রাষ্ট্রধর্ম কেন করা হয়?

নজরুল ইশতিয়াক ॥ রাষ্ট্র এবং ধর্ম । দুটি বিষয়ে পরিস্কার ধারণা থাকা জরুরী। রাষ্ট্রের জন্ম এবং একটি কাঠামোর মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ধর্ম কিভাবে কতটুকু সহায়ক হবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। ধর্ম বোধ একটি গভীর বিষয়, আর প্রচলিত ধর্মীয়  ধারণা নানান বিভ্রান্তির মিশেল। বহু মত পথ, মনগড়া গালগল্পে ভরা। অনেকটা বিড়ালের হাতে খুন্তি দেয়ার মতো। অসংখ্য অসংগতি  গতি বিরুদ্ধ অবস্থা বিরাজ করছে ধর্মের নামে। ওহাবী কিছু বিভ্রান্ত পীরতন্ত্র যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আধিপত্যবাদীদের বিরাট বিনিয়োগ। মাটিতে মানুষের মাঝে ধর্ম নেই, ধর্ম শুধু গ্রন্থ,ওয়াজে, দাঁড়ি টুপিতে, বেহেশত দোজখে,বহুমাত্রিক শোষনে। বাস্তবে জীবিত জীবনে ধর্ম মৃত। পুরোটাই আকাশে বাতাসে বইয়ের পাতায় পাতায়,আর সুরম্য উপাসনালয় প্রাসাদে। যে যার মতো ধর্ম ব্যাখ্যা করে। লোক জোগাড় করে ব্যবসা করে। এখন চোরের হাতে মুরগী বরগা দেয়ার মতো। ফলে ধর্ম এখন হাতের পুতুল।  

ধর্ম আছে, ছিল থাকবে। জীবন জগত সবই ধর্মময়। সব আবিস্কার উদ্ভাবন, উন্নয়নই ধর্মময় সত্য । কর্মফল, চিন্তা করার ফলাফল, সেবা ও সৃজনশীলবোধ সবই ধর্মবোধের গভীর উৎস। 

এটা উপলব্ধি করতে যে চিন্তন ও সামাজিক তীব্রতা দরকার হয় সেটি অনুধাবনে সমাজ উপযোগী হয়ে উঠেনি।এ কারণে বিজ্ঞান প্রগতি সবই ধর্ম বিরোধী তকমা পাচ্ছে। আর রাজনীতির করপোরেট ব্যবসায় ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছে।রাষ্ট্র পরিচালনায় সুস্পষ্ট কিছু নীতিমালার দরকার হয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র পরিচালনা কিভাবে পরিবর্তিত চাহিদার আলোকে যুগোপযোগী করা যাবে, সেটিও সব সময় সতর্কতার সাথে বিবেচনায় রাখতে হয়।          

রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিকে হাল আমলে রাজনীতি বলা হয়। মানে রাজনীতি এমন এক নীতি যা রাষ্ট্র পরিচালনা করার সক্ষমতা রাখে।

নানান পরিবর্তন, নানান প্রয়োজনে, যখন যা দরকার সেটিও করাও যায়। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে সংযোজন সংশোধন, পরিমার্জন দরকার হয়। যেহেতু কোন রাষ্ট্র অন্য কোন রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না বর্তমান বিশ্বে। ফলে একটি পরিবর্তনশীল রাষ্ট্রনীতি সত্য কাজ করে। গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। বাংলাদেশের সংবিধানেও জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা দেয়া হয়েছে।

ধর্মে জনগণের মালিকানা নেই। কোন ধর্ম বলেনি জনগণের মতামতের উপর দেশ পরিচালনা করা যাবে। বিশেষ করে ইসলাম সম্পর্কে যে প্রচলিত ধারণা সমাজে রয়েছে সেটি জনগণের মালিকানা বিরোধী কল্পনা।

অদৃশ্য খোদা, যিনি আসমানে আসীন তিনিই পবিত্র কোরআন পাঠিয়েছেন সার্বিক বিষয়ে ফায়সালা করার জন্য। কোরআন ও হাদিস দিয়ে সব কিছুর ফায়সালা করতে হবে। এক সময় বাইবেল দিয়ে বহু দেশ শাসনের চেষ্টা করা হয়েছে। এখনো সৌদি আরব এই কাজটি করছে নিজেদের মতো করে।

নিকট প্রতিবেশী ভারতেও ধর্মীয় উন্মাদনা জারি রেখে শাসন করছে ভারতীয় জনতা পাটি বিজেপি। দলটির নাম জনতা পার্টি, অথচ নানান বর্ণের, নানা জাতের নানা ধর্মের মানুষ দেশটিতে থাকার পরও  হিন্দু ঐতিহ্যের  নামে, পৌরাণিক কাহিনীকে সামনে আনার মধ্যে দিয়ে নব উন্মাদনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এতে করে সামাজিক বিভেদ প্রকট হচ্ছে।  ইউরোপে এক সময় খ্রিস্টানরা এমনটাই করেছিল। অথচ ভারতীয় ঐতিহ্য হলো সাধনা নির্ভর।  হিন্দু ধর্ম বলে কিছু হয়না। এটি যে কেউ জানতে পারবেন অনুসন্ধানী হলে।

