মুজিববর্ষের ক্ষণ গণনা শুরু ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হতে

অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ এ, দেশে ফিরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়কে ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন- ‘আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে’। কৃতজ্ঞতা চিত্তে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলার মায়েদের-সন্তানদের কথা স্মরণ করেন। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-বুদ্ধিজীবীদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বাঙালির অনগ্রসরতা অস্পৃশ্যতা সম্বন্ধে বঙ্গমাতা কবিতায় লেখা বিশ্বকবির আক্ষেপের জবাব দিতে গিয়ে বলেন-‘কবিগুরু আপনি বলেছিলেন-সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙ্গালি করে মানুষ কর নি’। আপনার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বাঙালিরা আজ মানুষ হয়েছে। এত আত্মত্যাগ দুনিয়ার কোথাও হয়নি। কেউ আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারেনি।

দীর্ঘ বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের নানা দিক তুলে ধরেন। রাষ্ট্রের চরিত্র, নীতি কাঠামোর বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। জাতির জনকের সেই সেই ভাষণটি আমরা চাইলেই দেখে নিতে পারি।

‘১৯৭২ থেকে ২০২০’ এই দীর্ঘ সময়ে জাতির জনকের বাংলাদেশ কোন পথে অগ্রসর হয়ে কোথায় অবস্থান করছে সেটিই এখন দেখার বিষয়। খোদ বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের শ্রমে-ঘামে গড়া বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কিংবা ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলো সেই সত্য কতটা অনুধাবন করেছে?

আজকে চুলচেরা বিশ্লেষণের সময় এসেছে। শুধু বিশ্লেষণ নয়, সময় এখন সত্য বলার এবং সত্য প্রতিষ্ঠার।

দেশের ভিতরে অন্য কোন দেশ থাকতে পারে না। বাঙালি সংস্কৃতির রঙ অন্য কোন রঙে ফিকে হতে পারে না। আমরা অন্যের মতো হতে পারবো না, নিজেদের ধরে রেখে অন্য সব সুন্দরের পুজারী হতে পারি কেবল। আমাদের ভূগোল-সংস্কৃতি-প্রকৃতি কারো চাওয়াতে পাল্টানো যাবে না। এ দেশের প্রতিটি মানুষের রক্তধারায়-যাপিত জীবনের উৎসধারায় বয়ে চলেছে এক শ্বাশত চিরন্তন সত্য ধারা, সেখানে মিশতে হবে, কান পেতে শুনতে হবে সুন্দরের সেই জয়গান। যতটুকু নবায়ন হবে সেই উৎস ধরে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-‘বাঙালির পল্লীর জনজীবনের গভীরে রয়েছে উৎস। সেই উৎস ধরেই নির্মিত হবে আমাদের সব আয়োজন’।

১৯৭১ আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছে। এই স্বাধীনতা অর্থবহ করার সংগ্রামই তো অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা। ’৭১ ছিল মুক্তি সংগ্রামের একটি ধাপমাত্র।

মুক্তি সংগ্রাম কখনো থামেনা। অজ্ঞতা থেকে উৎসরিত হয় যে অন্ধকার, সে অন্ধকারের মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া- পলায়নপরতা  থেকে মুক্তির যে সক্ষমতা তাই তো মুক্তির সংগ্রাম।

যে পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেই পথ কতটা কঠিন, কত ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় কোথায় বাধা সেটি নির্নয় করে এগিয়ে চলার নামই তো দূরদর্শীতা। এ বছরের ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে মুজিববর্ষ ক্ষণ গণনা। গৃহীত হয়েছে নানা আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। দলীয় কর্মসূচীর বাইরে সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সারা বছরব্যাপী কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। সেসব কর্মসূচীর হয়তো যৌক্তিকতা রয়েছে তবু অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ণের জায়গাটি দেখার সময় এসেছে। বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে যারা এখন মুজিববর্ষ উদযাপন নিয়ে তৎপর সেসব প্রতিষ্ঠানের সেবার মান, কাজের মান, তাদের প্রতি জনগণের ধারণা মুজিববর্ষ পালনের সত্য তুলে ধরতে পারে। আমলাতান্ত্রিকতার নামে জনগণের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার সকল রুট বন্ধ করার কাজটি যদি না হয়, তবে মুজিববর্ষ উদযাপনে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেসব কাজ কোন উপকারে আসবে? সেবার নামে, শিক্ষার নামে, শিক্ষক চিকিৎসকেরা যদি নিজেরাই নিজেদের কর্ম মূল্যায়ণ করতে না শেখেন তবে তারা কোন মুজিববর্ষ পালন করবে? এসব লোক দেখানো কাজ আমাদের এগিয়ে চলার পথে অন্তরায় হতে বাধ্য। 

