মৃত্যু বলে কিছু নেই আছে রূপান্তর….

S M Shah Nawaj ali

সংলাপ ॥ কালের নিরবিচ্ছিন্ন প্রবহমান স্রোতে জীবন আসে, জীবন যায়। এ অমোঘ সত্য সকলেরই জানা। তবু জীবনের নতুন আগমনী বার্তায় মানুষ আনন্দিত হয়। কাঙ্খিত ঔৎসুক্য নিয়ে সে অধীর প্রতীক্ষায় থাকে, রোমাঞ্চিত হয় নতুন জীবনের বার্তা শুনবে বলে। যখনই সেই প্রত্যাশার যথার্থ প্রতিফলন ঘটে তখনই সে উৎফুল্ল হয়। আনন্দের বাধভাঙা স্রোতধারায় অবগাহন করে সে শুকরিয়া জানায় কাল ও কাল-স্রষ্টাকে। কিন্তু সেই কাঙ্খিত জীবন যখন কালেরই নির্মম নিয়মে চলে যায় দৃষ্টির আড়ালে ব্যাথাতুর হৃদয় তখন হাহাকার করে ওঠে। প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় কষ্টে মথিত হয় স্বজনেরা। এও সত্য বড়। স্নেহ-প্রেম-ভালবাসা-মায়া-মমতা’ – এই সব তরল ও সরল স্বভাব নিয়ে তরলিত হৃদয় আনন্দ-বেদনার দোলাচলে দুলবেই।

তবু এই সত্য মেনে নিতে কষ্ট হয়। মন মানে না। কিছুক্ষণ আগেও অস্তিত্বমান জীবন কেন হারিয়ে যাবে, নিঃশেষ হয়ে যাবে চিরতরে! এ কেমন ভাঙনের খেলা? যুথবদ্ধ জীবনের লালিত স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে কেন বেজে ওঠে বিদায়ের সুর? পার্থিব সংসারে যাপিত জীবনের সকল বন্ধন ভেঙে ফেলে কোন্ আহবানে জীবন ছুটে যায় স্বজন-সংসার ছেড়ে? অনেক যত্নে তিল তিল শ্রমে ও ঘামে, মেধায় ও মননে, মায়া ও মমতায়, স্নেহ ও ভালবাসায়, ভক্তি ও প্রেমে গড়ে তোলা আপন সংসার ও স্বজন রেখে কেন, কীভাবে চলে যায় মানুষ? কেমন করে সম্ভব?

স্বজন হারানো চিত্তে এমন হাজারো প্রশ্নের তীর ঘাতক কাটার মত বার বার আঘাত করে। শোকাতুর স্বজনেরা তখন ব্যথিত চিত্তে খোঁজে উত্তর, সামান্য স্বান্তনা। কিন্তু কোথাও কি তা মেলে? এমনই নির্মম আঘাতে স্বজনদের জর্জরিত করে দিয়ে স্বান্তনাহীন এক দুর্বোধ্য কালিক সত্যের হাত ধরে বিদায় নিয়েছেন এস. এম. শাহ্ নওয়াজ আলী। সত্যে বিলীন হয়েছেন তিনি। আর চরম সত্য রেখে গেছেন ১২ নভেম্বর, ২০০২কে তাঁর স্বজনদের কাছে। সত্যের আগুনে ঝলসানো স্বজনেরা সংযমের সে মাসের দীক্ষাকে ধারণ করেছেন নির্বিকার চিত্তে। সত্য সুন্দর বটে। তবে সত্যের নির্মম কাঠিন্যই বুঝিয়ে দেয় – ‘এ জগৎ স্বপ্ন নয়।’ বিগলিত, স্বপ্নাতুর মানুষের পক্ষে তাই সব সময় সত্যকে মেনে নেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবু মেনে নিতে হয়। জাগতিক জীবনের ঘূর্ণিপাকে অস্থির চিত্ত নতুন আশ্রয় খুঁজে নেয়। এও সত্য। তখন ঘটমান সত্য হয়ে যায় স্মৃতি। ফ্রেমে বাধা পড়ে সেই সত্য ঠাঁই নেয় অন্তরালে স্বজনেরই হৃদয়ে। এস. এম. শাহ্ নওয়াজ আলী আজ বাধা পড়েছেন অন্তরের ফ্রেমে। স্মৃতির সবুজ দিগন্তে তাঁর অসীম যাত্রা।

