সঠিক নেতৃত্বই সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়

‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের ৫ম পর্বের আলোচনা

সঠিক নেতৃত্বই সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়

সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের অংশ হিসেবে ‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে আলোচনার ৫ম পর্ব  গত ১১ কার্তিক ১৪২৬, ২৬ অক্টোবর ২০১৯ রোজ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ সভাপতি শাহ্ শাহনাজ সুলতানার সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশ নেন বাহাখাশ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের মহাসচিব শাহ খায়রুল মোস্তফা এবং হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা)’র নির্বাহী সদস্য সালেহ্ আল দ্বীন (সঙ্গীত)। আলোচনা পর্বটি সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু।

শাহ্ খায়রুল মোস্তফা বলেন, নেতৃত্ব কীভাবে দিতে হয়, নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কী কী কাজ বা দায়িত্বপালন করতে হয় তা আমাদেরকে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ দেখিয়ে গেছেন। এই মহান সাধক-এঁর গুণাবলী বা কর্মসমূহের একটা বিষয় কেউ ধারণ-পালন-লালন করতে পারলে তার অন্য কিছু আর লাগবে না, তার আর অন্য কিছু লাগে না। তাঁর আদেশ-নিষেধ-উপদেশ মেনে চললে নেতৃত্ব গুণ অর্জন হবেই হবে। ওনার আদর্শকে ধারণ করে কর্ম করে যেতে পারলে, ওনাকে স্মরণে রেখে এগিয়ে গেলেই হবে, কোথায় কেউ বাঁধাগ্রস্ত হবেন না। সাধক-এঁর কথা কখনও ভুল হবে না, ভুল হতে পারে না। সত্যের পথে থাকলে কেউ কখনো বাঁধাগ্রস্ত হয় না, হবে না। তাই তো তিনি বলেছেন, ‘সত্য বলুন, সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হোন, নিজে বাঁচুন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান’।

সালেহ আল দ্বীন  বলেন, আভিধানিক অর্থে নেতৃত্ব হচ্ছে একটি জনগোষ্ঠী, দেশ বা সমাজ বা কোনও সংস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্রিয়া বা কাজ। নেতৃত্ব কেন দরকার? – যে-কোন গোষ্ঠী/সংস্থা/দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। একজন চালক ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, তেমনি নেতা ছাড়াও নেতৃত্ব হয় না। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। দক্ষ একজন চালক ছাড়া যেমন গাড়ির দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়, ঠিক তেমনি একজন যোগ্য নেতার হাতে নেতৃত্ব না পড়লে সেই গোষ্ঠী/ সংস্থা/সমাজ/দেশ দুর্ঘটনার দিকেই এগিয়ে যাবে-এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আমাদের চারপাশে নেতার অভাব নেই, কিন্তু সবাই কি যোগ্যতা অর্জন করে নেতা হয় বা নেতৃত্ব দেয়। নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সবাই কি প্রয়োজন বোধ করে? ‘আমি সব জানি বা আমি সব সময় সঠিক’ এই মনোভাব থাকলে কি আর কিছু শেখার থাকে? যেহেতু নেতৃত্ব একটি প্রক্রিয়া, সেজন্য শেখার মাধ্যমে যোগ্যতা অর্জন করেই নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। একমাত্র সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই একটি সংস্থা/গোষ্ঠী/ সমাজ/ দেশকে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

একজন নেতাই সব পারেন, তিনিই অন্যদের খোঁজ-খবর নেন। দুঃখের সময় পাশে দাঁড়ান এবং বিষন্নতা থেকে তাঁর মানুষদের রক্ষা করেন। যে-কোনো কঠিন মূহুর্তে তাঁর মানুষদের পাশে থাকেন এবং তাদেরকে সঠিক পথের নির্দেশনা ও ভরসা দেন। যে-কোনো সমস্যার সমাধান তিনি দেন এবং সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেন। যোগ্যতাহীন একজন ব্যক্তিকে সময়ের সাথে সাথে যোগ্য করে তোলেন। নেতৃত্বের সুন্দর একটা উদাহরণ আমরা পিঁপড়ার মধ্যে দেখতে পাই। কী সুন্দর একটা দৃশ্যপট! একটা পিঁপড়ার পেছনে পেছনে অন্য সব পিঁপড়া সারি বেঁধে অনুসরণ করে চলে। একটুও এদিক-ওদিক হয় না সারি-এমন একটি দৃশ্য আমার জন্য অবশ্যই শিক্ষণীয় ও দিকনির্দেশনামূলক বিষয়। এই দৃশ্য দেখে আমার মধ্যেই প্রশ্ন উদ্ভূত হয়-আমি কি পেরেছি বা পারছি আমার নেতাকে এভাবে অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে?

সালেহ আল দ্বীন আরও বলেন,  আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে আমি একমাত্র ‘সত্যমানুষ-এঁর’ মধ্যে নেতৃত্বের এই গুণাবলী দেখতে পেয়েছি। আমার দৃষ্টি মোটেও প্রসারিত নয়। তাই অল্প কিছু যা ধরা পড়েছে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এসবের কোনোটাই নিজের চর্চার মধ্যেই আনতে পারিনি। আমার দৃষ্টিতে তিনিই একজন নেতা, যিনি সূক্ষ্ম, গভীর এবং সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দেন, পথ দেখান। যার চোখে প্রত্যেকটি প্রাণীকূল সমান। যিনি প্রত্যেককে আশার আলো দেন। তাঁর কাছে শেষ বলে কোনো শব্দ নেই। যোগ্যতার অভাব-বিষয়টিকে এভাবে না তুলে একজন কীভাবে যোগ্যতা অর্জন করতে পারে সে পরামর্শ দেন। দৃঢ়ভাবে কীভাবে একটি সিদ্ধান্তে দাঁড়িয়ে অটল থাকতে হয় সেই উদাহরণ দেন। সত্যের পথে সর্বদা কীভাবে নিয়োজিত রাখা যায় এবং মিথ্যাকে প্রশ্রয় না দেয়া যায় সে শিক্ষা দেন। তিনি উদাহরণ দেন কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। তিনি পথ দেখান – ভালোবাসা এবং প্রেমের মাধ্যমে সবকিছুই অর্জন করা সম্ভব।

সভাপতির সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় শাহ্ শাহনাজ সুলতানা হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর ‘সত্যমানুষ হোন-দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’-এই আহবানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, হাক্কানী সাধকের এই বাণীর যথার্থ অনুসরণ নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জনে আমাদের সহায়ক হতে পারে।