সংকটাপন্ন হচ্ছে সাধারণ গরিব!

shonkotaponno

সংলাপ ॥ বাজেটের খবর বেরতে না বেরতেই বাজারে ফের যেন নতুন করে আগুন লেগে গেছে। এমনিতে বহুদিনই রোজকার বাজার অগ্নিশর্মা হয়ে আছে। বাজেট যেন তাতে আর একপ্রস্থ ঘৃতাহুতি দিয়ে গেল! দামের আগুনও উঠছে লকলকিয়ে। সব সব্জি এক ধাক্কায় কেজিতে পাঁচ/দশ টাকা ঊর্ধ্বমুখী! পরিচিত জনেদের কাছে এমন খবর পেয়ে অবশ্য দেশবাসীর খুব একটা অস্বাভাবিক লাগেনা। এ দেশে এমনটাই ঐতিহ্য। বাজেটের ভালোমন্দ, তাতে কী আছে না আছে, তাতে সত্যিই কতটা দাম বাড়তে পারে বা বাড়বে বা আদৌ বাড়বে কি না-ওসব দেখে বুঝে নেয়ার দরকার নেই। ধপাধপ রাতারাতি চড়িয়ে দিচ্ছে আনাজপাতি থেকে শুরু করে সব কিছুর দাম, যে যেখানে যেমন পারে। অতঃপর, আমজনতার নিত্যদিনের বাজারে ফড়েদের দাপাদাপি শুরু এবং তার অনিবার্য পরিণতিতে সবের দাম এক লাফে অনেকটা দূর! আর্থিকভাবে দুর্বল দিন আনে-দিন খায় থেকে সাধারণ মধ্যবিত্ত সকলের শোচনীয় অবস্থা আর একটু শোচনীয় হচ্ছে। আর তাই নিয়ে পথে-ঘাটে আড্ডায় আসরে অফিসে কাছারিতে ক্ষোভ বিতর্ক বিরক্তির ছড়াছড়ি, অভিযোগ অনুযোগের গতানুগতিক সাতকাহন। বছরের পর বছর এমনটাই তো দেখে আসছেন, শুনে আসছেন আম জনতা তাই না?

কেবল আনাজপাতির দরদামই তো নয়, বাজেটকে শিখন্ডী করে সর্বস্তরেই পাওনা আদায়ের রেট বাড়ানোর একটা প্রয়াস প্রক্রিয়াও যে শুরু হয়ে যায় সেটাই বা কে না জানে? এই তো, বাজেটের পর ক’দিন যেতে না যেতেই বাস-ট্যাক্সির ভাড়ায় এক লপ্তে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়! পণ্য পরিবহণের লরি গাড়িও যে এর বাইরে নয় তা বলাই বাহুল্য! নিত্যদিনের বাজার যদি আর একপ্রস্থ চড়ে বসে তাতেও দেশবাসী খুব অবাক হবে না। কেন চড়ল দাম প্রশ্ন করলে বাঁধা বুলি তো আছেই, লরি-গাড়ির ভাড়া বাড়ছে, পাইকারি মাল আনা-নেয়ায় খরচ বাড়ছে ।

হক কথা। ঠিকই তো-পণ্য পরিবহণই হোক, কি যাত্রী পরিবহণ – সংশ্লিষ্ট কর্মীদের তা সে তিনি ড্রাইভার-কন্ডাকটারই হোন কি তাদের সহযোগী, সকলকেই যে উদয়অস্ত কঠোর পরিশ্রম করে পেটের ভাত জোগাড় করতে হয় তাতে সন্দেহ নেই। তারা তাদের আয় বাড়ানোর দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কথা হল, বাজেট লাগুই হল না আর অমনি চারদিকে দাম বাড়ানোর হাঁক কেন! শুধু কি তাই? বাজেট বাস্তবায়ন না হতেই দাম চড়ে যাচ্ছে এটাই বা কেমন কথা! ঈদ উৎসবের সময় বা কোনও একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কি একটু বৃষ্টি-বাদলা হলেই কোন গুণে মাছ, সব্জি থেকে যাবতীয়ের দাম অমন ধাঁ করে চড়ে যায়? জানেন, বহুজনাই জানেন সে দাম বাজেটে বাড়ে না, বাড়ে ফড়ে-দালালের কারসাজিতে। চটজলদি মুনাফার লোভে এখন দেশের বাজারগুলোতে এই ফড়েদের উৎপাত মাত্রা ছাড়া তেমনটাই বলেন তথ্যভিজ্ঞজনেরা।

