সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য ১৮

‘সকল কর্মের প্রারম্ভেই তুমি তোমার আল্লাহ্কে অবশ্যই স্মরণ করিও।’

              – সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন

‘ক্ষেতের ইটা ক্ষেতেই ভাঙ্গতে হয়।’

              – সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

‘ঘুম ভাঙ্গার পর চোখ মেলার আগেই তোমার আল্লাহ্কে স্মরণ কর।’

              – সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক চলে যাওয়ার তিন দিন পূর্বে তাঁর ভাবশিষ্য সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ কে তিনটি কথা বলে গেলেন আর তা হলো:

‘* গায়ের চামড়াকে গন্ডারের চামড়া করে রাখবেন।

* তিন হাজার বছর আগের আর তিন হাজার বছর পরের চিন্তা করে কাজ করবেন।

* পথ খুলে রেখে গেলাম যতদূর যেতে চান যেতে পারবেন। ’

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ একদিন বলেছিলেন ‘এ কথা না বলে গেলে আমিও হয়তো এখানেই থেমে যেতাম’।

এত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বুঝে কার সাধ্য? তবুও এ পথতো জানা-বুঝা-চেনার পথ, প্রচেষ্টায় রত থাকতেই হবে। আর একবার চোখ বুলানো যাক সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর ‘হাক্কানী কথা’য় :-

‘সব অসুখ কি এক ব্যবস্থা পত্রে সারবে? চিন্তাজগতে আমরা একেকজন একেক রকমভাবে চিন্তা করব তবে কি এক নীতিতে আমরা চলতে পারবো? এইভাবে কতটুকু যাওয়া যাবে? যে সময় পৃথিবীতে ৫০ কোটি মানুষ ছিলো, সে সময় যে কাজটি করা গেছে, যে সময় পৃথিবীতে ১০ কোটি মানুষ ছিলো, সে সময় যে কাজটি করা গেছে, আজ ৭০০ কোটি মানুষের পৃথিবীতে কি সে কাজটি করা যাবে? একই পদ্ধতিতে? নাকি তার সংস্কার করতে হবে? প্রতিনিয়তই ব্যক্তির যে পরিবর্তন হচ্ছে ব্যক্তি সেটা ধরেনা, জানতেও চায় না। নিজের যে পরিবর্তন হচ্ছে, নিজের চিন্তারও যে পরিবর্তন হচ্ছে, নিজে অভ্যাসের দাস হয়ে যেগুলো করছে তার মধ্যেও যে পরিবর্তন হচ্ছে সেটাও উপলব্ধি করে না।

যখন কেউ এক সত্য ধরার জন্য সিদ্ধান্ত নিবে তখন জানতে হবে কোন একটা বিষয় বা ব্যক্তি, সে নিজের মধ্যে উপলব্ধি করে কিনা। সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু এক কে নিয়ে থাকার সিদ্ধান্তে আসতে পারছি কিনা। যারা হাক্কানীতে আসছেন তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যারা পার্থিব চাওয়া-পাওয়া নিয়ে দরবারে আসছেন, তাদের জন্য এটা প্রয়োজন নয়, তারা আসবেন, উপদেশ মানবেন, কাজ হবে। আবার আসবেন, কাজ সম্পন্ন হলে চলে যাবেন। এরকম হাজার হাজার মানুষ আসছে। লাখ লাখ মানুষ আসছে হাক্কানীর সব দরবারে, আর তাদের কার্য হাসিল করে চলেও যাচ্ছেন। কুরআনে বলা আছে-যে তার আল্লাহ্র দিকে এগিয়ে যাবে পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ কোনদিক থেকে সহযোগিতা আসবে তা তুমি জানোনা। তুমি আল্লাহর দিকে ধাবিত হও। আল্লাহ্ কি? এক। এক এ আমি কোন জায়গায় আছি? আমার চিন্তা কি এক-কে কেন্দ্র করে? আমার যে অভ্যাসগুলো গড়ে উঠছে তা কি এক-কে কেন্দ্র করে? আমার যে সম্পদ তা কি এক-কে কেন্দ্র করে? আমার যে বিদ্যা তা কি এক-কে কেন্দ্র করে? তাহলে অবশ্যই সেখানে সহযোগিতা আসবে। কুরআন তো মিথ্যা হতে পারে না, কোন ধর্ম পুস্তক, কোন শাস্ত্র মিথ্যা হতে পারে না।

