মহাপ্রয়াণে –

বাংলাদেশের বন্ধু প্রণব মুখোপাধ্যায়

সংলাপ ॥ ৩১ আগস্ট ২০২০ তারিখটা ভারতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। এই দিনেই মহাপ্রয়াণে গেলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি উপমহাদেশের বরেণ্য রাজনীতিক, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু, আজকের ভারতের অন্যন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রণব মুখোপাধ্যায়। তাঁর প্রয়াণের খবরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাষ্ট্রপতি মো.আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর শোক বার্তায় বলেন, ‘প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে বাংলাদেশ এক আপনজনকে হারালো।’  ০২ সেপ্টেম্বর বুধবার বাংলাদেশে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে।

ইতিহাস, রাজনীতি বিজ্ঞান আর আইনে মাস্টার্স শেষ করে কলেজ শিক্ষক আর সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন প্রণব মুখার্জি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে তুলে এনেছিলেন রাজনীতির শীর্ষে, হয়েছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। স্বাধীনতার ৬৫ বছর পর ২০১২ সালের জুলাইয়ে ভারত পায় প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি।

ব্রিটিশ আমলে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে বীরভূমের মিরাটি গ্রামে ১৯৩৫-র ১১ ডিসেম্বর জন্ম প্রণব মুখার্জির। বাবা কামদাকিঙ্কর মুখার্জি ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। ১৯৫২-৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা পরিষদের সদস্য এবং জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যও ছিলেন কামদাকিঙ্কর। তাই ছোট থেকেই রাজনৈতিক আবহে বড় হওয়া প্রণব যে পরবর্তী জীবনে রাজনীতির সঙ্গেই জড়িয়ে পড়বেন তা বলাই বাহুল্য। মা রাজলক্ষ্মী ছিলেন গৃহবধূ। প্রণব ছিলেন তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান। বড় অন্নপূর্ণা এবং ছোট পীযূষ মুখার্জি। বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্নাতক পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আইন নিয়ে স্নাতকোত্তর পাস করেন। তারপর কলকাতা টেলিগ্রাফ অফিসে আপারডিভিশন কেরানি হিসেবে প্রথম কাজে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে বিদ্যানগর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় চাকরি। তারপর কিছুদিন ‘দেশের ডাক’ নামে একটি সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করতে করতেই ১৯৬৯-এ রাজনীতিতে প্রবেশ প্রণবের।

১৯৬৯-এ মেদিনীপুর উপ-নির্বাচনে নির্দল প্রার্থী ভি কে কৃষ্ণ মেননের হয়ে জোরদার প্রচার দিয়েই রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর সুদক্ষ হাতে প্রচারকাজের পরিচালনা নজর কেড়েছিল প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর। পাকা রাজনীতিক ইন্দিরা লোক চিনতে ভুল করেননি। তাই কালবিলম্ব না করে প্রণবকে ওই বছরই জুলাইয়ে কংগ্রেসের তরফে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে দাঁড় করান। ১৯৬৯ তো বটেই, ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯৩ এবং ১৯৯৯ সালেও রাজ্যসভা থেকে জেতেন মিরাটির এই বাঙালি রাজনীতিক।

রাজনীতিতে নিজের জাত চিনিয়ে সহজেই ইন্দিরা গান্ধীর আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন প্রণব। ১৯৭৩-তে ইন্দিরা তাঁকে শিল্পোন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী করেন। ১৯৭৫-৭৭ সালে জরুরি অবস্থার সময়ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন তিনি। যার জন্য পরে বিতর্কেও জড়িয়ে ছিলেন তিনি। ১৯৭৭-এ জনতা সরকার ক্ষমতায় পর শাহ কমিশনের দ্বারাও অভিযুক্ত হন তিনি। যদিও ১৯৭৯ সালে শাহ কমিশনই বিতর্কে জড়িয়ে পরে এবং ফের স্বমহিমায় ফিরে ১৯৮২-৮৪ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর পদ সামলান প্রণব। তিনি অর্থমন্ত্রী থাকাকালীনই ইন্দিরার আমলে ভারতীয় অর্থনীতিতে নতুন জোয়ার আসে। মনমোহন সিং আরবিআই-এর গর্ভনর হিসেবে প্রণবের স্বাক্ষরেই নিযুক্ত হয়েছিলেন।