এই ফড়েরা সারাক্ষণ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সব উৎসবে, ঝড়-বৃষ্টি দুর্যোগের মতো বাজেটও এদের কাছে একটা সুযোগ। এ দেশে ক্ষমতায় আসার পর একাধিকবার এই ফড়েদের উৎপাত কমানোর চেষ্টা করেছে সরকার, সাময়িকভাবে তাতে কিছু কাজও হয়েছিল। তবে ধূর্ত সুযোগ-সন্ধানী, ফড়ে-দালাল বাহিনীকে যে পুরোপুরি কব্জা করা যায়নি তার প্রমাণ মাঝেমধ্যেই মিলেছে, মেলে। এই যেমন এবার বাজেট প্রকাশ মাত্রেই বাজার যে ধক করে অনেকটা চড়ে গেল, মূল্যবৃদ্ধির আঁচ লাগল আমজনতার মুখে তার জন্য বাজেট যত না দায়ী তার চেয়ে ঢের বেশিগুণ দায়ী ওই ফড়ে-দালালেরা। বাজারের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে তথ্যভিজ্ঞ সকলেই বলছেন সেকথা। বাজেটকে ‘পুঁজির পৌষমাস’ বলে কটাক্ষও করেছে বিরোধী রাজনীতিকরা। এবং সেটাও স্বাভাবিক। বিরোধী শিবির চিরকাল এভাবেই দেশের বাজেটের নেতিবাচক দিকগুলো জনতার সামনে তুলে ধরেন, বাজেট প্রস্তাব রূপায়িত হলে মানুষের কোথায় কতটা চাপ পড়বে তার আগাম আভাস দেন।

কিন্তু, বাজেটের কারণে মূল্যবৃদ্ধির আগেই যদি বাজার চড়ে যায় তাহলে কী বলা যাবে!? সত্যি বলতে কী, বাজেট বাস্তবায়ন হতে না হতেই ঢাকার বাজারে দাম বৃদ্ধির বহর শুনে অস্বাভাবিক না লাগলেও এই ধন্দটা কিন্তু সবার মাঝে জেগেছে কে বাড়ায় দাম! মজুতদারি, মুনাফাবাজি, ফাটকার মতো শব্দগুলো ষাট-সত্তর-আশির দশকের মতো আজকাল আর অত শোনা যায় না ঠিকই, কিন্তু তাদের অস্তিত্ব যে আজও বহাল সেটা কিন্তু বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে বাজারের চেহারা চরিত্র থেকে বেশ ভালোই মালুম পাওয়া যায়।

পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের দাপটে ভেজাল আর লোক ঠকানোও যে এখনও প্রায় অবাধে চলেছে তাতেও কোনও সন্দেহ নেই। বাজারে দোকানে ওজন কম দেয়া, নকল নিম্নমানের জিনিস বেশি দামে গছিয়ে দেয়া ইত্যাদি তো এখন এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী দোকানদারের ক্ষেত্রে রেওয়াজই হয়ে গেছে। কিন্তু, তাই বলে জীবনদায়ী ওষুধ! আমাদের দেশে ওষুধ এমন হারে ভেজাল হচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন! যারা এসব করছে তারা কেমন মানুষ! মানুষের জীবনের কোনও মূল্যই যাদের কাছে নেই, সামান্য কটা টাকার জন্য যারা এমন জঘন্য ব্যবসা করতে পারে তাদের মানুষ বলা যায়! পৃথিবীর কঠিনতম শাস্তিও কি এদের অপরাধের উপযুক্ত হয়? শুধু এরা কেন, যারা ওই জাল ওষুধপত্র রোগী বা তার পরিবারের হাতে তুলে দিচ্ছে তাদের অপরাধও কি কম? কিন্তু, আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এমন ভয়ঙ্কর কা- চলছে অথচ কারবারিরা কেউ ধরা পড়ছে না! ভেজাল ওষুধ সরকারি হাসপাতালে ঢুকে রোগীর জীবন সংকটাপন্ন করে তুললে অনেক কান্ড ঘটে যেতেই পারে! মুনাফাবাজরা তো সঙ্গত কারণেই সেই বিপদের কথা ভাববে না, কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বাদবাকিরা?

