ভোগ থেকেই ভয়ের উৎপত্তি

নজরুল ইশতিয়াক ॥ কামনা কিংবা আকাঙ্খা থেকেই জন্ম হচ্ছে মানুষ। এটির নেপথ্যেও ভোগের সংশ্লেষ রয়েছে। জীবনের যে বহুমাত্রিক অস্থিরতা তার পিছনেও ভোগবাদী মনোভাবের যোগ। দখলদারিত্ব-আধিপত্য বিস্তার কিংবা কর্তৃত্ব জারি করার প্রবণতার পিছনে একই দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে মানুষের অজান্তেই। দেহকে আরাম দিতে দিতে, দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধির মলম মাখতে মাখতে, দেহকে উপাদেয় খাবার দিতে দিতে একসময় এই দেহটাই ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়। দেহ নির্ভর কিংবা শরীর নির্ভর চিন্তা মানুষকে বাজারী মানুষে পরিণত করে। কেবলমাত্র জীবিকা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ চিন্তার জীবন দূর্ভাগ্যজনক হয়ে আসে। জীবন থেকে জীবনের এই চলা। কর্ম অনুযায়ী পরিবেশ-মাতৃগর্ভ। এই আসা যাওয়ার নেপথ্যে গভীর থেকে গভীরতর সত্য আছে। সেই সত্য উপলব্ধির জন্য যে সহায়ক পরিবেশ পারিবারিক শিক্ষা দরকার সেটি না থাকায় পরিবারের অভিভাবকরা সন্তানদের ভোগবাদী জীবনের গল্প শোনাচ্ছে। এমন সব বিষয়ে পড়াশুনা করাচ্ছে যেগুলো প্রচুর অর্থ আয়বর্ধক। এ কারণে কোরআনুল করিমে বাপ দাদার ধর্ম মেনে চলার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। সূরা ওয়াক্বিয়ায় বলা হয়েছে- মানুষকে তিন ভাবে ভাগ করা হয়েছে। বাম ডান ও অগ্রগামী। বাম দিকের লোকেরা এক সময় স্বচ্ছল ছিল। গভীর তাৎপর্যবহ এই কথাটি প্রতিটি সত্যানুসন্ধানীর জন্য চিন্তার খোরাক যোগাবে। এ জন্যই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী- ভোগের আনন্দ সাময়িক-ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন। প্রতিটি জীবনের সীমা আছে।

সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য এবং গভীর সত্য নিহিত। সেই জীবন প্রকৃতির সীমা জানা কঠিন। এ জন্য জ্ঞানী ব্যক্তির সান্নিধ্য লাগে। সেই সত্য উপলব্ধি হলে জীবনের কোন অনিশ্চয়তা নিরাপত্তাহীনতা থাকে না। ভয় শব্দটিরও কোন অস্তিত্ব নেই সেখানে। কিন্তু সাধারণ জীবনের পুরোটাই ভোগ্যবস্তু। ব্যক্তি নিজে হয়তো জানে না যে সে নিজেও একটা ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। আবার তার চারপাশ নিরেট একটা ভোগের কারখানা। এই ভোগ তাকে ক্রমাগত সংকুচিত করতে করতে সত্য থেকে বহুদূরে নিয়ে যায়। পথ হারানো পথিকের মতো সেই জীবন আষ্ট্রেপৃষ্ঠে বাধা পড়ে। ভোগ থেকেই ভয়ের উৎপত্তি। একসময়  আপাতদৃষ্টিতে বোঝা না গেলেও একজন ভোগী খুবই ভয়কাতুরে মানুষ। ভোগের বহুমাত্রিক ব্যবস্থাপনাকে নিশ্চিত করতেই তার পক্ষে সমাজে ভয়-শংকাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন পড়ে। যিনি ভোগী তিনি সম্পদ সংগ্রহ-আহরণের দিকে যেমন গভীর মনোযোগী থাকেন তেমনি তা রক্ষায় বহু কলা কৌশল তাকে রপ্ত করতে হয়। যেমন দূর্গ সমেত বাড়ী-গাড়ী, নিরাপত্তা কর্মী এবং নেটওয়ার্ক। প্রয়োজনে নিরাপদ বাসস্থান খোঁজেন সুদূর প্রবাসে। কারণ সার্বক্ষণিক তাকে একটা ভয়কাতুর চিন্তা গ্রাস করে রাখে। এ জন্য তার সৈন্য সামন্ত লাগে। আর তিনি সমাজে অপরকে ভয় দেখান যাতে কেউ তার এই অসুস্থ্য প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ান। বৃহত্তর আঙ্গিকে চিন্তা করলে তথাকথিত চরম উন্নত দেশগুলোর সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলো মারনাস্ত্র উৎপাদন। এটিও ভোগের পরাকাষ্ঠা থেকেই জন্ম নেয়া। এ বিষয়ের সত্য বের করা অনুসন্ধানীর কাজ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিসরে বিষয়টি দেখা গেলেও এই সত্যতা ধরা পড়বে। রাজনীতি একটি ক্ষমতা। যা সুরক্ষা দেয় এবং সুযোগ তৈরী করে দেয় সম্পদ কুক্ষিগত রাখার। ক্ষমতার রাজনীতিতে নীতি কথা চলে না। আদর্শ শব্দটিও লোক দেখানো। একজন আপাদমস্তক ভোগী সমাজে তার নিজেকে নিরাপদ রাখতে, নিজের সব কিছুকে জায়েজ করতে একটা আবরণ তৈরী করে রাখেন। বলা যেতে পারে একটা দেয়াল তৈরী করেন। এই দেয়াল তাকে সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। ফলে তিনি এমন কিছু নীতি বাক্য কিংবা তথাকথিত ভালো কাজের অভিনয় করেন নিজ সম্মানার্থে যা অন্য সব কামনালিপ্সু মানুষকে সেই পথে টেনে আনে। ক্ষমতাধর ভোগী ছিটেফোটা অংশ ব্যয় করেন এ কাজে। এভাবে সমাজে শুরু হয় ভোগী হবার প্রবনতা। ভীড় বাড়তে থাকে।

অন্যদিকে অনেকের হয়তো ডাক্তারী পড়ার কথা নয়, কিন্তু বৃত্তশালী পিতার চাপে পড়ে তাকে মেডিকেল পড়তে হচ্ছে। পাসও করে যাচ্ছে সবাই। মেডিকেলে ভর্তি হয়ে ডাক্তার হয়নি এমন লোকের সংখ্যা নেই। ফলে এমন ডাক্তার অপারেশন থিয়েটারে রোগী মেরে ফেলবে অথবা রোগীর বড় কোন ক্ষতি করবে এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে প্রকৌশল বিষয়েও পড়তে বাধ্য হচ্ছে অনেকে। পড়াশুনা শেষে সরকারী চাকুরী জুটলে কোটিপতি হতে বেশিদিন লাগে না। তাহলে কাজের গুণগত মান কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। ঘুষখোর জামাই কিংবা জামাইয়ের ইনকাম কত এটা পাত্রী পক্ষের একটা বিরাট চাহিদা। ফলে পরিবারই যখন লোভী ভোগী দুর্নীতি সহায়ক তখন আত্মশুদ্ধির জায়গা কোথায়?