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা শুরু হলো’।

ইতিহাস সচেতন নির্মোহ দেশপ্রেমিকেরাই কেবল অন্ধকারের দিকটি জানেন। জানেন কোন পথে বাঙালির বিজয় সম্ভব হয়েছে। জানেন পথের বাঁকে বাঁকে কোন সত্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু যারা বহু পড়াশুনা করেও সত্য উপলব্ধির পর্যায়ে আসতে পারেন নি তারা অন্ধকারের আরেকটি দরজা উন্মোচন করেছেন মাত্র। এরা বর্ণচোরা চরিত্রহীন ঘাতক হয়ে বাধার সৃষ্টি করছেন। আত্মকর্ম বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে দেখতে হবে নিজেদের আমলনামা। আলো এবং অন্ধকার তো পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে চলে। আজকে আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশের আলো বাতাস মাটিতে বসে নিজেদের কথা বলতে পারছি, নিজেদের স্বপ্ন-সম্ভাবনার জয়গাঁথা নিয়ে আত্মতুষ্ট হচ্ছি, নিজেদের অধিকার দাবী দাওয়া নিয়ে সোচ্চার হচ্ছি এসবই অন্ধকার থেকে আলোর নবতর পথে যাত্রা। বিপরীতে অপরাধ মেনে নেয়ার প্রবণতার নামও অন্ধকার। আপোষ কিংবা মেনে নেয়া কখনো কখনো বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়ে পড়ে।

আমরা কি দেশ বিরোধী মানবতা বিরোধী সমস্ত অকল্যাণকর প্রচেষ্টা কে রুখে দিতে পেরেছি? অলীক কল্পকাহিনী নির্ভর খোরমা খেঁজুরের গল্পের বিপরীতে নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনাদর্শ তুলে ধরতে পারছি? নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর বর্ষিত) এর শিক্ষা দর্শনকে  বিকৃত করার প্রচেষ্টার বিপরীতে প্রকৃত সত্য তুলে ধরার নামই তো আলোর পথে অগ্রসর হওয়া। যদি না পারি তাহলে কি অন্ধকার থেকে আলোর পথের এই যাত্রা, কোথায় কোন অবস্থান কোন ফাটকে আটকা পড়েছে তা খুঁজে বের করার নামই আলো। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর বর্ষিত) এঁর  মহান জীবনের  গভীরতাকে বাস্তবতার নিরিখে অনুধাবন না করে কল্পকাহিনী নির্ভর ওয়াজ নসিহত আমাদেরকে অন্ধকারের গভীর তিমির নিয়ে যাবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমরা এদিকটা উপেক্ষা করেই এগিয়ে যেতে চাচ্ছি, যা সম্ভব নয়। এখানে কাজ করতে হবে।

অন্ধকার থেকে আলোর পথের এই যাত্রা সব সময় চলমান। জানি এই পথটি কঠিন, মুখের কথা নয়। কিন্তু যারা মুজিব আদর্শকে ধারণ-লালন-পালনের কথা বলেন তারা যদি নিজেরাই হন্তারক হয়ে উঠেন তবে এই সীমাহীন নির্লজ্জতার জবাব আমরা কোথায় খুঁজবো?

