রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহবাড়ানোই নতুন বছরের চ্যালেঞ্জ

সংলাপ ॥ শুরু হলো খ্রীস্টিয় বর্ষপঞ্জি ২০২০ সাল-গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের নতুন বছর। বিদায় খ্রীস্টিয় বর্ষপঞ্জি ২০১৯ সাল। সেইন্ট (সাধু) গ্রেগোরিয়ান কর্তৃক তাঁর প্রভু যীশু খ্রীস্টের নামে প্রবর্তিত এই বর্ষপঞ্জি এদেশে কীভাবে বা কতটুকু অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে তা নিয়ে বিশদ ব্যাখার প্রয়োজন পড়ে না-তা সকলেরই কমবেশী জানা। এটাই বাস্তবতা। থার্টি ফার্স্ট নিয়ে মাতামাতির কিছু না থাকলেও এই বর্ষপঞ্জিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এই গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার দিয়েই আমাদের অর্থবর্ষ, জাতীয় দিবস, শিক্ষাবর্ষসহ সবকিছু গণনা ও হিসাবনিকাশের অনেক কিছুই জড়িত হয়ে গেছে। ডিসেম্বর, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, আগস্ট-ইত্যাদি এক একটি মাসের সাথে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের আনন্দ-বেদনা সবকিছুই এখন একাকার হয়ে গেছে। তাই বলে প্রকৃতির সন্তান হিসেবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত কালের সম্পর্ক এতটুকু ম্লান হওয়ার নয়। এখানে প্রকৃতি এক এক কালে-এক এক ঋতুতে এক এক বৈচিত্র নিয়ে হাজির হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পেরিয়ে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে পদার্পণ। ২০১৯ সালটা শুরু হয়েছিল এর আগের দিন-২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় আসার আগাম খবর নিয়ে। ওই নির্বাচনে সরকারি দল হিসেবে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিজয়ের ঘটনাটি যেমন ছিল বিস্ময়কর, তেমনিভাবে মাত্র ৭টি আসনে প্রধান বিরোধী শক্তি-বিএনপির জয়লাভের ঘটনাটিও ছিল আরও বিস্ময়কর। এর পাঁচ বছর আগে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণই করেনি। এসব কারণে গত ১০ বছর ধরে দেশে গণতন্ত্র বজায় রয়েছে-এ কথা যেমন সত্য, তার চেয়েও বড় সত্য হলো জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের অতি দুর্বল অবস্থান এই গণতন্ত্রকে দুর্বলই করে রেখেছে। আর এই দুর্বলতার কারণে রাজনীতিতে জনগণের সম্পৃক্ততাও দুর্বল অবস্থায় রয়ে গেছে। গণতন্ত্রের এই দুর্বলতা দুর্নীতিবাজ ও গণবিরোধী চক্রের জন্য সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করে দিয়েছে। সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ও জামায়াত-বিএনপিপন্থী বিভিন্ন চক্রের অনুপ্রবেশ ঘটার কারণে শান্তিপ্রিয় ও সত্যনিষ্ঠ মানুষগুলো রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। গত ১০ বছরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকা- বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি দলের চাইতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ব্যর্থতাই অনেক বেশি। বিরোধী শক্তিগুলো সরকারের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারেনি। দুর্নীতি, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক দ্রব্যমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের অনেক ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকলেও বিরোধী শক্তি এ নিয়ে জনগণের পাশে এসে দাঁড়াতে পারেনি, দাঁড়ায়নি। জনগণকে এবং জনস্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি কখনো জনগণের সমর্থন পায় না-এ কথাটিই ভুলে বসে আছে সরকারবিরোধী শক্তিগুলো।

অপরদিকে, সরকারি দল-বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচির সাথেও জনগণের সম্পৃক্ততা কতটুকু তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বহু আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতি এদেশের জনগণের আকর্ষণ ও মোহ এখনো না-কাটার কারণ দলের প্রধান বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক শক্ত হাতে তাঁর দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে চলেছেন। কিন্তু গেলো বছরের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের  জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আশানুরূপ ও প্রত্যাশিত পরিবর্তন না ঘটায় জনগণ এখানেও হতাশ। এক বছর আগে গঠিত মন্ত্রিসভায় অনেক নতুন মুখ দিয়ে সরকারি কার্যক্রম, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে চোখে পড়ার মতো কোনো পরিবর্তন এখনো দেখা যায়নি। কিছুদিন আগেও সরকারি উদ্যোগে দুর্নীতিবিরোধী ও শুদ্ধি অভিযানের প্রতি সচেতন দেশবাসী গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছিল, কিন্তু সেটিও এখন বন্ধ রয়েছে। তবে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখার জন্য সরকারের পুলিশবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাগুলোর কৃতিত্বকে স্বীকার করতেই হবে সত্যের খাতিরে।                   

একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে-দেশের জন্ম সে দেশের জনগণ রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেললে সেটা শুভ লক্ষণ নয়। ১৯৭৫’এর ১৫ ই আগষ্ট ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এদেশের জনগণের মধ্যে রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহ তৈরি করেছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এই অনাগ্রহের পরিবেশের মধ্যেই এদেশে তখন একে একে ঘটতে থাকে জেলখানার অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতা হত্যাসহ আরও অনেক দুঃসহ ঘটনাবলী। তারপর দীর্ঘ একুশ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে  মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি। এই শক্তি সকল হত্যাকান্ড এবং ৭১’এর যুদ্ধাপরাধীদেরকে বিচারের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করলেও সেই গণবিরোধী শক্তি আজও যে বসে নেই সে কথা ভুলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই জনগণকে রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুললে হবে না। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের কথা ও কাজের মধ্যে যতটা সম্ভব সমন্বয় সাধন। কারণ, এদেশের এতিহ্যবাহী রাজনীতির সংস্কৃতিটাই হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ। ১৯৭০’এর নির্বাচনে এদেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে নৌকায় ভোট দিয়েছিল বলেই জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ৭১’র ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় স্বাধীনতার ডাক দিতে পেরেছিলেন। এই ৭ই মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর আহবানেই সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো যে-যুদ্ধটা পরিণত হয়েছিল একটা জনযুদ্ধে। তখন রাজনীতি আর যুদ্ধটা কোনো ব্যক্তিগত লাভ, ব্যবসায়িক প্রতিপত্তি বা পারিবারিক সম্পত্তি অর্জনের বিষয় ছিলো না।

ষাটের দশকে এদেশের প্রতি পাকিস্তানী আমলের বৈষম্য তুলে ধরে সাড়া জাগানো অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্প্রতি রাজধানীতে এক সেমিনারে বলেছেন, ‘রাজনীতি ব্যবসা বা ব্যক্তিগত লাভের বিষয় নয়। রাজনীতি হলো জনসেবা। সংসদ হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটিমাত্র স্তম্ভ। আর গণতন্ত্র হলো সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব’। এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ আয়োজিত সোসাইটির মিলনায়তনে ‘সাসটেইনিং ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ : দ্য পলিটিক্যাল লিগ্যাসি অব তাজউদ্দীন আহমদ’ শীর্ষক বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পথে টাকা ও পেশিশক্তি যেন ভূমিকা রাখতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের মতো এমন আদর্শের জনপ্রতিনিধি জাতীয় সংসদে পাঠানোর পথ সুগম করতে হবে।

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে রেহমান সোবহান আরও বলেন, ‘তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের নেপথ্যের নায়ক (আনসাং হিরো)। তরুণ প্রজন্মকে তাঁর আদর্শ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তাজউদ্দীন আহমদ যখন মারা যান, তখন তিনি অর্ধনির্মিত বাড়ি ছাড়া কিছুই রেখে যাননি।

তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার সারা জীবনের একটি অর্জন বলে উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, তাজউদ্দীন আহমদের দর্শন ছিল শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একটি সুষম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তাজউদ্দীন আহমদের চিন্তা-চেতনার প্রতি একমত পোষণ করে তিনি বলেন, অর্থনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চা ছাড়া রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া টেকসই হবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ এই ধরনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন।  

বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সাধনার ফসল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদের মতো আজ দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন। তাঁরই কন্যা অত্যন্ত শক্ত হাতে, সফলতার সাথে দেশ ও দলের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন-এ কথা ঠিক। কিন্তু তাঁর দল ও সরকারের সকল স্তরে জনকল্যাণকামী নেতা ও কর্র্মী এবং সরকারি কর্মচারিদের অভাব আজও রয়ে গেছে প্রচ-ভাবে যা রাজনীতির প্রতি জনগণের অনাগ্রহ ও অনাসক্তির প্রধান কারণ। এই নতুন বছরে-২০২০ সালে জনগণের এই অনাগ্রহ ও অনাসক্তি দূর করতে সরকারি ও প্রশাসনযন্ত্রের সর্বস্তরে যথাযথ পদক্ষেপ দেখতে চায় জাতি। বিরোধী দলগুলোও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে তাদের কর্মসূচি প্রণয়ণ এবং সর্বস্তরের জনগণকে সেখানে উদ্বুদ্ধ করলে অবশ্যই রাজনীতির প্রতি জনগণের আগ্রহ বাড়বে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের প্রতি নতুন  আস্থা তৈরি হবে – নতুন বছরে বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে এটাই আজ সচেতন দেশবাসীর প্রত্যাশা।