জনসচেতনতা গড়তে মহানগরীর পথে কেউ নামছেন না। নিঃসন্দেহে নেয়া হচ্ছে না সময়োচিত উদ্যোগ। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো সবুজায়নের সুফল বোঝানোর চেষ্টাও চালাচ্ছে না। অবিলম্বে লাখ লাখ গাছ লাগিয়ে পৃথিবীর সবুজের অভাব পূরণ না করলে যে মানব সভ্যতা আগামী এক দশকের মধ্যেই ঘোরতর বিপদে পড়বে সেই বার্তা দিচ্ছে না। ফল কতটা হচ্ছে তা নিয়ে সন্দেহ এখনও যথেষ্ট। অপরদিকে, দেশের নানা জায়গায় এখনও নির্বিচারে গাছ কাটা চলছে, তার ছবি ও খবর বেরচ্ছে। আর কোনও রকম তর্কে না গিয়ে চোখ বুজেই বলে দেয়া যায়, বিশ্বের চারদিক থেকে পানীয় জল নিয়ে গুরুতর অশনিসংকেত আসার পরও এই ঢাকা শহরে তো বটেই, গোটা দেশেই প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ পানি অপচয় হয়। আপাতত বেশির ভাগ জায়গায় জলের জোগান স্বাভাবিক আছে বলে সেটা গায়ে লাগছে না। তাই এখনও আসন্ন মহাবিপদের কথাটা ভাবছেন খুব সামান্যজনই। বাদবাকিরা এখনও নির্বিকার, ভয়ডরহীন দু’জনের সংসারে আড়াই-তিন হাজার লিটার শেষ করে দিচ্ছে দিনে, বাড়ি গাড়ি ধোয়া চালাচ্ছে কর্পোরেশনের পানীয় জলে! অন্যদিকে মুনাফাবাজেরা এখনও ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে, বৃষ্টি-ঝড় বাজেটের মতো কিছু পেলেই বাজারে আগুন লাগিয়ে আখের গোছাচ্ছে! এবং এই দুয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে নাজেহাল বিপর্যস্ত সংকটাপন্ন হচ্ছে সাধারণ গরিব মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন যাপন।

অন্যদিকে প্রশাসনের রাশ কতখানি আলগা হয়ে গেলে প্রায় রোজ এমন নৈরাজ্যের উপসর্গ টুকরো টুকরো ছবির মতো মাথা তুলতে থাকে, সে কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার। প্রকাশ্যে বা সর্বসমক্ষে বা জমজমাট রাস্তার মোড়ে যখন তখন খুন হয়ে যাচ্ছে। পুলিশের সামনেই কোথাও দুষ্কৃতীর তান্ডব চলছে। কোথাও আবার আচমকাই পথ চলতে চলতে সংঘর্ষ বেধে যাচ্ছে পুলিশ আর সমাজবিরোধীর মধ্যে, এনকাউন্টারে মৃত্যু হচ্ছে দুষ্কৃতীর। এই দৃশ্যগুলো কোনও স্বাভাবিক দৃশ্য নয়। লাগামছাড়া রাজনৈতিক হিংসা এবং তার জেরে দেশের প্রান্তেপ্রান্তে খুন জখম যে ভাবে চলছে, তাতে হিংসা বা রক্তপাত বোধ হয় দেশের মানুষের অনেকের চোখেই সয়ে গিয়েছে। তাই দুষ্কৃতীদের বাড়বাড়ন্ত বা নানা সমাজবিরোধী তত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ব্যর্থতা আলাদা করে চোখে ধরা দেয় না। কিন্তু সাধারণ নাগরিক সমাজকে ঘিরে একের পর এক অগ্নিবলয় কী ভাবে লেলিহান হয়ে উঠছে, তা উপলব্ধি করা খুব জরুরি।