সত্যমানুষতত্ত্ব

শাহ্ শাহনাজ সুলতানা ॥ ‘সূফী মানে সত্যমানুষ। মানবপ্রজাতির মধ্যে আবহমান কাল ধরে সত্যমানুষের স্বরূপের সমাহারই সূফীজম বা সূফীতত্ত্ব বা সত্যমানুষতত্ত্ব। স্বরূপ ও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত যে জন তিনিই সত্যমানুষ। তিনি বর্তমান। তিনি প্রাকৃতিকরূপে বিরাজমান। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি সত্য ছাড়া কিছুই দেখেননা। একেকজন একেক জনপদে আসছেন তিনি তাঁর মত করে তাঁর জনপদের উত্তরণ ঘটিয়ে যাচ্ছেন। এসবের সমাহারই সত্যমানুষতত্ত্ব। এটাই ঘটছে। এটাই আধ্যাত্মিকতা’। (-সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ)

সত্যমানুষতত্ত্বের আধুনিক ও যুগোপযোগী রূপরেখা প্রণয়ণে নিরলস কাজ করেছেন বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) তত্ত্বাবধায়ক প্রধান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ। সত্য অন্বেষণকারীদের প্রতি সত্যমানুষের বাণী, আহ্বান হাক্কানী স্কুল অব থট বা হাক্কানী চিন্তনপীঠ এর অন্তর্ভূক্ত। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে যা বলা হয় তা হচ্ছে হাক্কানী চিন্তন ধারা। এই ধারা থেকে বলা হচ্ছে-সবার উপরে সত্যমানুষ, তাঁহার উপরে নাই।

সত্যমানুষতত্ত্বের আধুনিক রূপরেখার স্বরূপ কি? যে ব্যক্তি যে রূপে আপাদমস্তক পরিপূর্ণ থাকেন সেটাই তার স্বরূপ। তিনি সেটাকে লালন করেন। যুগোপযোগী করেন। জ্ঞানার্জন করেন এবং প্রতিটি সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অর্জনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন এবং এগিয়ে যান। সত্যকে খুঁজতে গিয়ে কালে কালে কর্মের মধ্যে সত্যমানুষের স্বরূপের আধার অন্বেষণ করলে দেখা যায় তাঁরা পথ দেখিয়েছেন শান্তির। শান্তির পূর্বশর্তই হলো সত্য। যিনি যে কর্মে তার সত্যকে ধারণ করেছেন তিনি সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ে জীবন অতিবাহিত করে যান একজন সত্যমানুষ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একেকজন একেক সত্য নিজের মধ্যে ধারণ করে লালন-পালনের ধারায় মানবজাতির জন্য নিজেকে প্রকাশিত ও বিকশিত করেছেন। সত্য প্রচার, প্রসার ও বিস্তার করেছেন। এখানেই সত্যমানুষতত্ত্বের নিগূঢ় কথা। সত্যমানুষ প্রাকৃতিকভাবে বিরাজমান এবং তিনি বর্তমান। বিভিন্ন নামে এবং বিভিন্ন সম্পর্কের বেড়াজালে নিজেকে প্রকাশিত করেন। কেউ বলেন প্রাণের সখা, সুখ-দুখের সাথী, দয়াল, বন্ধু, সঙ্গের সাথী, দয়াল মুর্শিদ, বাবা, ভাই, মামা, এমন বহু নামের আড়ালে তিনি তাঁর কর্ম করে যান এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে মানবজাতির কল্যাণে বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে শান্তির জন্য আহবান রাখেন। সাধারণ মানুষ নানাভাবে তাকে ডেকে সম্বোধন করে মুক্তির পথ খুঁজেন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন- ‘আমি যারে চাই তার ভাবের অন্ত নাই- আমি যারে পাই তার রূপের অন্ত নাই’। আর তাই সত্যমানুষ নিরানন্দের মাঝে আনন্দের উৎস হন।

