যাহা নিত্য তাহাই সত্য – ১৭

* ‘সকল কর্মের প্রারম্ভেই তুমি তোমার আল্লাহ্কে অবশ্যই স্মরণ করিও।’

             -সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন

* ‘ক্ষেতের ইটা ক্ষেতেই ভাঙ্গতে হয়।’

             -সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

* ‘ঘুম ভাঙ্গার পর চোখ মেলার আগেই তোমার আল্লাহ্কে স্মরণ কর।’

             -‘সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ’

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ বিশ্বজুড়ে সত্যব্রত আন্দোলন শুরু হয়েছে। আপনি/ আমিও এই আন্দোলনে একাত্ম হয়ে আত্মোন্নয়নের মাধ্যমে দেশ ও জাতির উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হতে পারি। দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে এখনই শুরু করি:

* জীবন একটাই সুতরাং নিজের সাথে নিজের প্রতারণা আর নয়।

* জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করি এবং কর্মে একনিষ্ঠ ও নিমগ্ন থাকি।

*নিজের বিচার নিজেই করি।

* নিজের সত্যকে খুঁজে বের করি এবং পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবতার নিরিখে উপলব্ধি করি।

* সার্বিক কর্মে সচেতন থাকি এবং আত্মবিশ্বাসে দৃঢ় হই।

* সেবার মাধ্যমে মানুষকে ভালোবাসি এবং শ্রদ্ধা করি।

* সত্যমানুষের পাশাপাশি চলে সত্যব্রতী বন্ধু হতে চেষ্টা করি।

এই আহবানটি ২০১৭ সালের। বর্তমান সংলাপের ২৫ বর্ষ ৪৩ সংখ্যায় এসেছে। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে জানা গেলো সত্যপ্রতিষ্ঠার এ নব যাত্রাটি শুরু হয়েছে একশত বছর পূর্বে যার প্রতিষ্ঠানিক যাত্রার এক নব সংযোজন ২০১৭-এ।

কালের সাক্ষী সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ। সত্য প্রতিষ্ঠার বহুমুখী পদচারণায় আমাদের জন্য রেখে গেলেন ‘হাক্কানী কথা’। দেখি কোন্ মুক্তো কুড়ানো যায় এ যাত্রায়।

হাক্কানী কথা: 

‘সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেছেন- ‘এ জগতে যে যত বেশী বুঝতে গেছে, সে তত পড়ছে পিছে। অজ্ঞান হলে থাকতো কাছে, পেয়ে যেতো সাথে সাথে চলার পথে।’ হাক্কানী শব্দের উৎপত্তি হক থেকে। হক অর্থ সত্য। মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ এবং গোষ্টিস্বার্থের মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে তখন সত্য আস্তে আস্তে উদ্ভাসিত হয়েছে। যে সকল ব্যক্তিত্ব তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন তাঁরা সত্যকে নিয়ে এগিয়ে গেছেন পৃথিবীতে শান্তি আনার জন্যে। ধারাবাহিকভাবে এটা চলে আসছে এবং রূপান্তরিত হয়ে আরবী ভাষায় ‘হক’ থেকে আসলো ‘হাক্কানী’ শব্দটি। হাক্কানী অর্থ সত্য। অপরদিকে হকের দুটো দিক আছে। একটি হচ্ছে আল্লাহ্র প্রতি হক আর একটি হচ্ছে আমি যে পরিবেশে আছি সেখানে আমার হক। এর বিশেষণ দেয়া হলো যখন ইসলাম ধর্ম আসলো। মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) যখন বললেন, মুসলিমদের জন্য ধর্ম হচ্ছে শান্তি। নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী তার একমাত্র কারণ- তিনি এমন শব্দ প্রয়োগ করলেন, ধর্ম হিসাবে যা আর কেউ করতে পারবে না। ইসলাম অর্থ শান্তি। মানুষের অন্বেষণ হচ্ছে শান্তিকে নিয়ে। এইজন্য তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। মানবজাতির ইতিহাসে যত নবী – রসুল এসেছেন সবাই শান্তির কথা বলেছেন, সত্যের কথা বলেছেন কিন্তু ধর্ম ‘শান্তি’ একথা নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ব্যতিত আর কেউ বলেন নাই। ধর্ম যখন শান্তি হিসাবে আসলো তার মধ্যে নিহিত আছে হক।