কিন্তু ইন্দিরার মৃত্যুর পর রাজীব গান্ধী এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরা দলে প্রণবকে প্রায় গুরুত্বহীন করে দেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের দায়িত্ব দেয়া হয়। দলের সঙ্গে তাঁর মতান্তর এতোটাই বাড়তে থাকে যে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারও করে দেয়া হয়। ক্ষুব্ধ প্রণব ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস বা আরএসসি নামে নিজস্ব দল গঠন করেন। কিন্তু পরে রাজীবের সঙ্গে সমঝোতার পর আরএসসি কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যায়। ১৯৯১-এ রাজীবের মৃত্যুর পর ফের কংগ্রেসে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হন প্রণব। রাজীবের মৃত্যুর পর কংগ্রেসে সোনিয়ার আসন এবং রাজনৈতিক কেরিয়ার পাকাপোক্ত করার পেছনেও প্রণবের পাকা মাথাই কাজ করেছিল, বলেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

১৯৯৫-১৯৯৬ পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন পি ভি নরসিংহ রাওয়ের আমলে। এরপর মনমোহন সিং যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন ২০০৪-এর ২৪ অক্টোবর থেকে ২০০৯-এর ২২ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ২০০৪-এর ২২ মে থেকে ২০০৬-এর ২৬ অক্টোবর প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ২০০৪-এর ২৪ জানুয়ারি থেকে ২০১২-এর ২৪ জুলাই অর্থমন্ত্রী ছিলেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রণব’ই আমেরিকার সঙ্গে ভারতের ১০ বছরের প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতার ফলেই ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল।

২০১২-এর ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি পদে শপথ নেন প্রণব। তিনি ছিলেন ইউপি-র প্রার্থী। সে বছর রাষ্ট্রপতি পদে মোট ৮১ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন। যদিও নির্বাচন কমিশন সব মনোনয়ন বাতিল করে শুধু এনডি-এর প্রার্থী পি এ সাংমা এবং প্রণবের মনোনয়নই গ্রহণ করেছিল। নির্বাচনে প্রণব পান ৭১৩৭৬৩টি ভোট এবং সাংমা পান ৩,১৫,৯৮৭টি ভোট। বাঙালি রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

প্রণব মুখার্জি হচ্ছেন একমাত্র ভারতীয় বাঙালি যিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ছাপ রেখেছেন, রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। তার শ্বশুরবাড়ী বাংলাদেশের নড়াইলে। সে কারণে বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ একটা টান তাঁর থাকবে-এটাই হয়তো স্বাভাবিক। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই তিনি নানাভাবে সম্পৃক্ত। আবার বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসনে থাকার সময় একটা পারিবারিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছিলো। আবার দীর্ঘকাল গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয় – অর্থ ও পররাষ্ট্র – তিনি চালিয়েছেন। সে কারণে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয় নীতিতেও তার ভূমিকা ছিলো।

ভারতের বাঙালি রাজনীতিক হওয়ায় প্রণব মুখার্জী বরাবরই বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত নাম। আবার মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিকদের সাথে তৈরি হওয়া সম্পর্ক তিনি সযত্নে যেমন লালন করেছেন তেমনি দীর্ঘ সময় ভারতের অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে প্রতিবেশী বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে প্রভাব বিস্তারেরও সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

২০১৭ সালের ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসরের পর পড়াশোনা নিয়েই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন এই তুখোড় রাজনীতিবিদ। দীর্ঘদিনের সঙ্গী স্ত্রী শুভ্রার মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও স্থিতধী প্রণব তা কাউকে বুঝতে দেননি। মেয়ে শর্মিষ্ঠা এবং ছেলে অভিজিৎই বাবাকে আগলে রেখেছিলেন। গত ১০ আগষ্ট বাড়ির শৌচালয়ে পড়ে গিয়ে মাথায় রক্তক্ষরণ হয়। হাসপাতালে ভর্তি করলে তাঁর কোভিড-১৯ পজিটিভ ধরা পড়ে। কোমায় চলে যান তিনি। রাজনীতির যাবতীয় মারপ্যাঁচ যিনি সুদক্ষ হাতে সামলিয়েছিলেন, সেই প্রণব মুখার্জি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন ৩১ আগস্ট ২০২০ সোমবার সন্ধ্যায়।