রাষ্ট্রধর্ম বিতর্ক

নজরুল ইশতিয়াক ॥ প্রকৃতপক্ষে  ধর্মকে ধারণ করে দেশ পরিচালনা করা আর ধর্মীয় মোড়কে কার্যত জনগণকে জিম্মি করে ক্ষমতা ধরে রাখা এক নয়। কারণ ধর্ম বিষয়টি ধারণের সাথে সম্পর্কযুক্ত ও জীবন্ত একটি উপলব্ধির সাথে যুক্ত। জগত সংসারে সব কিছুরই ধর্ম আছে, আছে পরিবর্তন-বির্বতন ও রূপান্তরের সত্য। মানুষকেও তার ধর্ম অন্বেষণ করেই তা চর্চা ও চর্যা করতে হয়। ফলে শাসক শ্রেণী কোন যাদুমন্ত্র বলে ধর্ম সেবা করার যোগ্যতা রাখে সেটি গভীর আলোচনার বিষয়। খোদ মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র খ্যাত দেশগুলোর শাসক শ্রেণীর আয়েশী জীবন ও বেপোরোয়া কর্মকান্ড কোন ধর্মের পরিচয় দেয় তাও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। হাল আমলেও সীমাহীন উদ্ধ্যত্ব বর্বরতা, বৈষম্য সৃষ্টি এবং চরম ভোগবাদী জীবন যাপন আর যাই হোক কোরআনের স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক। আর ইসলামের মহান নবী মুহাম্মদ (যার কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর সময় কাল এবং পরবর্তীতে সংগঠিত ভয়াবহ সব কর্মকান্ডকে কোন ধর্মের শিক্ষা বলবো আমরা। আমরা কি খেলাফত এবং খেলাফত পরবর্তী ইসলামের নামে দেশে দেশে ভয়ংকর চিত্র দেখিনি? জবর দখল, লুটপাট বর্বরতার সাক্ষী হয়ে আছে সেসব নিষ্ঠুরতা। এর কারণ কি অনুসন্ধান করে বের করেছি?

ধর্ম যে  বই পুস্তক নয়, গ্রন্থের  লেখা  পাঠ করলেই যে ধার্মিক হওয়া যায় না, সেটি বুঝতে বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন নেই।

খোদ যেসব দেশ সমূহের নামের আগে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ট্যাগ লাগানো রয়েছে, যাদের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম, সেসব দেশ কি ইসলামের মহান শিক্ষার কোন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পেরেছে? সৌদী আরব, ইরান, পাকিস্তান কি ইসলামিক রাষ্ট্র? ইসলামের কোন স্পিরিটের সাথে তাদের কর্মকান্ড যায়? বাক ও বিবেকের স্বাধীনতা কোথায়? কোথায় নারীর অধিকার?

খোদ বাংলাদেশে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক-জিয়া এবং পরবর্তীতে এরশাদ কোন ইসলামের পরিচয় জাতিকে উপহার দিয়েছেন? এরা কি ইসলাম বোঝে, জানে ইসলামের স্বরূপ ভয়টা তো এখানেই। এরা ধর্মকে ব্যবহার করেছে স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে।

জিয়া, এরশাদ, গোলাম আজমরা তো ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখে না। ধর্মীয় কার্ড ব্যবহার করেই ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করা হয়েছে। ৭২ এর সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতার মহামন্ত্র যুক্ত করা হয়েছিল ধর্মীয় বিভেদ বিভাজনতে রুখতেই। 

জিয়া-এরশাদ, এমনকি বর্তমান সরকারের যারা এমপি মন্ত্রী তারাও কি প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা জানেন-মানেন? তাহলে কেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হবে। সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে স্থান দেয়া আর বাস্তবে সেই সত্য অনুধাবন উপলব্ধি না করা আরেকটি মুনাফেকি।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) তো নিজেই রাষ্ট্রের কোন ধর্ম করেননি। মদীনা সনদ, মক্কা বিজয় কিংবা মসজিদে নববীতে বসে দেশ পরিচালনার কথা যারা বলেন তারা কি দেখাতে পারবেন মহানবী কোথাও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার নির্দেশনা দিয়েছেন? পারবেন না।

বিষয়টি এত সহজ না। ইসলাম তো সামাজিক রাষ্ট্রীক নীতি বিধানের ধর্ম। একটি রাষ্ট্র যেসব সুনীতি ও নীতি কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে প্রকৃত সুশাসন দিতে পারে সেটা ইসলামের মূল শিক্ষা।