এই উপমহাদেশে সূফী সাধক আজানগাছি তা উপলব্ধি করেছেন এবং সত্যকে তাঁর আদর্শ ও দর্শন হিসেবে গ্রহন করে এগিয়ে গেলেন। তৎকালীন সময়ে যতগুলো তরিকা ছিলো, বিশেষ করে চারটি তরিকা এবং অন্যান্য তরিকার সাথে তিনি সমন্বয় সাধন করলেন। প্রত্যেকের কাছে তিনি গিয়েছেন, তাদের আদর্শ, নীতি এবং তাঁরা কোন পথে চলছেন তা তিনি জেনেছেন। জানার পর তিনি তৈরী করলেন ‘ হাক্কানী যা সকল তরিকার সারোৎসার। সত্য হলো দর্শন। সেই সত্যের ধারাবাহিকতায় তিনি দুটো দিকে অগ্রসর হলেন। একটি প্রতিষ্ঠানিক দিক অন্যটি আধ্যাত্মিক। আধ্যাত্মিক দিকে তাঁরই স্নেহ ধন্য হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন ‘হাক্কানী’ নিয়ে আসলেন বাংলার বুকে। তিনি লালন পালন করলেন সত্য দর্শনকে নিজ জীবনে। প্রতিটা মুহূর্তে চলার পথে তিনি সত্যকে আলিঙ্গন করে নিলেন। হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন তাঁর প্রধান খলিফা হিসাবে বেছে নিলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-কে। হাক্কানী দর্শনকে তাঁর হাতে তুলে দিলেন। তিনি তা নিয়ে চলা আরম্ভ করলেন। পৃথিবীতে এমন কোন তরিকা নাই যেই তরিকার সারোৎসার হাক্কানী তরিকায় নাই। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক প্রথমেই উপলব্ধি করলেন, বর্তমান পৃথিবীতে গতানুগতিক যে ধারা চলছে সে ধারায় হাক্কানীকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না এবং ইসলাম ‘শান্তি’ এটাকেও প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। তিনি ক্ষমতায় আসার পর হাক্কানী তরিকা হিসাবে প্রথমে নিয়া আসলেন। তাঁর কাছে যারা গেছেন তাদেরকে তিনি যার যার যোগ্যতা অনুসারে বিভিন্ন তরিকার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। যারা হাক্কানী হতে চেয়েছে তাদেরকে তিনি প্রতিষ্ঠানিক ও আধ্যাত্মিকতা এই দুটি দিকে পথ প্রদর্শন করেছেন। সত্যকে আলিঙ্গন করবে যে সে হাক্কানী। সত্যকে যে নিজের জীবনের সঙ্গে একাত্ম করবে সে হাক্কানী। জীবন চলার পথে একটি সত্যকে যিনি ধারণ করেছেন এবং লালন করেছেন তিনি হাক্কানী পথের যাত্রী। যত কর্মকান্ড আমরা প্রতিদিন করি তার মধ্যে অন্তত একটিকে বেছে নিয়ে যিনি সত্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি হাক্কানী পথের যাত্রী। আর যিনি পরিপূর্ণভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন যে আমি হাক্কানী হবো, সকল কর্মকান্ডের মধ্যে ‘ আমি’ সত্য প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিয়োজিত থাকবো তিনি হবেন হাক্কানী। হাক্কানী পথের যাত্রীও কালক্রমে হাক্কানী হতে পারেন। পৃথিবীতে যতদিন মানবজাতি থাকবে ততদিন সত্যের ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে। কখনো বা জোয়ারে অনেক দূর চলে যাবে কখনো বা ভাটির টানে স্তব্ধ হয়ে যাবে অথবা কিছুটা পিছিয়ে আসবে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলে গেছেন ‘দুনিয়াতে মিথ্যা বলে কিছু নেই’। আমি বলছি সত্য পথের যাত্রী আর হাক্কানী। প্রশ্ন উঠতে পারে মিথ্যা বলে যখন কিছু নেই তখন সত্য নিয়ে এতো কথা কেন? দুনিয়াতে মিথ্যা বলে কিছু নেই-এটা উপলব্ধির একটা স্তর, চেতনার একটা স্তর। হাক্কানীতে চেতনার স্তরকে সাতটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। চিন্তা জগতের সাতটি স্তরের সাথে এর সমন্বয় আছে। চেতনার একটি স্তরে উপলব্ধি হয়-দুনিয়াতে মিথ্যা বলে কিছু নেই, সবই সত্য। তখন ঐ স্তরে চলে আসে আত্মদর্শনের ব্যপার। যে নিজেকে, সত্যকে ধারণ-লালন-পালন করতে গিয়ে একটা স্তরে চলে আসে, যাঁর আপাদমস্তক সত্য ছাড়া কিছু নেই তাঁর কাছেতো সবই সত্য। এই স্তরে উর্দ্ধরণ সহজসাধ্য নয়। এজন্য প্রথমেই জীবনে একটা সত্য নির্ধারণ করতে হবে। প্রশ্ন আসতে পারে কেন একটা সত্যকে নির্ধারণ করবো জীবনে? পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম কি আছে যে-এককে ছাড়া চলছে? সেই এক-কে যখন আমি ধারণ করবো নিজের মধ্যে তাকে লালন করতে হবে। একাত্ম ঘোষণা করার মানেই হলো আমি তার মধ্যে ঢুকে গেলাম। আল্লাহ্ এক, সত্যও এক। পৃথিবী যত মানুষের সংস্পর্শে আমি এসেছি তার মধ্যে কাকে আমি বেছে নিলাম, যাকে আমি ধারণ করবো, লালন করবো, পালন করবো ? সত্য কি মিথ্যা – এটা দেখার ব্যপার না, যারা ধারণ ও লালন করে তাদের কাছে সবই সত্য। যে সত্যের অন্বেষণ করতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রথম খলিফা আবু বকর ‘সিদ্দিক’ হলেন। নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) আবু বকরকে সম্মানসূচক সিদ্দিক বলে ডাকলেন। এ সম্মান কিন্তু আর কেউ পায়নি। সত্যকে নিয়ে যখন আমরা যাবো, আমরা কথা বলবো, তখন প্রত্যেকে নিজস্ব চিন্তার মধ্যে একটা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। হতে পারে বিষয়, হতে পারে সম্পদ, হতে পারে একজন ব্যক্তিত্ব। যেখান থেকে ‘হাক্কানী স্কুল অব থট’ বের করলেন লক্ষ্য। তোমার জীবনের লক্ষ্য কি? চূড়ান্ত লক্ষ্য কি? আশু লক্ষ্য কি? সেই আশু লক্ষ্যের সাথে চূড়ান্ত লক্ষ্যের কোন সমন্বয় তুমি সাধন করতে পারছো কি-না। না এটা তোমার মুখের কথা, কথার কথা। এই সত্য নিয়ে সূফীতত্ত্ব তৈরী হলো। সূফীতত্ত্বের উৎপত্তি সত্যকে নিয়ে, আর একাত্ম নিয়ে। সূফীতত্ত্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে-‘ ওয়াননেস উয়িথ ওয়ান ’। কেন্দ্রবিন্দু কোনটি হবে তার প্রথম দিকনির্দেশনা দিলেন হযরত আজানগাছি তাঁর ভাবশিষ্যদের মধ্যে।  আর একদিকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করলেন হাক্কানী আঞ্জুমান এবং প্রতিষ্ঠানিকভাবে তারা এগিয়ে গেলেন। হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন তা দিয়ে গেলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক সূফীতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব প্রাপ্ত হলেন। তাঁর কাছে যারা যেতেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বেছে নিয়ে তিনি বল্লেন যে প্রতিষ্ঠান কর।

