মহানবীর আবির্ভাব ও লোকান্তর কি একই দিনে?

(আবির্ভাব ১২ রবিউল আউয়াল, লোকান্তর ১ রবিউল আউয়াল-ঐতিহাসিক দলিলে প্রমাণিত)

শাহ ড. আলাউদ্দিন আলন ॥ মহান রাব্বুল আলামিনের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলেন নুরে মোহাম্মদী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)। তাঁকে সৃষ্টির মাধ্যমেই আল্লাহপাক সৃষ্টির লীলা শুরু করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে কুদসীতে এরশাদ হয়েছ: “লাউলাকা লামা খালাকতুল আফলাক” অর্থাৎ  হে হাবিব) আমি আপনাকে সৃষ্টি না করলে কোন কিছুই সৃষ্টি করতাম না।”

এ বিষয়ে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) অন্যত্র বলেছেন: “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু নুরী, আনা মিন নুরিল্লাহ ওয়া কুল্লু শাইয়্যিন মিন নুরী”- অর্থ-‘আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নুরকে সৃষ্টি করেছেন; আমি আল্লাহর নুর হতে আর সমস্ত সৃষ্টি আমার নুর হতে’। সৃষ্টি জগতের প্রাণ হলো  মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)। যাকে সৃষ্টি করা না হলে কিছুই সৃষ্টি হতো না বলে স্বয়ং আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন সেই মহান রাসুলের (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ধুলির ধরায় শুভ আবির্ভাব জগৎবাসীর জন্য যেমন আনন্দের তেমনি তাঁর ওফাত দিবস বেদনার যদিও ‘আল্লাহর বন্ধুদের মৃত্যু নেই’ কোরআনের ঘোষনা। জগৎজুড়ে প্রচলিত রয়েছে মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং ৬৩ বছর হায়াতে জিন্দেগী সমাপ্ত করে ঐ একই তারিখে অর্থাৎ ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার ওফাত লাভ করেছিলেন। মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর আবির্ভাব ও ওফাত দিবস একই দিন ও তারিখে এ বিশ্বাসের কারণে মানবজাতি তাঁর শুভ আবির্ভাব ও ওফাত দিবস কোনটিকেই গুরুত্ব দিয়ে পালন করে না। সুতরাং ধারণা অনুযায়ী শুভ আবির্ভাব ও ওফাত একই তারিখে হবার কারণে মানবজাতি তথা মুসলিম জাতি আনন্দ করবে না দুঃখ করবে/ শোক পালন করবে এ বিষয়ে দ্বিধা দ্ধন্ধে জর্জরিত। এহেন দ্বিধা দ্বন্ধের ফলে মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর শুভ জন্মদিন অপরিসীম রহমত ও বরকতপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমান জাতি তা পালন করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিলাদি হতে প্রমাণিত হয় রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর শুভ আবির্ভাব এবং ওফাত দিবস একই তারিখে নয়।

ইসলামের ইতিহাস গ্রন্থসহ অসংখ্য গ্রন্থে বিশেষ করে মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনী মোবারক নিয়ে লিখিত গ্রন্থ সমূহে ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে যে, তিনি হিজরী পূর্ব ৫৩ সনে ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সুবেহ সাদিকের সময় জন্মগ্রহন করেছিলেন এবং ঐ একই তারিখে ওফাত লাভ করেছিলেন। এ বিষয়ে বিখ্যাত লোক ও গবেষক ড. ওসমান গণি রচিত মহানবী গ্রন্থের ১২৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: “মা আমিনা ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ৮ জুন, ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার উষার শুভলগ্নে একটি পুত্র সন্তান আবির্ভাব দেন।” উক্ত গ্রন্থের ৩৮৪ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন: “শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে ‘হে আল্লাহ, হে আমার পরম বন্ধু এই বলে ৬৩ বছর বয়সে মহানবী আল্লাহপাকের দিদার লাভের জন্য ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন, ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার পরলোক গমন করলেন।”

মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস:

রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)হলেন- সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তিনি আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে যেমনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাকামের অধিকারী তেমনি ব্যক্তি জীবনেও ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শের অধিকারী। তাঁর কাছ থেকেই আমরা লাভ করেছি সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কোরআন। সুদীর্ঘ ২৩ বছরের নবুয়তী জীবনের প্রতিটি ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং তিনি এই সময়ে একটি বর্বর জাতিকে ক্বালবী জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করে একটি সুশৃংখল আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। অথচ আলী (রাঃ), আবু বকর (রাঃ), ওমর (রাঃ), ওসমান (রাঃ), যায়েদ (রাঃ), আবু জর গিফারী (রাঃ) এর মতো বিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও আদর্শবান সাহাবী থাকার পরও তার কি প্রিয় নবীজির ওফাত দিবসের সঠিক তারিখটি লিপিবদ্ধ করে যাননি? রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) তো লোকচক্ষুর অন্তরালে ওয়াফ লাভ করেননি বরং সবার সামনে হাসিমুখে ওফাত লাভ করেছিলেন। তাহলে দয়াল রাসুলের ওফাত দিবসের সঠিক তারিখ বিষয়ে আমাদের মধ্যে অত বিভ্রান্তি কেন? প্রকৃত সত্য হচ্ছে আমরা চক্রান্তের শিকার। নিত্য নতুন পুস্তক রচনার মাধ্যমে উমাইয়া খ্রীষ্টান ইয়াহুদি চক্রান্তের বেড়াজালে পড়ে আমরা প্রকৃত সত্য থেকে দুরে সরে পড়েছি। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে সত্যকে আড়াল করে রাখা যায় না। তাই অপরিসীম আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সাধনার দ্বারা সাধকগণ প্রমান করেছেন রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার। পবিত্র কোরআন, হাদিসের দলিল, ঐতিহাসিক তথ্য ও গবেষণার অকাট্য দলিল দিয়ে যুক্তি প্রমানের নিরীখে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবসের সঠিক তারিখ নির্ধারণ করে মানব সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা দুর করেছেন।

সংস্কারের স্বপক্ষে উপস্থাপিত দলিল ও প্রমাণঃ

নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১২ই রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু তার ওফাত দিবস ১২ই রবিউল আউয়াল নয় বরং তা হচ্ছে ১লা রবিউল আউয়াল। নিম্নে পবিত্র কোরআনের আয়াত এবং হাদিসের বর্ণনা, তাফসীর গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক গবেষণা গ্রন্থ হতে তথ্য উপাত্ত দিয়ে সংস্কারকৃত বিষয়টি উপস্থাপিত হলোঃ

প্রমাণ- ১: আল কোরআনের আয়াত নাযিলের তারিখ

পবিত্র আল কোরআনের সুরা মায়েদার ৩নং আয়াতটি রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর উপর অবর্তীর্ণ সর্বশেষ আয়াত যা হিজরী ১০ম বর্ষের ৯ই জ্বিলহজ্জ তারিখে বিদায় হজ্জের সময় আরাফার প্রাঙ্গনে নাযিল হয়েছিল। আয়াতটি হলোঃ “আল ইয়াউমা আকমালতু লাকুম দিনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নিইমাতি ওয়া রাফিতু লাকুমুল ইসলামা দ্বীনা।” অর্থঃ আজ আমি তোমাদের ধর্মকে পূর্ণতা প্রদান করলাম। আমার নেয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে (শান্তিতে) একমাত্র ধর্ম হিসাবে কবুল করে নিলাম। বর্ণিত আয়াতটি অবর্তীর্ণ হওয়ার স্থান, দিন, তারিখ ও সময় নিদিষ্ট হওয়ায় এ তারিখটিকে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবসের তারিখ নির্ণয়ের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে গ্রহন করা যায়। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর ঠিক কতদিন পর রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ওফাত লাভ করেছিলেন এ বিষয়ে তাফসীরে মা’রেফুল কোরআন, তাফসীরে দুররে মানসুর, তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে মাযহারী ও তাফসীরে ইবনে কালির এ বর্ণিত দলিলাদি ও সাহাবায়ে কেরামগনের তথ্য নিম্নে উপস্থাপিত হলো:

এক: বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন: বর্ণিত আয়াতটি ১০ম হিজরীর ৯ই জিলহজ্জ তারিখে নাজিল হয়। এরপর রাসুলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) মাত্র ৮১ দিন পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন। [সূত্র: তাফসীরে আ’রেফুল কোরআন]

দুই: তাফসীরে দুররে মানসুর এর ৩য় খন্ডের ২০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে- “ওরা আখরাজা ইবনু জারিরেন আল ইবনে জুরাইজিন ক্বালা মাকাসান নাবিয্যু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাআদা মা নাজালাত হাজিহিল আয়াতু ইহদা ওয়াসামানিলা লাইলাতান”। অর্থঃ ইবনে জারীর কর্তৃক ইবনে জুরাইজ হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) একাশি রাত দুনিয়াতে অবস্থান করেন।”

তিন: তাফসীরে তাবারীর ৪র্থ খন্ডের ৮০ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- “হাদ্দায়ানা হাজ্জজু আল ইবনে জুরাইজিন ক্বালা মাকাসান নাবিয্যূ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাআদা সা নাজালাত যাজিহিল আয়াতু ইহুদা ওয়াসামানিনা লাইলাতান।” অর্থ: হাজ্জাজ ইবনে জুরাইজ হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর ৮১ রাত রাসুলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) জীবিত ছিলেন।”

