রাজনৈতিক অঙ্গনে মেধার ঘাটতি!

সংলাপ ॥ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, গত কয়েক দশক ধরে, ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোয় যারাই রাজনৈতিক অঙ্গনে শীর্ষ স্থানে উঠে এসেছেন, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তারা প্রায় সবাই মেধাবী। মেধাই তাদের শীর্ষে ওঠার প্রধান মাধ্যম এবং বেশিরভাগ নেতাই ওইসব দেশের একেবারে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। জনগণ তাদের যোগ্যতাই বিচার করে, সামাজিক বা পারিবারিক অবস্থান বিচার করেনি। ওইসব দেশের তুলনায় আমরা এতটাই পশ্চাৎপদ যে, কোনোভাবেই কোন বিষয়ে তুলনা করা যায় না। স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির চাবিকাঠি চলে যাচ্ছে সম্পদশালীদের হাতে। তারাই হয়ে উঠছে জনগণের ভাগ্য বিধাতা। গাড়ি-বাড়ি-অর্থ না থাকলে রাজনৈতিক নেতা হওয়া যায় না বর্তমানে। ‘ত্যাগের’ বিষয়টা এখন দৃশ্যের অন্তরালে। স্বাভাবিক কারণেই উঠে গেছে মেধার চর্চা। সাংগঠনিক শক্তি, মেধার শক্তি, ভালো বক্তৃতার যোগ্যতার বদলে স্থান করে নিয়েছে আজ অর্থশক্তি, পেশিশক্তি এমনকি অস্ত্রশক্তিও। বর্তমান রাজনীতির এই বাস্তবতা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে রাজনীতিক ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের এক বিরাট সংখ্যক নেতা-কর্মী। তারা ধরেই নিয়েছে বিপুল অর্থের মালিক হলে রাজনীতির পেছনে তাকে ঘুরতে হবে না। রাজনীতির ক্ষমতা-নেতৃত্ব একদিন তার পেছনেই ঘুরবে। তাই দলগুলোর ত্যাগী-পুরানো নেতা-কর্মীরা দারুণভাবে উপেক্ষিত। তাদের খবর তো কেউ রাখেই না, নতুন নতুন বসন্তের কোকিলের দ্বারা তারা পদে পদে অপমানিতও হচ্ছেন। বর্তমান রাজনীতিতে এটাই চলছে। এ অবস্থায় ভিন্ন কোনো কথা বলা বা ভিন্ন কোনো চেষ্টা নেয়ার অর্থই হবে অপমানজনক উপেক্ষা।

পাকিস্তান আমলে সারাদেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নির্বাচনে মেধাবী প্রার্থীদের বিজয়ের হার ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। সেদিন ছাত্রজীবনে ছাত্ররা কল্পনাও করেনি, টেন্ডার, কমিশন, এজেন্সি, ঠিকাদারি ব্যবসার কথা। আর আজ?

তখন তো অভিভাবকদের পাঠানো বেতন, হোস্টেল চার্জের টাকা বাঁচিয়ে সংগঠনের জন্য ব্যয় করতে হতো। যা আজকের ছাত্র-রাজনীতির কর্মীর কাছে দুঃস্বপ্ন বলেই মনে হবে।

রাজনীতি থেকে নীতি-আদর্শ-ত্যাগ-সততা একেবারে বিসর্জিত হয়ে যাক, তা কারোরই কাম্য নয়। সমাজের এক বিরাট সংখ্যক মানুষও চায় নেতারা তাদের সামনে সততার উদাহরণ সৃষ্টি করুক। তাদের সন্তানরা যাতে নেতাদের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের সে আশা এখন দুরাশায় পরিণত হয়েছে। এখন তারাও ধরে নিয়েছে, নেতার যদি গাড়ি-বাড়ি অঢেল সম্পদ না থাকে তাহলে তিনি কেমন নেতা?