১৯৯০ সনে প্রতিষ্ঠিত হলো হাক্কানী মিশন, প্রতিষ্ঠিত হলো হাক্কানী খানকা শরীফ। হাক্কানী মিশন আসার পর একে একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া আরম্ভ হলো। এদের সঙ্গে কারো ঝগড়া নাই, কোন হানাহানি নাই, যার যার ধর্ম তার তার কাছে। সবার উপরে মানুষকে প্রাধান্য দেয়া হয় হাক্কানীতে, তার যোগ্যতা অনুসারে। তাই বলে পার্থিব যেসব যোগ্যতা নিয়ে আমরা পৃথিবীর বুকে আছি, এটা না। হাক্কানীতে যোগ্যতা দেখা হয় সত্যের সাথে একাত্ম হয়ে কে কতটুকু পথ এগিয়ে গেছেন এবং জীবন চলার পথে কে কতটুকু পরিবর্তন আনতে পেরেছেন, সত্যের কাছে কে কতটুকু সমর্পিত হয়েছেন-এর ভিত্তিতে। কোনটাই করতে হাক্কানীতে বাধা নাই। যেটার মধ্য দিয়ে যাবেন, সেটার মধ্যেই সত্য অন্বেষণ করেন, নিজের মত করে। পৃথিবীর বুকে যতগুলো তরিকা এসেছে কেউ সত্যকে ছাড়া চলতে পারবে না, শান্তি ছাড়া চলতে পারবে না। সত্যের সঙ্গে একাত্ন ঘোষনা করতে গেলেই কেবল অনুধাবন করতে পারবেন যে বেশীরভাগ মানুষই ধর্মের নামে যা করে যাচ্ছে তা মিথ্যাচার। পরিপূর্ণ মিথ্যাচার।