শুধু দলীয় কর্মী নন, শুভাকাঙ্খি হয়ে আসা শিক্ষক বুদ্ধিজীবিদের একটি শ্রেণীও আজ ধান্দাবাজ হয়ে উঠেছে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেই ক্ষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- এই দেশ সবার। হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রীষ্টানের রক্তে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। তিনি তার ভাষণের শুরুতে ছাত্র-মজুর-কৃষক-শ্রমিকের কথা বলেছেন। আজকে স্বাধীনতার এই ৪৯ বছরে আমাদের কৃষকরা কেমন আছেন, কেমন আছে শ্রমিক মজুর খেটে খাওয়া মানুষেরা? উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় কি তারাও সমান তালে যুক্ত হতে পারছেন? তথ্য পরিসংসখ্যান বলছে আরো অযৌক্তিক দূরত্ব তৈরী হয়েছে। শিক্ষার নামে দেশে কোন কোন শিক্ষা পদ্ধতি জারি রয়েছে, তা চুলচেরা বিশ্লেষণের দাবী রাখে। স্বাধীন দেশে শিক্ষার নামে জাতি-মানবতা বিরোধী পশ্চাৎপদ শিক্ষার ধারা আজও অব্যাহত। যারা যুক্তি মানে না, সৌন্দর্য মানে না, আইন-কানুন সংবিধান মানে না, তারা আখেরে কোন সেবা নিশ্চিত করবে? না কি বিভেদ-বিভাজনের দেয়াল শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ কোন বিপর্যয়ের মুখোমুখি করবে আমাদেরকে, এমন প্রশ্ন তুলতেই হবে।

আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে পারিনি। এটা তো সত্যি যে হাজার হাজার মানুষ কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সহিংসতার স্বীকার হয়েছে। কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রামু নাসিরগর ভোলার মানুষ চরম সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে। ’৭২ এর সংবধিানের ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা হিসেবে বাজারজাত করতে সফল হয়েছে। চতুর এসব বর্ণচোরা ঘাতকেরা ধর্মভীরু মুসলমানদেরকে প্রগতি বিরোধীতার কাতারে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। এসব তৎপরতার বিপরীতে কি কোন বাস্তব সম্মত কার্যক্রম আদৌ গ্রহণ করা হয়েছে?

ইসলামিক ফাউন্ডেশন তো সময়ের পথপরিক্রমায় নামেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন হয়ে আছে। তাদের কার্যক্রম পবিত্র ইসলাম ধর্মের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তুলে ধরতে ব্যর্থ। লুটেরাদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতি, সামাজিক দুর্বৃৃত্তায়নের স্বীকার হয়েছে আমাদের সাধারণ মানুষ, আমরা কি সেই অন্ধকারের দিকটি অন্বেষণ করতে পেরেছি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়- চরিত্রহীনদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে কখন যে নিজেরাই চরিত্রহীন হয়ে গেছে তা আমরা নিজেরাই জানি না। সত্য বড় নির্মম। ৭৫’ এ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা যাদের জন্য অনিবার্য ছিল, আর যারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি, উভয়েই এই দেশের বাসিন্দা। আমরা কি আজও ’৭৫ এর ১৫ আগষ্টের কারণ যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি। খুঁজে বের করতে পেরেছি কেন বাঙালির উত্থানকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় বারবার। আমরা কি আজও উপলব্ধি করতে পারি কেন শেখ হাসিনাকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়? আমরা উপলব্ধি করতে পারিনা বলেই নিজেদেরকে বিণির্মান করতে পারি না। বিদেশের মাটিতে এক পা আর দেশের মাটিতে আরেক পা রেখে কখনো দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। অনুসন্ধান বলছে বহু তথকাথিত দেশপ্রেমিক! স্বাধীনতার পক্ষের লোকেরা বিদেশের মাটিতে আরেকটি ঠিকানা গেড়েছেন, লুটপাট করে টাকা পাচার করেছেন। এসবই সীমাহীন অজ্ঞতার গহবরে জন্ম নেয়া অন্ধকার। যখন দেশরতœ শেখ হাসিনা বারবার সততার কথা বলেন, মোটা কাপড় মোটা চালের কথা বলেন তখনো আমরা তার এই কথার অর্থ বুঝিনা। তারই দলীয় নেতা কর্মীরা যখন তার এই নির্দেশনাকে থোড়ায় কেয়ার করে যা খুশি তা করেন তখন কোন অন্ধকারের মধ্যে পড়ে থাকে দেশ ও জাতি?

সততা মুখের কথা নয়। আচরণে আমলনামায় তা ধরা পড়ে। এখনো বহু নেতা কর্মী ভিতরে ভিতরে লুটেরা দস্যূ সংস্কৃতি ধারন করে আছে। সেই অন্ধকার থেকেই মুক্ত হতে হবে সবার আগে। দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সব সময় দেশের পক্ষে এই সরল সত্য উপলব্ধি করতে না পারলে কোন উন্নয়ন টেকসই হবে না।