, থাকে তৃপ্তি, থাকে গতি, পথের ভার কমিয়ে দেয় স্বেচ্ছাশ্রম। মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ব করে :

১. ভালোলাগা -ভালোবাসা – ভক্তি।

২.মানবতাবোধ মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

৩.ধর্ম মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

৪.দায়িত্ব কর্তব্যবোধ মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

৫.কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

৬.অভ্যাস মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

৭.পরিবেশ মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

৮.সিদ্ধান্ত মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

৯.সুনির্দিষ্ফ লক্ষ্য মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

১০.হৃদয়ের তাগিদ মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

১১.সত্য মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

১২. অভাববোধ মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

১৩.আদর্শের প্রতি ভালোবাসা মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে

উদ্বুদ্ধ করে।

১৪.পূর্নতার আকাঙ্খা মানুষকে স্বেচ্ছশ্রমে তাড়িত করে।

১৫.বিকশিত হওয়ার আকাঙ্খাও মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে তাড়িত করে।

১৬.সৃজনশীলতাও মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমকে উদ্বুদ্ধ করে।

১৭.সুকুমার বৃত্তিগুলোও মানুষকে স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে।

সবচেয়ে বেশী স্বেচ্ছাশ্রম হয় চিন্তার জগতে যা থামানো যায়না স্বয়ংক্রিয় চলতেই থাকে। চিন্তার জগতের চেয়ে জটিল বোধহয় পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। এমন উশৃঙ্খলতা আর কিছুতে নেই। একে থামানো যায়না তবে সুবিন্যস্ত করা যায়, করা প্রয়োজন। বৃষ্ফির পানিতে যেমন বাধ দেয়া যায়না-চিন্তার জগতেও তেমনি কোন বাঁধ দেয়া যায়না। চিন্তার জগতে বাঁধ দিতে গেলে তা আরও বেড়ে যায়, তা আরও গেড়ে বসে। চিন্তার জগতকে মুক্ত করে রাখতে হয়। প্রতিনিয়ত সচেতন থাকতে হয়। প্রতিনিয়ত বিচার  করে পথ চলতে হয়। তাহলেই পাওয়া যায় সঠিক পথ ও পদ্ধতী। যত বিচার বিশ্লেষণ ততই সূক্ষতায় যাওয়া। সূক্ষতাই সত্যের পথ। সূক্ষতার শেষ যেখানে সত্য সেখানে বিরাজমান, বিদ্যমান, একাকার এক অখন্ড সত্তায়।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বললেন ‘আমি যারে চাই তার ভাবের অন্ত নাই, আমি যারে পাই তার রূপের অন্ত নাই’।

সত্য এক আমরা দেখি বহু। সত্যের এই বিজ্ঞানময় প্রকাশ-বিকাশে বৈচিত্রের কোন শেষ নেই। কুল কিনারা নেই। মানুষ তাই সত্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কুল কিনারা হারিয়ে ফেলে। বৈচিত্রের মাঝে এক যেভাবে চিহ্নিত করা যায় অন্য কোনভাবে নয়। এক এর গুরুত্ব তাৎপর্য সুস্পষ্ফ হয়ে ওঠে বৈচিত্রের মাঝে। এক সত্য যা দিয়ে ঢাকা তার মধ্যেই রয়েছে এক সত্যে ঢোকার পথ ও পদ্ধতি, দরজা। প্যাকেটজাত খাবাররে গায়ে যেমন প্যাকেট খোলার নিয়ম থাকে তেমনি। খন্ডিত মানুষের কাছে বৈচিত্রের মাধ্যমেই সত্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে ওঠে, উপভোগ্য হয়ে ওঠে।  বৈচিত্রের মাঝেই সত্যের ব্যবহারিক রূপ, করনীয়, পথচলা সুস্পষ্ফ হয়ে ওঠে। আপেক্ষিক সত্য প্রকৃতির বিকৃতির অন্তর্ভূক্ত সমগ্র প্রকৃতির পূর্ণ রূপ হলো অব্যক্ত তার ব্যবহারিক হলো বৈচিত্রময় জীবজগৎ যা আপেক্ষিক সত্য এর অন্তর্ভূক্ত হলো প্রকৃতির সমগ্র স্থুল, সূক্ষ প্রকাশ ও বিকাশ। সমগ্র স্থুলের প্রাধান্যে যে ব্যবহার সিদ্ধ হয় তাহলো ব্যবহারিক সত্য এবং তা জাগ্রত অবস্থায় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভুত হয়। বৈচিত্রের মাঝেই আছে ভারসাম্যপূর্ণ প্রকাশ বিকাশের বিজ্ঞান। বৈচিত্রের মাঝেই অন্তহীন  ভাব ও রূপের প্রকাশ। বৈচিত্রকে অস্বীকার করা মানেই সত্যকে অস্বীকার করা, বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। বৈচিত্রেই হয় পরিপূর্ণ প্রকাশ বিকাশ। বৈচিত্রের মাঝেই চিহ্নিত করতে হয় এক, খুঁজে নিতে হয় এক। বৈচিত্রের মাঝে এক খুঁজে না পাওয়ার কারণেই এত বিভেদ, এত ধন্দ, এত সংঘাত। আবার এক এর মাঝে বৈচিত্র সুন্দর পরিপূর্ণ। শ্রেণীবিন্যাসটা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য হয়। অনুভুতিগ্রাহ্য হয়। রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করা যায়। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো যত তৃনমূল পর্যায়ে পৌছাতে পেরেছে ততই  তারা সারা বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে। শ্রমবিভাজন যেমনি করে মানুষের দক্ষতা বাড়ায়, অপচয় রোধ করে। শক্তির সুসামঞ্জস্য ব্যবহার নিশ্চিত করে। তেমনি সত্যের ব্যবহারিক রূপটাও তেমনি বৈচিত্র মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবহারের সুযোগ করে দেয় আমাদের।