ভারতবর্ষে তলোয়ার হাতে ঘোড়া নিয়ে আগমনকারী জবর দখলকারী শাসকরা ভারতীয় ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেনি। হাতে গোনা দুএকজন চেষ্টা করলেও সচেতনভাবে তথাকথিত মুসলিম শাসকরা ভারতবর্ষ শাসন করেছেন। সেটা ভিন্ন আলোচনা।

হাল আমলে ইরানে তথাকথিত ইসলামিক বিপ্লবের নামে কতশত মুক্তমনাকে হত্যা করা হয়েছে,সৌদী আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যে কোন ইসলাম জারি রয়েছে এগুলো অনুসন্ধান না করে বায়বীয় ইসলামীক রাষ্ট্র তৈরীর কথা কোন কাজে লাগেনা বরং নয়া আধিপত্যবাদী সুড়সুড়ি লক্ষ্য করা যায়।

নিকট প্রতিবেশী পাকিস্তান কোন ইসলামের ধারক বাহক? আমাদের দেশে বহু সংখ্যক মানুষতো পাকিস্তান পাকিস্তান বলতে পাগল।

আমরা কোন কিছুর বাস্তবতা উপযোগী মেনে নিতে পারিনা বিচার বিশ্লেষণ না করে। খোদ বাংলাদেশকে ইসলামিকরণের নামেই বা কি কি হয়েছে এটাও দেখতে হবে। হেফাজত, জামাত, চরমোনোইয়ের ইসলামের স্বরূপ কি? তারা কোন ইসলামের কথা বলে?

মসজিদে খুতবাই কোন ইসলাম?  বৈশাখ, ফাগুন, বর্ষাকাল পালন, ফুলের বিরোধিতা করা হয় ধর্মের নামে। অথচ এগুলোতো প্রকৃতির নিয়ম বিধান। দেশ সংবিধান সংগ্রামের বিরোধীতা করা হয়। নারীর দেহ, চিন্তা,  হরমোন, হাত পায়ের বিরুদ্ধে বিরূপ কথা বলা হয়, এটা কোন ইসলাম??? একেক জনের ইসলাম একেক রকম। তাহলে রাষ্ট্র কোন ইসলামকে গ্রহণ করবে? আর রাষ্ট্রের কোন কর্তৃপক্ষ সেটা নিশ্চিত করবে? এগুলো সূক্ষ্ম আলোচনার বিষয়বস্তু। 

জিয়া, এরশাদের ইসলামপ্রীতিই বা কেন???? এরা কি জ্ঞানী ছিলেন? । এরা কিভাবে ইসলামের সেবক হয়?  

কোরআন বুঝতে জ্ঞান দরকার। কোরআন পাঠ আর কোরানের জ্ঞান এক নয়।

জ্বীন ভুত, দোজখ, বেহেশত, নামাজ রোজা, হাশর কিয়ামতের আলোচনা, আর কোরআন উপলব্ধি এক নয়। ইউটিউব হুজুরদের বয়ান আর ইসলামের সত্য সৌন্দর্য এক নয়। সরলপ্রাণ মানুষদের সাথে প্রতারণা করে ক্ষমতায় থাকার জন্য ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করা।

ধর্মকে হাতিয়ার করে রাজনীতি করা কিংবা ব্যবসা করার নাম ইসলাম নয়। ইসলাম বুঝতে হলে ইতিহাস জ্ঞান, বৈজ্ঞানিক হিসেব নিকেশ, সামাজিক প্রাকৃতিক জ্ঞান লাগে। স্থান কাল পাত্র ভেদ জানতে হয়।

ইসলাম বাপ দাদার ধর্ম নয়। বরং বহু সূরায় বাপ দাদার ধর্মকে অবজ্ঞা করতে তাগিদ দেয়া হয়েছে। আহাদ সামাদ ভেদ, আলিফ লাম মীম, রাসুল তত্ত্ব্, ভুগোল না জানলে ইসলাম জানা যাবেনা। ইসলামের জন্ম আল হাযহার বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কোন মাদ্রাসায় নয়। ইসলাম ইতিহাস কিংবা ঐতিহ্য নয়। আত্মসমর্পণ , আত্মউপলব্ধির নাম ইসলাম। বর্তমানকে চেনার নাম ইসলাম। ইসলাম প্রাকৃতিক সামাজিক ধর্ম। ধারণে লালনে ইসলাম। সাংস্কৃতিক মননে ইসলাম। সততা শুভ্রতায় ইসলাম। সৌদী আরবের ক্রিটিকাল সমাজই ইসলাম নয় বরং যে মহান গাছটির বীজ নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) রোপন করেছেন সেটি যেমন ফুলে সৌরভে পরিবর্তনশীলতায় আজও সত্য, তেমনি ওহাবী ইয়াজীদিদের মতো কাঁটা আছে ভিন্ন ভাবে এটি বুঝতে হবে। ইসলাম চাপিয়ে দেয়া যায় না। ইসলাম শান্তি, শান্তি মুখস্থ কথা নয়। ব্যক্তি কেবল সেটি ধারণ করে। বর্তমান দুনিয়া বাণিজ্য নির্ভর হওয়ায়, শাসক শ্রেণী নিজস্ব প্রয়োজনে দালাল তৈরী করে ইসলামী রাষ্ট্র বানানোর কথা বলে। আর ভেড়ার দল তা মেনে নেয়।