জাতীয় রাজনীতিকে কলুষিত করে গেছেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনিই সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’। তার আমলে ‘মানির’ সেই নোংরা খেলা বাঙালি লক্ষ্য করেছে। সেই থেকে রাজনীতিতে টাকার নগ্ন খেলা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, রাজনীতির নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকা। মিথ্যাচারের মাধ্যমে টাকা উপার্জনের থাবা যে কতদূর পৌঁছেছিল তার কিছু নমুনা বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জাতি লক্ষ্য করেছে।

এই বিপুল টাকার খেলার মাঝে দাঁড়িয়ে দেশের সাধারণ মানুষ এবং দলীয় আদর্শিক কর্মীরা আজ বড়ই অসহায়। জামাতে ইসলাম – যারা ধর্মের কথা বলে ফায়দা লোটায় মহাপারঙ্গম, তারাও নীতি-আদর্শের চেয়ে বড় অস্ত্র ধরে নিয়েছে টাকাকে। এখন সেই বিপুল প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য টাকা তারা ব্যবহার করছে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। নীতি-আদর্শের প্রশ্নে যেসব বাম-ছোট দলগুলো বরাবর সোচ্চার ছিল তারাও অন্যান্য দলের টাকার খেলার মাঝে পড়ে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য নীতির বিষয়গুলো পাশে ঠেলে রেখে টাকা কামানোর চেষ্টায় তৎপর রয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করছে বিশ্লেষকরা।

জাতীয় রাজনৈতিক জীবনের সব ক্ষেত্র থেকে নীতি-আদর্শ-সততা-ত্যাগ বস্তাপচা-বাসি জিনিসের মতো পরিত্যক্ত হতে চলেছে। আর তাতেই গড্ডালিকা প্রবাহে রাজনীতিকরা গা ভাসিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে সর্বাগ্রে দরকার রাজনৈতিক শক্তির দৃঢ় মনোবল ও লক্ষ্যাভিসারী অভিযাত্রা। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলকেই গড়ে তুলতে হবে তেমন লক্ষ্যে। আদর্শ জাতি গঠনে সততা ও নিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। বিশাল কর্মী বাহিনী গড়ে তুলতে হবে আদর্শ-নীতি-সততার মানদন্ডে। তেমন কর্মী বাহিনীই পারে আদর্শ জাতি গঠনে নেতৃত্ব দিতে। বর্তমানে সরকার  দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ হাতে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ভবিষ্যতের আশাপ্রদ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ভিশন-২১ কে সামনে নিয়ে দেশবাসীকে নতুন স্বপ্ন দেখাতেও সক্ষম হয়েছে। এ কর্মকা- বা উদ্যোগ দেখে চিন্তাবিদদের ধারণা হয়তো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আগামীতে আর দল বা সরকারের দায়িত্ব কাঁধে নেবেন না, হয়তো দেশের জন্য, দেশের আপামর মানুষের জন্য সোনালি পথের দিশা দিয়ে যেতে চান। একজন জাতীয় নেতা হিসাবে এই কর্তব্য পালনের পতাকা  বহন করে নেয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন দল ও নেতৃত্বের অভাব পূরণ করতে না পারলে সব কিছুই একদিন মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশংকা রয়েছে। স্বপ্ন পূরণের একমাত্র উপায় একটা নীতি-নিষ্ঠ রাজনৈতিক দল ও তার নেতৃত্ব। যার অভাব প্রকটভাবেই দেশে রয়ে গেছে।

ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জয়ী হতে হলে আরো বহুকাল ধরে বহু পথ হেঁটে যেতে হবে জাতিকে এক আদর্শিক রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে।

অনেক পথ যেতে হবে, অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে। সততা, ন্যায়-নীতি-আদর্শ-ত্যাগের রাজনীতি ও সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। এখনো ন্যায়নিষ্ঠ রাজনীতি ও রাজনীতিকের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায়নি। ভিশন-২১ এ সফলভাবে পৌঁছাতে চাইলে জাতীয় জীবনে নিশ্চিতভাবেই দরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নীতি-আদর্শ-সততা ও ত্যাগী রাজনীতিকদের আপোসহীন সংগ্রাম।