সত্যমানুষ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন- ধর্ম এবং ধর্ম্ম এক নয়। ধর্ম্মে ধারণের ব্যাপার আছে। এখানে ধর্ম কি? অনুভূতিসম্পন্ন হওয়া। এক বা ওয়ান সর্বোচ্চ শক্তি লক্ষ্যকে পাওয়ার ক্ষেত্রে। ওয়াননেস উয়িথ ওয়ান। নেশা খারাপ কিন্তু এক এর নেশা ভালো। অন্যের চিন্তা যখন নিজের চিন্তাকে উদ্ভাসিত করে তখন মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করে। আমি যে মানুষ আমার যে সৌন্দর্য আছে, নিজের অবয়বের মধ্যে যা আছে নিজের সৌন্দর্যের মধ্যে নিজে পাগল থাকতে পারছিনা। প্রত্যেক কর্মে নিষ্ঠা খুব কঠিন জিনিস। কর্মের মধ্যে নিষ্ঠা থাকলে এবং নিষ্ঠার সাথে কাজ করে গেলে তার ফল পাওয়া যায়। যেটা শিখবেন, ভালমত শিখবেন। মায়ার বন্ধন, শ্রদ্ধার বন্ধন এবং ভাবের বন্ধন কি এক হতে পারে?

কখন মঙ্গলপ্রদীপ জ¦ালানো হয়? যখন একটা অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। সূর্যাস্তের সময় এবং সূর্যোদয়ের সময়। সব আছে কিন্তু নিষ্ঠার অভাব। নির্দেশিত পথে চলা খুব কঠিন। ক’জন পারে? নিজের ইচ্ছায় সবাই চলতে পছন্দ করে। আবার যখন নিজের ইচ্ছায় চলে তখন বলে আল্লাহ আমায় দেখছেনা।” এভাবেই সত্যমানুষ যুগে যুগে কথা দিয়ে, বাণী দিয়ে সাধারণ মানুষদের দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন এবং যাচ্ছেন। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে বলা হচ্ছে- সত্যমানুষের কর্ম হলো সমাজ সংস্কার করা। সুতরাং সত্যমানুষ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। যার দুটি দিক আছে। অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান যেখানে তাঁর সত্যের সাথে একাত্মতার কর্মপ্রণালী বিদ্যমান। অন্যটি হচ্ছে বাহ্যিক প্রতিষ্ঠান। মিশন স্কুল, কলেজ, গবেষণাকেন্দ্র, স্বাস্থ্য সেবা, হাক্কানী চিন্তনবৈঠক এর মাধ্যমে সমাজে সংস্কার মূলক কাজ করে যাওয়া এবং সম্পৃক্ত করা।

হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে বলা হয়েছে -“হক থেকে হাক্কানী। সত্য এবং সত্যের সাথে একাত্মতা। মহাসত্যের পথ। এই সত্যকে খুঁজতে গিয়ে যুগে যুগে কালে কালে কর্মের মধ্যে সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন সত্যমানুষ। নিজের মধ্যে একটি সত্যকে যখন ধারণ করে লালন করা হয় তখন দেখা যায় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগ, সংযোগ, সম্পর্ক হয়েছে। এই অবস্থায় আমরা দেখতে পাই সূফী সাধক আজানগাছী, সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রত্যেকেই এক একটি প্রতিষ্ঠান এবং এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত ও বিকশিত হয়েছে। সত্যমানুষ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে দ্বীন ও দুনিয়া এক করে ফেলেন। দ্বীনের মধ্যে দুনিয়াকে চাদরের মধ্যে আবৃত করে ফেলেন।”

মানুষের অন্বেষণ হচ্ছে শান্তি নিয়ে। চিন্তনপীঠে থেকে বলা হয়েছে- “যত রাসুল এসেছেন সবাই ইসলাম মানে শান্তি বলেছেন কিন্তু ধর্ম মানে শান্তি বলেননি। সূফী সাধক আজানগাছী এটাকে উপলব্ধি করেছেন। তৎকালীন সময়ে চার তরিকার সকলের সাথে সমন্বয় করেছেন। তাদের আদর্শ নীতি জেনেছেন। সকল ধর্মের সারাংশ হলো সত্যদর্শন। সেই সত্যের ধারাবাহিকতা এগিয়ে নিয়ে গেছেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন। সত্যদর্শন নিজের জীবনে লালন পালন করলেন। তিনি সত্যকে আলিঙ্গন করলেন। প্রধান শিষ্য সূফী সাধক আনোয়ারুল হককে বেছে নিলেন। হাক্কানীতে এমন কোন তরিকা নেই যার জিস্ট নেই। বর্তমানে যে ধারা চলছে তাতে ইসলাম মানে শান্তি এটা স্থাপন করা যাবেনা। এটা ভেবেই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে কাছে যতজন গেছেন তাদেরকে তিনি দুইভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

