রাজনীতিতে সততা ও স্বচ্ছতা কমে আসছে!

সংলাপ ॥ রাজনীতির গতিপথ সর্বদা সর্পিল। সোজা ভাবনায় রাজনীতিকেরা বড় একটা চলেন না। সাদা এবং কালোর মধ্যবর্তী ধূসর রং তাদের দৃষ্টিকে বহু ক্ষেত্রেই আচ্ছন্ন করে রাখে। লাভালাভের নিজস্ব অঙ্কে তারা মগ্ন থাকেন। বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় ধর্ম প্রবণতা বেড়ে ওঠার পিছনেও এমন যুক্তি খাড়া করা যায়। বাংলাদেশে ধর্মীয় মেরুকরণ এখন যে অবয়ব নিয়ে প্রতিভাত হচ্ছে, তা অভূতপূর্ব। যে ধরনের ধর্মীয় কর্মসূচি রাজনীতির মূল স্রোতের সাথে কার্যত অভিন্ন বলে স্বীকৃত, গত এক দশকে তিল তিল করে তার পুষ্টি ঘটেছে। এখন কলেবর অনেকটাই স্ফীত। রাজনীতিকরা সেই স্রোতকে এখানে পথ দেখিয়ে এনেছে। সেই স্রোতে গা ভাসাতে বর্তমান সরকর কম যাচ্ছে না। প্রতিযোগিতামূলক ধর্মীয় রাজনীতির ফলে দেশে মূল্যবোধহীন আনুষ্ঠানিকতা পালনের ঘটা বেড়ে চলেছে।

কত বড় ধাক্কা খেলে আমাদের প্রশাসন বুঝবে যে, এ ভাবে প্রশাসন চলে না? প্রশাসনে বা শাসনক্ষমতায় থাকতে গেলে সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেই হয়। প্রশাসন কখনও শুধুমাত্র শাসকদলের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হতে পারে না। আইন ও প্রশাসনকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে হয়। আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর জন্য শাসকদল ও প্রশাসন পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, এই অনাচার কখনও নিয়ম হয়ে উঠতে পারে না। শাসনক্ষমতা হাতে নেওয়ার আগে যে কোনও রাজনৈতিক দলের রাজনীতিকদের উচিত সীমাবদ্ধতাগুলোর কথা জেনে নেওয়া। প্রশাসনকে সারাক্ষণ একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়ে রাখা যাবে, এমনটা আশা করে কোন দল শাসনক্ষমতা হাতে নেয়, তা হলে সমস্যা তৈরি হবেই। বাঙালি চিন্তায় সততা ও স্বচ্ছতা ক্রমেই কমে আসছে। উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্রের ঔদ্ধত্যে আইনের শাসনকে অগ্রাহ্য করতে অভ্যস্থ যারা, সাংবিধানিক কাঠামোকে তথা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে প্রতি মুহূর্তে মাটিতে মিশিয়ে দিতে উদগ্রীব যারা, একের পর এক নাশকতার মাধ্যমে হত্যাকান্ড চালায় যারা, তারা অবশ্যই দুষ্কৃতী। বর্তমানে রাজনীতির কারণে, সব দলের কাছেই, যুবসম্প্রদায় তথা ছাত্রছাত্রীদের মেধা যত না গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও দলীয় হিসাবে বেশি প্রয়োজনীয়। জনপ্রতিনিধিকে জনাবেগের কথা খেয়াল রাখতে হয়- প্রকৃত গণতন্ত্রে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। গোটা বিশ্বেই শ্রদ্ধাভক্তি দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা দরকার, সেটাও আজকাল আর দেখা যায় না। এরমধ্যে যা দেখা যাচ্ছে, তা রোগের উপসর্গ নয়, অসুখ গভীরতর হয়ে ওঠার লক্ষণ। সাংবিধানিক সীমারেখাগুলো রোজ একটু একটু করে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের মধ্যে একটা স্পষ্ট ভেদরেখা রয়েছে আমাদের দেশে। কিন্তু সে রেখাটাকে রোজ একটু একটু করে অস্পষ্ট করে দিচ্ছেন রাজনীতিকদের একাংশ। সাংবিধানিক অধিকারের গন্ডি ছাড়িয়ে অতিসাংবিধানিক চরিত্র হয়ে উঠছেন রাজনীতিকদের আর একাংশ।

দলীয় ক্ষমতা জাহির করে রাজনীতিকরা বার্তা দিতে চাচ্ছেন, তাদের কথা না শুনলে বেকায়দায় পড়তে হবে। এই প্রথম বার নয়, আগেও বহু বার অতিসাংবিধানিক হয়ে উঠতে গিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন রাজনীতিকরা। কিন্তু সতর্ক, সংশোধিত বা সংযত হননি, তা ফের প্রমাণ করে দিয়েছেন রাজনীতিকরা নির্বাচন নিয়ে । যা এত দিন অলিখিত ভাবে জানা ছিল এবং অপ্রকাশ্য ছিল, তা ক্রমেই এমন বেপরোয়া ভাবে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে যে, চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। প্রকাশ্য অতিসাংবিধানিকতা গণতন্ত্রের বিপদ ক্রমেই বাড়াচ্ছে। একমাত্র সংযত বাঙালি আবেগই হতে পারত জীবনিশক্তি। দিকে দিকে শত্রুতা, যা কোনভাবেই গোপন থাকছে না। বাঙালিরা কখনও ভুলবে না যে সঙ্কীর্ণমনা রাজনীতিকরা তাদের উচ্চাকাঙ্খা পূরণ করার জন্য বাংলা ও বাঙালির স্বার্থকেই বারবার যূপকাষ্ঠে চড়িয়েছে।