চার: তাফসীরে মাযহারী ৩য় খন্ডের ২৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- “ইমাম বাগবী বলেন, হারুন ইবনে আলতারা তার পিতা হতে বর্ণণা করেন, এ আয়াতটি অবর্তীণ হওয়ার পর রাসুসুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ৮১ দিন জীবিত ছিলেন।

পাঁচ: তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খন্ডের ১৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- “ইবনে জারীর ও অন্যরা বলেন, আরাফার দিবসের পর রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ৮১ দিন জীবিত ছিলেন।’

ছয়: বিদায় হজ্জের দিবসে আলোচ্য আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার দিন পরবর্তী ৮১তম দিবসে রাসুলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ওফাত লাভ করেছিলেন বলে আল্লামা সাবিবর আহমদ ওসমানী তাঁর বিখ্যাত উর্দু তাফসীর তাফসীরে ওসমানীতে উল্লেখ করেছেন।

উপরে বর্ণিত সূত্রগুলো হতে বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বিদায় হজ্জের দিন থেকে ৮১ তম দিবসে ওফাত লাভ করেছিলেন। সুতরাং বিদায় হজ্জ্বের দিন থেকে ৮১ তম দিবস কত তারিখ ও কি বার হয় তা গণনা করলে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাতের সঠিক তারিখটি নির্ণয় করা সম্ভব হবে এবং আমরা প্রকৃত সত্য জানতে পারব।

ঐতিহাসিকভাবে সকলেই একমত যে, রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বিদায় হজ্জের সময় আরাফার ময়দানে বাণী মোবারক প্রদানকালে এ আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে এবং ঐ দিনটি ছিল শুক্রবার। আর এ জন্যই শুক্রবার দিনের হজ্জকে আকবরী হজ্জ বলা হয়। সুতরাং বিদায় হজ্জে আরাফার দিবস তথা ১০ম হিজরীর ৯ই জ্বিলহজ্জ শুক্রবারকে ভিত্তি ধরে ৮১ তম দিবস হিসাব করলে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাতের সঠিক তারিখ নির্ধারিত হবে। রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর হাদিসের বর্ণনা অনুসারে এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসারে চান্দ্রবর্ষের একমাত্র হয় ৩০ দিনে এবং পরবর্তী মাস হয় ২৯ দিনে। এ হিসাবে জিলহজ্জ মাস হয় ২৯ দিনে, পরবর্তী মাস মহরম ৩০ দিন এবং সফর মাস ২৯ দিন হয়। সুতরাং জ্বিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ থেকে বাকী দিন ২১, মহরম মাসের ৩০ দিন, সফর মাসের ২৯ দিন এবং রবিউল আউয়াল মাসের ১ দিন বা ১ তারিখ যোগ করলে মোট ৮১ দিন হয়। সুতরাং এ হিসাবে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) একাদশ হিজরী সালের ১ লা রবিউল আউয়াল ওফাত লাভ করেছিলেন।

আরেকটি বিষয়ে এখানে উল্লেখ যে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) রবিউল আউয়াল মাসের সোমবারে ওফাত লাভ করেছিলেন বলে সর্বসম্মত অভিমত। সুতরাং ১০ম হিজরীর ৯ই জিলহজ্জ শুক্রবার এবং এ তারিখ ও বার থেকে হিসাবে করলে ৮১ তম দিবস হয় ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার। অতএব প্রমানিত রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার।

রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনী মোবারকের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা হতে জানা যায় যে, জীবনের শেষভাগে তিনি বেশ কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। তবে ওফাতের পাঁচ দিন পূর্বে তিনি হঠাৎ সকাল বেলায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে পবিত্র হুজরা শরীফ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় বরকতময় ঐ দিনটি ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার যা সারা বিশ্বের মুসলমানরা “আখেরী চাহার শোম্বা” নামে পালন করে থাকে। উপরে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী একাদশ হিজরীর ২৫ শে সফর ছিল বুধবার। এই দিবস ও তারিখ হতে ৫ দিন পরে একাদশ হিজরীর ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার দিন হয়। সুতরাং আখেরী চাহার শোম্বা’ যদি রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনের শেষ বুধবার হয় এবং তিনি যদি এরপর আর কোন বুধবার পেয়ে না থাকেন এবং যদি পরবর্তী সোমবার তাঁর ওফাত হয় তাহলে বুধবার থেকে সোমবার ৫ দিন পর তাঁর ওফাত দিবস। অতএব ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ওফাত লাভ করেছিলেন এবং তা উপস্থাপিত তথ্যের আলোকে অকাট্য যুক্তি। পঞ্জিকার (ছক-১)-এ বর্ণিত বার ও তারিখের হিসাবটি উপস্থাপন করা হয়েছে।

