মুদ্রার দুই পীঠই সচল থাকতে হয়

নজরুল ইশতিয়াক ॥ নিজেদের খেয়াল খুশি মতো কোন একটি তত্ত্ব কিংবা তকমা দাঁড় করানোই শেষ কথা নয়। যেমন সরকার তাদের নেয়া বিশাল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞকে ব্যাপক প্রচারের আওতায় এনে গণমানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। একই সাথে কিছু শ্লোগান, নীতিবাক্য বাজারজাত করে অপরাপর সমস্ত ভুতুড়ে শক্তিকে দুর্বল করতে চাচ্ছে। যা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হতে পারে। পর্যবেক্ষণ বলছে ক্রমাগত রুগ্ন হচ্ছে, কোথাও কোথাও সংকুচিত হচ্ছে বাক-চিন্তার জায়গাটি। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ধারাগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও থামিয়ে দেয়া হচ্ছে জোর করে। নানা পন্থায়, নানা নামে অলীক কাল্পনিক ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে প্রান্তিক পর্যায়ে, নগরের অলিতে-গলিতে। সামাজিক কাঠামো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। আর সেখানে লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে ঈমান-আকীদার নামে ভয়ংকর জীবন নাশক মলম। ফলে কবিতা লেখা হয় কিন্তু কবিতা পাঠ কিংবা আলোচনার পরিবেশ নেই। অনেকে সামাজিক বিশ্লেষণমূলক লেখা লেখেন সেগুলো নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা হয় না। এমন কি আগে অনেক পরিবারে শিল্প সংস্কৃতির চর্চা-চর্যা হতো প্রকাশ্যে, এখন হয় না কারণ ঈমান আকিদা রক্ষার চাপ বেড়ে গেছে। বই মেলায় অসংখ্য বই প্রকাশ হয় কিন্তু বই নিয়ে বস্তুত কোথাও কোন আলোচনা নেই। শত সংকটেও যাত্রাশিল্প মূল্যবোধের কথা তুলে ধরতো কিন্তু মাঠ পর্যায়ে যাত্রা শিল্প একেবারেই হারিয়ে যাপার পথে। পালা গান, বিচার গানের কফিনেও পেরেক ঠুকে দেয়ার মহা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে, গাইতে পারছে না বাউল গান কারণ ঈমান আকিদা নাকি ধ্বংস হচ্ছে। এমন বহু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা যাবে সারা বাংলায় যা ক্ষমতাসীনদের ভাবায় না।