সমস্যা হলে ধর্মীয় বিধি বিধানই শেষ নয়। দেখতে হবে সমাজকে কতটা প্রস্তুত ও উপযোগী করা হয়েছে। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাতের পর তো বুঝা গেল নামে মুসলমান কতজন! রাতারাতি হাজার হাজার মানুষ ধর্ম থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। ধর্মীয় প্রতিনিধি ও নেতা খ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় প্রমাণ করে ধর্ম বিষয়টি গভীর। এটি মৌখিক স্বীকৃতি কিংবা সাধারণ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। হাল আমলের লাদেন, তালেবান, আইএস কিংবা বাংলা ভাই, ইংরেজি ভাইয়ের মতো মুসলমানের অভাব নেই কোথাও। তাহলে বস্তুত পরিপূর্ণ ইসলাম কায়েমের জন্য যে সামাজিক তীব্রতা ও সক্ষমতা দরকার সেটি এখনো অর্জিত হয়নি। আর এটি চাপিয়ে দিয়ে হবেও না। আপনি চাইলেই চুরির অপরাধে হাত কাটতে পারেন না, চাইলেই নারীকে ঘরে বন্দি করে রাখতে পারেন না। ধর্মের নামে অন্য ধর্মের মানুষদের অপমান অবজ্ঞা করতে পারে না। বলতে পারেন না একমাত্র ইসলাম আল্লাহর মনোনীত আর বাকিগুলো উচ্ছিষ্ট। এটি বলা হলে তা হবে প্রকৃতি ও পরিবর্তনের বিপরীতে একটি মহাবিভ্রান্তি। কারণ গোটা পৃথিবী এবং পৃথিবীর মানুষ একটি পরিবর্তন যাত্রায় রয়েছে। এখনো সীমাহীন ক্ষুধা দারিদ্রতা, বৈষম্য, অশিক্ষা-বিচ্ছিন্নতা আছে। এই পৃথিবীতে এখনো বহু জনগোষ্ঠী আছে যারা আল্লাহ-খোদা-মুহাম্মদ-রাম-কৃঞ্চের নাম পর্যন্ত শোনেননি। নাম শুনলেই সত্যটা জানেন না।]বহু গোত্র গোষ্ঠী এখনো কাল্ট পর্যায়ে রয়েছে। নিজস্ব প্রথা পদ্ধতি আচারের নানা মাত্রায় অবস্থান করছে। পৃথিবীতে এখনো কয়েক হাজার ধর্ম রয়েছে। কোন কিছু রাতারাতি চাপিয়ে দেয়া প্রকৃতি ও প্রগতি বিরুদ্ধ।

ইসলাম শান্তি। শান্তির পূর্ব শর্ত সত্য। সত্য চর্চা ও চর্যার বিষয়। এটি আরোপিত নয়। খোদ নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) প্রতিবেশীদের ইসলামের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে শুধু এটুকুই প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, তিনি আল্লাহর রাসুল। এই রাসুলতত্ত্ব- এটি উপলব্ধি করার মধ্যেই পরম সত্য নিহিত।

কেউ কেউ বলেন রাষ্ট্রভাষা থাকলে কেন রাষ্ট্রধর্ম থাকবে না। তাদেরকে শুধু এটুকু বলা যায় ভাষা এবং ধর্ম এক নয়। ধর্ম হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান- যা  একটি বিন্যাস ও কাঠামো। যা আমরা আকাঙখা করি এবং সেই সত্য মানুষের প্রকৃত শান্তি ও অগ্রগতির শক্তি। এবং সাথে স্থান কাল পাত্র ভেদে একটি বিরাট ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন যে চলমান রয়েছে, সেই গভীর সত্য জানতে হবে। তাছাড়া সমাজ-রাষ্ট্র-গোষ্ঠী একই সময়ে ধার্মিক হয় না। ধার্মিকতা ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার। তবে ধার্মিক ব্যক্তি নেতৃত্ব দিলে তার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে, সমাজ দ্রুত এগুতে পারে॥ 

বিদ্যমান সামাজিক অবস্থা, নানান বৈচিত্রময়তা এবং সামাজিক পরিবর্তনের গভীর দিকটি বিবেচনার শক্তি শাসক শ্রেণীর না থাকলে ধর্ম ভয়াবহ হাতিয়ার হয়ে উঠে। আর এটি এখনো পৃথিবীর কোন দেশেই প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি, যার দৃষ্টান্ত দেয়া যাবে।

পুরো বিষয়টি নির্ভর করে শাসক শ্রেণীর ধর্মজ্ঞানের উপর। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠার দাবি যারা করেন তারা রাজতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতায় লেখা ইসলামের অসুখে অসুস্থ। খেলাফত নামক রহস্যময় রোগে কাতর। এক ধরনের দস্যুপনা থেকেই এমন উন্মাদনার ঢেউ বয়ে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক জনজীবন ও যোগাযোগকে বিচার বিশ্লেষণ না করা গেলেও সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতা ও বিচ্ছিন্নতা দেখা দিতে পারে। ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করা, জপ করা, মুখস্ত করা আর ধর্মীয় সুক্ষè জ্ঞান আয়ত্ব করা দুটি ভিন্ন বিষয়। ফলে এখন পর্যন্ত আমরা ধর্মীয় পরিচয়ে যা দেখেছি তা চরম ভয়ংকর। হাতের বদলে হাত, চোখের বদলে চোখ আর জীবনের বিনিময়ে জীবন যদি ফায়সালা হয়ে থাকে, তবে সে ধর্ম সত্য নয়।  তুলনামূলক বিচারে একটি ধর্মকে শ্রেষ্ঠ আর অন্যটি আবর্জনা বলা হলেও সেটি কোন সমাধান বয়ে আনে না।

