রাজনীতিতে শিক্ষাবিদের আগমনে নতুন সম্ভাবনা!

parash-daily-sun

শেখ উল্লাস ॥ বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের শীর্ষ পদ-চেয়ারম্যান হিসেবে ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের আগমন সাম্প্রতিক কালের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য একটি ভিন্নধর্মী ও ইতিবাচক ঘটনা বৈকি। সংগঠনটির  শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে দলটি মারাত্মক ইমেজ সঙ্কটে পড়ার পর কে হচ্ছেন চেয়ারম্যান-এই প্রশ্ন যখন মুখে মুখে ফিরছিল তখনই এই পদে ঘোষণা হলো একজন শিক্ষকের নাম। গত ২৩ নভেম্বর সরকার দলীয় গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গ সংগঠন-আওয়ামী যুবলীগের ৭ম কংগ্রেসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিপ্রায়ক্রমে সর্বসম্মতিক্রমে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় – ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশ।

অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশ মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে ও ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহচর শেখ ফজলুল হক মনি’র বড় ছেলে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সময় শেখ ফজলুল হক মনি এবং তাঁর স্ত্রী বেগম আরজু মনিকেও হত্যা করে খুনী মুশতাকচক্র। আরজু মনি তখন অন্তসত্বা ছিলেন। বর্তমানে ৫০-বছর বয়সী পরশের বয়স তখন মাত্র ৫ এবং তাঁর ছোট ভাই ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস ঢাকা-১০ (ধানমন্ডি) আসনের এমপির বয়স ছিল ৪। ফজলে শামস পরশ বিগত বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানমন্ডিতে তাঁর ছোট ভাইয়ের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু এর আগে এবং পরে তাঁর আর কোনো রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের নজির ছিল না। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ-ছাত্রলীগের কোনো কমিটিতেও ছিলেন না। এমনই অবস্থায় আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠনের প্রধান হিসেবে একজন পেশাজীবী শিক্ষককে বেছে নেয়ায় গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সচতেন মহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। এর ফলে আওয়ামী যুবলীগে ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ও কমিটি বিক্রির হোতাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে দেশে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির নতুন পথ চলা শুরু হয়েছে বলেই সচেতন মহল ধারণা করছেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দারিদ্র্য বিমোচন এবং যুব সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুবকদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে শেখ মনির নেতৃত্বে যুবলীগের জন্ম হয়। স্বাধীনতার আগে স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এবং এর পরবর্তী সময়ে যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা ও ছাত্র-যুবকদের বিরাট অংশের মধ্যে ‘মনিভাই’ হিসেবে পরশের পিতা শেখ ফজলুল হক মনির একটি বিরাট প্রভাব ছিল। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার সন্তান ফজলে শামস পরশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর আমেরিকার কলেরেডোর একটি ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি বিষয়ে আরেকটি  স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে দীর্ঘদিন ঢাকায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করে সম্প্রতি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে যোগদান করেছিলেন।

বিভিন্ন অপকর্মে সরকারি দলসহ দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনের ভাবমূর্তি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধ্যাপক পরশকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে রাজনীতির অঙ্গনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন। সাম্প্রতিককালে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে রাজনীতির দিনবদলের পালায় যে নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছে যাকে অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে চাইছে দেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নবনির্বাচিত মাইনুল হোসেন খান নিখিল আগের কমিটিতে সংগঠনের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ছিলেন। চাঁদপুরের মতলব থানার নিশ্চিন্তপুরের এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাইনুল হোসেন খান নিখিলেরও একটি স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে মিরপুরসহ মহানগর উত্তরের বিভিন্ন এলাকায়।

৭ম কংগ্রেসে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর বক্তৃতাদানকালে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পরশ বলেছেন, তার পিতা-মাতা এবং সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ে গভীরভাবে শোকাভিভূত হওয়ার কারণেই এতটা বছর তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। তবে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি তাঁর সামাজিক পরিম-লে একজন আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব যখন পেয়েছি তখন সততার সঙ্গে তা পালন করবো। যুবলীগের সভাপতি হিসেবে নয়, সংগঠনের একজন কর্মী হিসেবে কাজ করবো।’ তিনি বলেছেন, ‘নতুন প্রজন্মের মধ্যে ‘আই হেট পলিটিক্স’ বলে যে কালচার চালু হয়েছে তা থেকে তাদেরকে বের করে এনে তারা যাতে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিতে পারে সেই চেষ্টা করবো। রাজনীতি সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা গড়ে উঠেছে সেটাই আমরা ভেঙ্গে দিতে চাই।’

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধীকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন-সংগ্রামে, মহান মুক্তিযুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষাবিদদের একটি ভূমিকা ছিল যা ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে অস্তগামী হতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে রাজনৈতিক শক্তির অনেকটুকুই আজ ব্যবসায়ী, পরোক্ষভাবে হলেও সামরিক-বেসামরিক অবসরপ্রাপ্ত আমলাতন্ত্র, অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জনগণের কল্যাণে অঙ্গীকারাবদ্ধ না হয়ে ক্ষমতার স্বাদ নিতে আসার কারণে জাতীয় রাজনীতিতে শিক্ষাবিদদের ভূমিকা যখন নিভু নিভু, তখন একজন অধ্যাপকের এই আগমনকে নতুন আশা ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে চায় জাতি। অধ্যাপক পরশের রয়েছে বর্ণাঢ্য পারিবারিক ঐতিহ্য, তার জন্মদাতা পিতা  শেখ ফজলুল হক মনি মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে এদেশের সমগ্র যুবসমাজের বিরাট অংশকেই নাড়া দিয়েছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র সেজন্যই তাঁকে হত্যা করতে ভুল করেনি ৭৫’ এর ১৫ আগষ্ট। অধ্যাপক পরশ তাই বঙ্গবন্ধুসহ তার পিতার আদর্শের পথ ধরে দেশের যুবসমাজ তথা জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার পথে কার্যকর কর্মপন্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সফল হবেন-এমনটাই আজ প্রত্যাশা জাতির বিবেকবান মহলের।