কুরআনে লেখা রয়েছে-যে তার আল্লাহ্র দিকে এগিয়ে যাবে পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ কোন দিক থেকে সহযোগিতা আসবে তা তুমি জানো না। প্রশ্ন আসবে কতক্ষণ পর্যন্ত সে জানবে না? যতক্ষণ পর্যন্ত হাবুডুবু খাবে। মুখে বলবে আমি এক এর মধ্যে আছি কিন্তু পাঁচ মিনিট চোখ বন্ধ করে আত্মদর্শন করার তার সময় নেই। ২৪ ঘন্টা আপনি হাজার হাজার বিষয় চিন্তা করছেন আর ৫ মিনিট যখন চোখ বন্ধ করলেন তখন সেগুলো কি আসবে না? ওর প্রভাব কি পড়বে না? অবশ্যই পড়বে। সেইখানে ‘এক’ ধারণ করে আমি লালন করছি কিনা, ‘এক’ এর শক্তি আমি উপলব্ধি করতে পারছি কিনা তা দেখতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত ‘এক’ বোধ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত হাবুডুবু খাবো, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে যেতেও পারবো, যা আমার সহায়ক হবে। সুফী সাধক আনোয়ারুল হক উপলব্ধি করেছেন বর্তমান জগতে আজ থেকে হাজার হাজার বছর লক্ষ লক্ষ বছর ধরে যারা সত্যকে লালন করে আসছে, ১৪০০ বছর আগে নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) যেভাবে বললেন যে সত্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সত্য লালন করতে হবে, সত্য ধারণ করতে হবে এবং সেই ধারায় আমরা দেখছি বহু সূফী সাধক করে গেছেন কিন্তু তার ধারাবাহিকতায় যে সংস্কারের প্রয়োজন ততটা আসে নাই। অপরদিকে এই সত্যের বিরুদ্ধে যে শক্তি, সত্য একটি শক্তি এবং সত্যের বিরুদ্ধে যত শক্তি আছে তারা যখন দেখে তখন এই সত্যের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু করে, যা আজও চলছে এবং শেষ পর্যন্ত চলবে। তখনকার যে পদ্ধতি, যে পদ্ধতিতে সত্য অন্বেষণ করতে গেছেন সূফী সাধকরা সেই পদ্ধতির অনেক পরিবর্তন, সংস্কার নেয়া হয়েছে হাক্কানীতে। এখন মোবাইলের যুগ। একটা সময় সূফী সাধকরা বসে বসে চিন্তা করতেন, কাউকে দরকার হলে তিনি তার দরবারে এসে হাজির হতেন। প্রশ্ন হলো যে কত সময় লেগেছে? এখন পৃথিবীতে সময়ের কতটুকু মূল্য? এখনতো মোবাইল এসে গেছে, মোবাইল পর্যন্ততো আপনাকে সংস্কার করতে হবে। ঐটাকেতো মেনে নিতে হবে। আপনি ব্যবহার করছেন, আপনার কেনার মত সামর্থ হয়েছে। সেখানে অন্যের নাম্বারগুলো রাখতে পারছেন। যখনই চিন্তায় আসছে টিপ দিচ্ছেন আর যোগাযোগ করে আপনারা কথাবার্তা বলছেন। হাক্কানী থটের ওখান থেকে আরম্ভ। মোবাইলের উর্ধ্বে যাও, গিয়ে দেখো যে, সত্য তোমাকে কোন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। সাধনা সেখান থেকে আরম্ভ করতে হবে। একটি প্রাতিষ্ঠানিক আরেকটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগতের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে।

