রক্তের বিনিময়ে পাওয়া মাতৃভাষা বাংলা প্রচলনে আমরা উদাসীন কেন?

* ‘কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহা হইলে ইহা বেআইনী বা অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে’।

*‘যদি কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন, তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে’।

সংলাপ ॥ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ-এর সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ রয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য একটি নির্দেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্র করে তাঁর এই নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি।

সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধানাবলী পূর্ণরূপে কার্যকর এবং তৎসংক্রান্ত বিষয়ে বিধি প্রণয়নের জন্য ১৯৮৭ সালে জাতীয় সংসদে একটি আইন পাস হয়, যা ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ নামে মহামান্য প্রেসিডেন্টের সম্মতি নিয়ে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ থেকে আইনে পরিণত হয়েছে।

আইনটির ৩ (১) ধারায় বলা হয়, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধা সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সবক্ষেত্রে নথিপত্র ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে।’

আইনের (২) ৩ (১) উপধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহা হইলে ইহা বেআইনী বা অকার্যকর বলে গণ্য হইবে’। আইনের ৩ ধারায় বলা আছে, ‘যদি কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন, তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে’।

আইনে সুস্পষ্টভাবে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের নির্দেশনা থাকলেও এবং এই আইন অমান্য করলে কি শাস্তি হবে তার উল্লেখ থাকলেও আজও এই আইন পরিপূর্ণ কার্যকর করার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কোন সরকারের আমলেই। আইন অমান্য করার জন্য কারো বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের খবর এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আজো আইনটি অবহেলিত রয়ে গেছে। প্রয়োগ হয়নি। আইনটিকে আশ্রয় করে আর্জি নিয়েও কেউ আসেনি। ফেব্রুয়ারি মাসে শোকোচ্ছাস এবং বাংলা ভাষা চালুর জন্য আবেগ ও ভালবাসার আতিশয্য দেখা গেলেও কার্যত কোন আইনী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ২১ ফেব্রুয়ারি অমর শহীদ দিবস বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেলেও আইনী এই রক্ষা কবচটি ব্যবহারে কোন গতি আসেনি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনেরও কোন অগ্রগতি নেই। তাছাড়া কোনো সরকার আইনটিকে কার্যকর করার জন্য আজো কোন বিধি প্রণয়ন করেনি। ভাষা শহীদদের পরিবারবর্গের দুর্দশাগ্রস্ত অমানবিক আহাজারীর কথা কেউ শুনলে নিজেকে ধিক্কার না দিয়ে পারবে না! সচেতন বাঙালির জিজ্ঞাসা – সরকার কিংবা আদালত কি এর দায় এড়াতে পারে?