nobi

উপরে উপস্থাপিত ছক থেকে স্পর্ষ্ট বুঝা যাচ্ছে যদি রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস ১২ই রবিউল আউয়াল হতো তাহলে তা বারের হিসাবে শুক্রবার হয়। কিন্তু তিনি সোমবার ওফাত লাভ করেছিলেন। সুতরাং বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী অকাট্যভাবে/নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয় যে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১২ই রবিউল আউয়াল নয় বরং ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার ওফাত লাভ করেছিলেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ২য় খন্ডের ৩২৯ পৃষ্ঠায় রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনীতে বলা হয়েছে “জীবনের শেষ দিন সোমবার প্রত্যুষে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) দরজার পর্দা সরাইয়া সাহাবীদের সালাত আদায়ের দৃশ্য অবলোকন করিয়া পরম তৃপ্তি লাভ করেন। তাঁহার যন্ত্রনাকাতর মূখে হাসির রেখা ফুটিল। তৃতীয় প্রহরে অন্তিম অবস্থা দেখা দিল। বার বার তাঁহার সংজ্ঞা লোপ পাইতেছিল। চৈতন্য লাভের পর বারবার তিনি

বলিতে লাগিলেন, “আর রফিকুল আলা’- তিনি (আল্লাহ) শ্রেষ্ঠতম বন্ধু। আলী (রাঃ), হযরত (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর মস্তক কোলে করিয়া বলিয়াছেন, এমন সময় একবার চোখ মেলিয়া আলী (রাঃ) এর দিকে তাকাইয়া হযরত (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) অস্ফুটস্বরে বলিতে লাগিলেন, ‘সাবধান! দাস-দাসীদের প্রতি নির্মম হইও না।’ একবার আয়শা (রাঃ) কে বুকে মাথা রাখিয়া শেষ বারের মতো চোখ মেলিয়া উচ্চ কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, ‘সালাত-সালাত’; সাবধান! দাস-দাসীদের প্রতি সাবধান!’ আত্মার শেষ নিঃশ্বাসের সহিত শেষ কথা উচ্চারণ করিলেন, ‘হে আল্লাহ! শ্রেষ্ঠতম বন্ধু।’ ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার ৬৩ বছর বয়সে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ইনতিকাল হয় সুর্যাস্তের কিছু পূর্বে।” সুতরাং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ইসলামি বিশ্বকোষের তথ্য অনুযায়ী রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার।

ওফাত দিবস ১২ই রবিউল আউয়াল প্রচারের নেপথ্যে:

রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১লা রবিউল আউয়াল ওফাৎ লাভ করেছেন এটাই সঠিক ও নির্ভূল। সমাজে প্রচলিত ১২ই রবিউল আউয়াল তাঁর ওফাতের তারিখ নয়। কারণ দশম হিজরীর ৯ই জ্বিলহজ্জ শুক্রবার হলে তিনটি মাসের সব ক’টি মাস যদি ৩০ দিন, কিংবা ২৯ দিন যে কোনভাবেই হিসাব করা হোকনা কেন, কোন হিসাবেই একাদশ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার হয় না। এখন প্রশ্ন হলো, ১২ই রবিউল আউয়াল হযরত রাসূল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)এর আবির্ভাব ও ওফাতের তারিখ হিসাবে কিভাবে প্রচারিত হলো? উমাইয়া শাসনামলে এজিদপন্থীরা রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জন্মদিনের আনন্দকে স্লান করে দিয়ে মুসলমানদের এ দিনের রহমত ও বরকত হতে বঞ্চিত করার জন্য চক্রান্তমূলকভাবে তাঁর আবির্ভাব ও ওফাৎ একই তারিখে হয়েছে বলে প্রচার করেছে। কারণ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১লা রবিউল আউয়াল সূর্যাস্তের কয়েক মিনিট পূর্বে ওফাৎ লাভ করেছেন। তার ওফাতের সংবাদ সবার কাছে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। চান্দ্র মাসের তারিখ সূর্যাস্তের পর থেকে গনণা করা হয় বিধায় কেউ কেউ বলেছেন তিনি ২রা রবিউল আউয়াল ওফাৎ লাভ করেছেন। ফলে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাতের তারিখটি ১ অথবা ২ রবিউল আউয়াল হিসাবে প্রচারিত হয়। এ সুযোগে উমাইয়া শাসকরা হযরত রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাতের তারিখ ১ ও ২ কে একত্রিত করে ১২ই রবিউল আউয়াল হিসাবে প্রচার করেছে। এ চক্রান্তের শিকার হয়ে মুসলমানরা ১২ই রবিউল আউয়ালকে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর শুভ আবির্ভাব ও ওফাত দিবসের দিন মনে করে এ দিনের আনন্দ উৎসব পালন করা থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এ দিনের উসিলায় অবারিত রহমত ও বরকত নাযিল হয় তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।

সুতরাং ঐতিহাসিত বিশ্লেষণে আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি হযরত রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১লা রবিউল আউয়াল ওফাত লাভ করেছিলেন।