ধর্ম যদি বোধ হয় তাহলে সেটির সামাজিক রাষ্ট্রিক পরিচয় হলো ন্যায় বিচার, ঐক্যবদ্ধতা এবং সুযোগের সমতা বিধান। আল কোরআন দিয়ে সহজেই এই সত্য প্রমান করা যায়। অন্যদিকে কোন কোন ধর্মের লোক যদি মনে করেন তারা নিজেরা ইশ্বর কিংবা বিধাতার পুত্র, মনে করে তারাই ইশ্বরের সোল এজেন্ট তাহলেও সমাধান পাওয়া যাবে না। 

একটি দেশের অভ্যন্তরে, রাষ্ট্রীয় পরিচয় ইসলাম কিংবা অন্য কিছু বরং ধর্মকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।

ধর্ম আছে, ধর্মীয় গ্রন্থ আছে, একই সাথে ধর্মের নামে কি কি হয়, কি কি করা যায় সেসবও তো অনুসন্ধানী মানুষ জানে। আজকের যে বিশ্ব ইতিহাস,সেই ইতিহাসের পাতায় পাতায় ধর্মীয় পরিচয়ে বর্বরতা লুটপাট দখলদারিত্বের শত সহস্র চিত্র অংকিত হয়ে আছে।

আমরা ধর্ম প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে পৃথিবীতে তলোয়ার, বল্লম,ঘোড়া হাতি কামান গোলা বারুদের ঝনঝনানী দেখেছি। চোখের পলকে কোটি কোটি মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ, নারী সহ অনান্য সম্পদকে গণিমতের মাল হিসেবে দখল করার ইতিহাস জানি। জানি ধর্মযাজকদের মনোপলি কারসাজী। যেখানে ধর্মযাজরা ইশ্বরের পুত্র কিংবা প্রতিনিধি হয়ে ভোগ বিলাসী জীবন যাপন করতে পারেন। আর গোটা দেশের বাকি সব শাসক শ্রেণীর কর্তাব্যক্তিরা ধর্ম কি, ধর্মের অনুশাসন নির্দেশনাগুলো কি, সেটি না জানলেও ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় লেখা হয় নানান ইতিহাস কল্পকাহিনী। সেসব কাহিনী অনেকটা বীরত্ব গাঁথা এবং রাজা বাহাদুরদের গুণকীর্তন নির্ভর। কোন রাজা বাহাদুর ধর্মকে বাঁচিয়ে রাখতে কি করেছে, কত মহামান্য অবদান রেখেছে সেটির উপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাস।

তলোয়ার হাতে, বল্লমের মাথায় আল কোরআন গেথে একের পর এক যুদ্ধ ও দখলদারিত্ব। এটিই তো কম বেশি ইতিহাস। মুসলিম, খ্রীষ্টান সংঘাতে, হিন্দু বৌদ্ধ দ্বন্দে শত শত ঘটনার স্বাক্ষী পৃথিবী। মহাত্মা গৌতম বুদ্ধের অহিংস নীতির পর লক্ষ লক্ষ অনুসারীকে হত্যা করা হয়েছে, বিতাড়িত করা হয়েছে। পালিয়ে যেয়ে প্রাণে বেঁচেছে লাখ লাখ বৌদ্ধ অনুসারী। কি নির্মম সেসব ঘটনা। সমাজ বিস্তারের যে খেলা ধর্মের নামে শুরু হয়েছে তা আজও চলমান। শিল্প বিপ্লব উত্তর নয়া আধিপত্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদ যেমন আজ জারি রয়েছে তেমনি।

রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকতে পারে কি না এটি নিয়ে আলোচনা করা বেশ কঠিন। অনেকে মনে করে এই নিয়ে আলোচনা বরং ধর্মীয় বিভেদ বিদ্বেষকে উসকে দিতে পারে। আমাদের দেশে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করা হয়েছে পুরোপুরি অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে। মহামান্য হাইকোর্ট পঞ্চম সংশোধনী বাতিলসহ জিয়া-এরশাদের কিছু কর্মকান্ডকে অবৈধ ঘোষণা করলেও রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে একটি রীটের চুড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো  ঝুলে আছে। কারণ কোর্ট নিজেও জানে এ বিষয়ে হয়তো মতামত দেয়া যাবে এর বাইরে বিশেষ কোন নির্দেশ দেয়া কঠিন।