ঘটমান সত্যের উর্বরা ভূমি খুঁড়ে যে কেউ বলবে কেমন দরদীপ্রাণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন শাহ্ নওয়াজ। কর্তব্য ও দায়িত্ব বোধে সজাগ চিত্ত শাহ্ নওয়াজ নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন আজীবন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীটা শুধু সার্টিফিকেট হয়েই থাকেনি, সমাজ-সংসারে সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছেন পুরোদস্তুর। আত্মীয়-স্বজনের মাঝে যখন যে কেউ বিপদগ্রস্ত হয়েছেন নির্বিঘ্নে চিত্তে দ্বিধাহীন ভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। স্বজন বলেই নয়, মানুষের জন্য মানুষের এই টান, আকর্ষণ, মহব্বত, কর্তব্যবোধই একজন মানুষকে মহত্ত্বের অবস্থানে আসীন করে। এটাই একজন মহৎ মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। মানুষ যে মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এটাই তার মূল কারণ।

নির্দ্বিধায় বলা যায় কেবলমাত্র এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বছরের পর বছর ধরে স্মরণের মাঝে জাগ্রত আছেন মিরপুর আস্তানা শরীফে। ১৯৭৮ থেকে ২০০২ দীর্ঘ ২৪ বছরের চাকরি জীবনে দায়িত্ব সচেতন, সৌহাদ্যপূর্ণ এবং দক্ষ ব্যক্তিত্বে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মানুষকে আপন করে নেয়ার আদবটা ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন তিনি আস্তানা শরীফ হতে। তাই তিনি তা পারতেন সবার মঙ্গলার্থে। আর পারতেন বলেই তিনি এতটা আপন হতে পেরেছিলেন নির্বিশেষে সবার কাছে। এ জন্যেই তাঁর প্রয়াণের সত্যতাকে সহজে মেনে নিতে পারেননি, এখনো পারছেন না তাঁর স্বজনেরা। এ যেন অবিশ্বাস্য এক দুর্ঘটনা। এ মেনে নেবার নয়। যুক্তির উর্ধ্বে।

শুধু সমাজ-সংসার নয়, মাঙ্গলিক চিন্তার পূজারী শাহ্ নওয়াজ আলী দেশমাতৃকার জন্যেও ছিলেন সচেতন। তারুণ্যের দুর্দান্ত সময়টাকে তাই তিনি বিফলে নষ্ট করেননি। শত্রুর মুঠো আগলে দেশকে মুক্ত করতে হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে গর্বিত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু কখনো এই পরিচয়কে ভাঙিয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নেননি তিনি। বাঙালি হিসাবে দেশ, দেশের রাজনীতি, জাতি, জাতীয়তা তাঁকে ভাবিয়েছে বার বার। দেশের চলমান অস্থিতিশীলতা, বিশৃঙ্খলা, বৈষম্য, অনিয়মে তাঁর উদ্বেলিত কণ্ঠের নানা কথা আজও তাঁর চারপাশের মানুুষের স্মৃতিপটে ভাসমান। একটি সুন্দর শান্তিময় বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। জাতীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে তাঁকে ১৩ নভেম্বর ২০০২ সনে মিরপুরের কালসী গোরস্থানে। শুয়ে আছেন ঘুমে মগ্ন হয়ে মায়ের পায়ের কাছে ভাই, ভাইপো ও বড় ছেলের সাথে।

তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য – ‘দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা’ তাঁকে সম্পৃক্ত করেছে মানব কল্যাণমূলক কর্মকান্ডে। তিনি সম্পৃক্ত হয়েছিলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর মিরপুর আস্তানা শরীফের সঙ্গে। উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য হিসেবে একাত্ম হয়েছেন দরবারের সার্বিক কর্মকান্ডে। শুধু তাই নয় হাক্কানী মিশন বাংলাদেশের লক্ষ্য – ‘ধর্ম মানবতার জন্য’ এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন মিশনের ধর্মভিত্তিক মানব কল্যাণমূলক নানাবিধ কর্মকান্ডে। বাইরের আবরণ হয়ে নয়, রুধির ধারার মতই গোপনে নিজের কল্যাণিক ভূমিকাকে তিনি সতত প্রবহমান রেখেছেন। তাই তাঁর অবদানকে ভোলা যায় না। একজন ‘দরবারী ও মিশন-সদস্য’ হয়ে তিনি যে নিদর্শন রেখে গেছেন তা অবশ্যই দৃষ্টান্ত স্বরূপ এবং থাকবে চির অম্লান।

আব্দুল হামিদ ও সাজেদা খাতুনের আশীর্বাদপুষ্ট সন্তান শাহ্ নওয়াজ আলী সকল বন্ধনকে অতিক্রম করে আত্মব্যাপ্তি ঘটিয়েছেন স্বজনের অন্তরে অন্তরে। তিনি চলে গিয়েও আছেন। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনও। থাকতেই হবে। সত্যের চূড়ান্ত সত্য তুলে ধরতে তিনি আমাদেরই মাঝেই যে ‘বর্তমান’ ॥