১. প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২. আধ্যাত্মিকভাবে।

প্রাতিষ্ঠানিক এবং আধ্যাত্মিক দুইভাবে সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আলোকবর্তিকা হিসোবে কর্ম করেছেন তাঁর অন্যতম শিষ্য সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ। হাক্কানী চিন্তনপীঠে বলছে – সত্যকে যিনি আলিঙ্গন করেন তিনি হাক্কানী। একটা সত্যকে যিনি ধারণ লালন করেছেন তিনিও হাক্কানী পথের যাত্রী। সকল কর্মকান্ডে সত্য প্রতিষ্ঠা করার পিছনে যিনি সর্বক্ষণ নিয়োজিত তিনি হাক্কানী। যারা ধারন করেন, লালন করেন তাদের কাছে সবই সত্য। যে সত্যের অন্বেষণ করতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের খলিফা আবু বকর হলেন ছিদ্দিক। এটা আর কেউ পায়নি। লক্ষ্য কি? আশু লক্ষ্য কি? চূড়ান্ত লক্ষ্য কি? এটা কি মুখের কথা? এই সত্য নিয়ে সূফীজমের কনসেপ্ট নিয়ে আবু আলী আক্তার উদ্দিন বাংলার মাটিতে পা রাখলেন এবং পরবর্তীতে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে তুলে দিলেন। ১৯৯০ সনে প্রতিষ্ঠা পেল হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

যোগ্যতা দেখা হয় হাক্কানীতে। কতটুকু সত্য নিয়ে তিনি সমাজে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং কতটুকু নিজের পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। পৃথিবীর বুকে যত তরিকা এসেছে সত্য ছাড়া চলতে পারবে না। যিনি ধারন করতে পেরেছেন তাদের কাছে পরম পাওয়া। নিজের মধ্যে যে অভ্যাসগুলো গড়ে উঠেছে তা কি এক-কে কেন্দ্র করে? যতক্ষণ পর্যন্ত হাবুডুবু খাবে ততক্ষণ হবে না। মোবাইল এসেছে। এ সংস্কারকে মেনে নিতে হবে। হাক্কানীর কথা এর উর্ধ্বে যাও। দেখ, সত্য তোমাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে?

কোরানিক মুসলিম মানে ভদ্র শান্ত। কোরান মানে পাঠ করা। আমি প্রতিদিন কি পাঠ করছি? আমি প্রতিদিন আমার এক কে পড়ছি কিনা? এটা যার যার উপলব্ধির ব্যাপার। আল্লাহ পাগল তাঁর পাগলের জন্য। সত্যকে আলিঙ্গন না করলে কেউ শান্ত হবে না। অর্ধসত্যে থাকলে ছল চাতুরি আশ্রয় নিতে হবে। শান্তি আনতে গেলে শান্ত হতে হবে। যেখানে যে সত্যের উপরে দাঁড়িয়ে আছে সে থাকবে নির্ভীক। কাউকে ভয় পাবেনা। স্বশিক্ষায় উদ্ভাসিত করতে না পারলে উপলব্ধি আসবেনা। যার যত কর্মের প্রতি অনুসন্ধিৎসুতা থাকবে, একনিষ্ঠতা থাকবে তার তত উপলব্ধি আসবে। মানুষ হিসাবে যে শক্তি ছিল তা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। কিভাবে উপলব্ধি আসবে? আর যারা সংযোগে থাকবে আপাদমস্তক যে আবরণে আছে তারা বিশ্লেষণ করতে পারবে কোনপথে আছে।”

সত্যমানুষ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন- ‘সত্য বের করা কঠিন। সত্যমানুষ হওয়া আরও কঠিন। নিজের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে নিজের সত্যকে বের করতে হয়’। এজন্যই আহবান রেখেছেন – ‘সত্যমানুষ হোন – দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’।