আমরা সবাই এই পৃথিবীতে এসেছি একা, চলে যাবো একা। পৃথিবীতে আমি এসে মোহের বশে, লোভের বশে, ভোগের স্পৃহায় অনেক কিছুর মধ্যে আটকা পড়ে গেলাম। কিন্তু দেখা যাবে কিছুই আমার থাকবে না। আমি যখন চলে যাবো তখন এইগুলোকে আমি পৃথিবীতেই রেখে যাবো। আমরা পৃথিবীতে সম্পত্তি রেখে চলে যাই ছেলে মেয়েদের জন্য। এভাবে ছেলে মেয়েদের আরো ভোগের মধ্যে রেখে সমাজকে নষ্টের দিকে নিয়ে যাচ্ছি আমরা। তার মধ্যে ভোগের স্পৃহাতো বাড়বেই। এটা চিরন্তন। একটা ব্যক্তি যে ভোগ করল তাতে কোন অসুবিধা নাই, যেই মুহূর্তে তার জায়গা আসছে সেই মুহূর্তেই তিনি তার ছেলেমেয়ে বা তার গোষ্ঠির আল্লাহ্ হয়ে গেলেন। আমার ছেলের জন্য এটা করে যেতে হবে, আমার মেয়ের জন্য ওটা করে যেতে হবে, তিনি তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করছেন অথচ ইসলাম মানছেন। মোহাম্মদকে (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নবী মানছেন, চলে যাচ্ছেন মক্কা-মদিনাতে, গিয়ে ঘুরে আসছেন আর ক্ষণিকের তৃপ্তি নিয়ে মনে করছেন যে আমি অনেক কিছু করে ফেললাম।

মুসলমান আর মুসলিম এক কথা না। কুরআনিক মুসলিম অর্থ হচ্ছে ভদ্র, শান্ত। কুরআন অর্থ-বার বার পাঠ করা। আমি প্রতিনিয়ত কি পাঠ করছি আমার চিন্তাজগতে? সেখানে কি একটা লক্ষ আছে? আল্লাহ্ এক সুতরাং আমি চিন্তাও করব এই একের মধ্য দিয়ে। প্রতিদিনের চিন্তার মধ্যে এবং কর্মের মধ্যে ঐ এক-কে আমি প্রতিষ্ঠিত করছি কি-না, সেই সূত্র ধরে আমি এগিয়ে যাবো। এটা যার যার নিজের। এটা কেউ কোনদিন করে দিতে পারবে না। হাজারটা ধর্মপুস্তক দিয়ে দিলেও হবে না এবং আল্লাহর কোন ঠেকা নাই। আল্লাহ একমাত্র ব্যস্ত তাঁর পাগলদের জন্য। যারা এক আল্লাহকে কেন্দ্র করে পাগল হয়েছে সারা বিশ্বে, সে যেখানে যে প্রান্তে, যে ধর্মেই থাকুক না কেন তার জন্যে আল্লাহ পাগল। না জানি কোনটা, কি চেয়ে বসে। চাইলেতো দিতেই হবে। যেমনভাবে পৃথিবীর বুকে আপনারা যে সন্তান নিয়ে আসেন, সে সন্তান যখন এগিয়ে যায়, তখন আপনাদের কাছে আবদার করে, কিছু সময় তার আবদারের মাত্রাটা তার বয়স এবং পরিবেশের উপর থাকে তখন আপনারা যেমন ব্যস্ত হয়ে পড়েন-এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে, যেমনভাবে আপনারা তার আল্লাহ হয়ে যান, তার সবকিছু আপনারা ঠিক করে দেন, তখন মনে থাকেনা যে আল্লাহ আছে। আমি তার বাবা হিসেবে, মা হিসেবে আল্লাহর রূপ ধরলে কতটা সত্যের উপর থাকতে হবে? কতটা সহনশীল হলে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো? আমিতো বিচার করবো দুনিয়াদারী দিয়ে। সত্যতো  দুনিয়াদারীতেই আসছে। মানুষের মধ্যেই আসছে। মানুষ উপলব্ধি করতে পারছে, তাই প্রত্যেকটা ধর্মে, প্রত্যেকটা শাস্ত্রে রিয়েলাইজেশনের উপর জোর দেয়া হয়েছে। তোমার কনসাসনেসের উপর নির্ভর করবে তুমি কতটা রিয়েলাইজ করছো। তুমি নিজেকে বিচার করে দেখেছো কি না যে, আনকনসাস আছি, না সাবকনসাস আছি, না প্রিকনসাস আছি, না কনসাস আছি, না ডুয়েল কনসাসে আছি, আমি কি হাইয়ার কনসাসে আছি দুটোকে নিয়ে, না একটা কম বেশী আছে? আমি কি আমার অন্তরের মধ্যে, আমার আপাদমস্তক এবং বাইরে বস্তুজগতের সঙ্গে প্রতিটি বিষয়ের সমন্বয় সাধন করে দুটোকেই আমি নিয়ে যেতে পারছি হাইয়ার কনসাসে? তারপর আসবে সুপার কনসাস। যেখানে এক ছাড়া আর কোন কিছু দেখি না। (চলবে)