এটা সাধারণ সত্য যে, ভয়াবহ কিছু আকস্মিক ঘটে না। একটি উপযোগীতা দীর্ঘদিন ধরে তৈরী হতে থাকে এবং তা বিস্ফোরণমুখ হয়ে প্রকাশ পায়। সমাজ একটি বহুমাত্রিক মিশ্রন। নানামুখি শক্তির খেলা চলে প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত। শুধু অভ্যন্তরীন উৎস থেকেই নয়, বৈশ্বিক দুনিয়ার বহু ক্ষতিকর জীবানু অনায়াশে ঢুকে পড়ছে আজকের সমাজে। বিশেষ করে আমাদের মতো অরক্ষিত সংস্কৃতির দেশে। এখানে কোন বাধা ছাড়াই বাজারী পণ্যের মতো সংস্কৃতি বাজারজাত করা যায়। আর এটি আমদানী করার কাজে আমাদের মা-বাবা, দাদা-দাদী, কন্যা শিশুরাও পারদর্শী। তারা তো মহাপ্রতাপে সিরিয়াল দেখাতে ব্যস্ত। এখানেই নিয়ন্ত্রণের কোন ব্যপার নেই আর এখানেই প্রবল হয়ে দেখা দেয় জাতীয়তাবোধের প্রশ্ন সচেতন মহলে। জাতীয়তাবোধকে যারা সংকীর্ণতার চোখে দেখেন তারা বাস্তবতাবর্জিত তর্কবাজ। এদেরকে শিক্ষিত মূর্খ বলা যেতে পাওে নির্দিধায়। আবার আমরা এমন অসংখ্য তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর কবলে পড়েছি যারা বহুদূরের গাল গল্পকে বাজারজাত করতে নিজেদের দরকারী জিনিষ ভুলিয়ে দিচ্ছেন। কেবলমাত্র পজিশনের কারণে এরা মনগড়া সব তত্ত্ব আওড়িয়ে চলেছেন সকল প্রকারের মিডিয়ায়। গণতন্ত্র-সুশাসন-মানবাধিকার-ধর্ম নিয়ে কথা বলছেন। আর সংবাদ মাধ্যমগুলো নিজেদের সংকীর্ণস্বার্থে এগুলো প্রচার করেন। যখন বুদ্ধিজীবী, লেখক, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মীর জন্ম হয় টেলিভিশন-পত্রপত্রিকায় তখন বিষয়টি গবেষনার। প্রযুক্তি নির্ভরতার কারণে এসব প্রচার গিলতে বাধ্য হচ্ছে জনগণ। আজকাল তথাকথিত আলেম সমাজ প্রযুক্তি সুবিধা কাজে লাগিয়ে চরম অরুচিকর এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এরা  সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে নানামুখি ফন্দি ফিকিরের আশ্রয় নিচ্ছেন। কিভাবে নিজেদেরকে চড়া দামে ভাড়া খাটানো যায় সেটি তারা ভালোভাবে রপ্ত করেছেন।সাধারণ ধর্মভীরু মানুষ অজ্ঞতার কারণে মধ্য রাত পর্যন্ত ঘুম ঘুম চোখে বসে এদের কথা শোনে। কেউ যেন ঘুমিয়ে না পড়ে এ জন্য কথায় কথায় বিশেষ শব্দমালা আর হিন্দিগানের-বাংলাগানের সুরে শ্রোতাদের উদ্দীপ্ত করতে বাধ্য করেন। জোর করে নিজেদের মনগড়া যুক্তির পক্ষে মতামত নেন। যাতে সাধারণ মানুষ সেসব তথাকথিত মোল্লাদের কাছে দেয়া ওয়াদার খেলাপ না করেন। আজকাল তো কোন কোন ওয়াজ মাহফিলে সতর্ক করে দেয়া হয় ওয়াজের মাঠে না আসলে কিয়ামতের দিন দায়ী থাকতে হবে! হাল আমলে বহু ওয়াজকারী নামি-দামী ব্রান্ডের গাড়ীতে করে সাঙ্গপাঙ্গ সহ উপস্থিত হন। সাধারণত আয়োজক, বাজার কমিটি, ঘাট কমিটি টাইপের উদ্যোক্তরা যখন বায়না করতে আসে এ্যাডভান্স মূল্য পরিশোধ সহ লোক সমাগমের সংখ্যাও অবগত করেন। ফলে নিরুপায় আয়োজকরা আদাজল খেয়ে লোকজন জোগাড়ে মাঠে নামেন। অনুসন্ধান বলছে হাল আমলে প্রত্যেকটি আয়োজক কমিটি স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকারী দলের নেতা কর্মীদেরকে সম্পৃক্ত করার মিশনে নেমেছেন।

ভোট ও আঞ্চলিক রাজনীতির জন্যই এমনটি হচ্ছে। অথচ এসব স্থানীয় প্রভাবশালীদের উপস্থিতিতেই দেশ-সংবিধান-মুক্তিযুদ্ধ পরিপন্থী কথা বলা হয়। জাতীয় সংগীত, পহেলা বৈশাখ, মাতৃভাষা দিবস পালনকে গর্হিত কাজ বলে প্রকাশ্যে এসব মোল্লার দল প্রচার চালিয়ে যান কিন্তু তাদেও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উত্থাপন করা হয় না, কারণ রাজনৈতিক নেতা আর এমপি মন্ত্রীও সেসব জমায়েতের বড় চেয়ারের অতিথি। এসব চরিত্রহীন আলেমদের অঙ্গভঙ্গির মধ্যে কোন সৌন্দর্য-শিষ্টাচার নেই, চরম অশোভনীয় গল্পবাজ চাটুকার। সংশোধনের অতীত এসব নষ্টভ্রষ্ট চরিত্রহীন আলেমদের হাত থেকে সাধারণ ধর্মভীরু মানুষদের রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। সত্য তুলে ধরার কাজটি করতে হবে স্বেচ্চাসেবক ঈমানদার দেশপ্রেমিক হিসেবে। সচেতন করতে হবে সাধারণ ধর্মভীরু মুসলিমদেরকে। উন্নয়নের নামে ইট কাঠ পাথরের স্তুপের মধ্যে কি কি জন্ম নিচ্ছে, জন্ম দেয়া হচ্ছে সে ব্যাপারে নজর না রাখলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরী হয়। ধসে পড়তে পারে আপাত শক্তিশালী বৃক্ষও। ভারসাম্যহীনতার ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে ক্ষমতার মসনদ। ফলে সমাজে যদি চিন্তন পীঠ কার্যকর না থাকে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কার্যকর না থাকে, তবে আগাছারা মাঁথা তুলে দাঁড়াবেই। তখন সরকার সামলাতে পারবে তো বাস্তবতা? ভবিষ্যত বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্ধি বাংলাদেশের ভেতরেই সৃষ্টি হচ্ছে-চরমভাবে বিকশিত হচ্ছে। কার্যকর উদ্যোগ গৃহীত না হলে সকল আধুনিকতা আর উন্নয়ন কোন ধুলায় লুটাবে তা কেউ চিন্তাও করতে পারবে না।