ভালোবাসা সমীরণ

– জানেন ভাবী, আমার মেয়েটা কিচ্ছু খেতে চায় না।

– আমার ছেলেটার অবস্থাও একই রকম। দ্যাখেন, ভার্সিটিতে যাচ্ছে কিন্তু মুখে নাস্তা তুলে দিতে হচ্ছে। তা না হলে উনি বিকাল অবধি উপোস করবেন। বলেন তো, কী যন্ত্রণা!

এ’যুগের মায়েদের মুখে এসব কথা শুনে বিস্মিত ও বিরক্ত হওয়ার কিছুই নেই; যেন এটা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। যে ছেলেটা বা মেয়েটা শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের বসন্তগীত গাইতে পারে, সে কিনা নিজ হাতে খেতে পারে না। মায়েরা এসব ননীর পুতুলগণকে মুখে রাঁধাভাত তুলে দেয়ার মতো সঙ্গী/সঙ্গিনী জুটিয়ে দিতে পারবেন কিনা তা জানা নেই। না জুটলে কী পরিণতি ঘটবে তা কি একবার ভেবেছেন? আরে বাবা, বারো ক্লাস পাস করে নিজের খাওয়াপরাটা তো অন্তত শিখবে?

মাবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। এই একটা বিরক্তিকর ব্যাপার; কিছু লিখতে যাব – জো নেই।

– হ্যালো! কী ব্যাপার?

– কী ব্যাপার জানো না বুঝি ? বেলা দশটা বাজে, একটা ছেলেমেয়েও সকালের নাস্তা খায়নি। এখন বললাম খাইয়ে দিই – না, তাতেও উনাদের টালবাহানা শুরু হয়েছে।

– খাইয়ে দেয়ার কী দরকার, শুনি; দু’একদিন না খেলে তেমন কিছুই হবে না।

– গিন্নি এবার সপ্তসুরে জবাব দিলেনঃ

– এজন্য বলি তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। কোথায় আমাকে একটু সান্ত¡না দেবে বা ছেলে- মেয়েদেরকে একটু বুঝিয়ে বলবে; তা না করে আমাকে উনি বচনামৃত শোনাচ্ছেন!

যাক, বাঁচা গেলো। মোবাইল রাখলেন। মায়েদের এসব দুশ্চিন্তা, অতিসতর্কতা, অতিরক্ষণশীলতা সত্যিই এক ভাবনার বিষয়। মায়েরা হাঁড়ি ভরে ভাত রাঁধবে, কড়াই ভরে তরকারি আর বাটি ভর্তি ভর্তা সাজিয়ে রাখবে; সন্তানেরা চেটেপুটে খাবে। কেউ বেশি নেয় কিনা তা দেখার জন্য মা পাশে থাকতে পারেন কিন্তু বেশি খাওয়ানোর জন্য নয়। তরকারি স্বাদের না হলে মাঝেমধ্যে মাকে না জানিয়েই একটা ডিম ভেজে খাক, না হয় নিজেই একটা ব্যঞ্জন তৈরি করতে চেষ্টা করুক। এতে মুখের রুচি যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি জীবন দক্ষতাও অর্জন করবে।

– আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারিক বিষয়াদি নেই বললেই চলে। যা আছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা শুধু অধিক নম্বর প্রাপ্তির নিশ্চয়তার জন্যে। আর ‘জীবন দক্ষতা’ – তা শুধু কাগজে কলমে আর কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ফটক পর্যন্তই। Life Skill Based Education নামে একটা প্রশিক্ষণে আমি এবং আমার এক সহকর্মী অংশগ্রহণ করেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, আমরা পুরো দুনিয়াটাকেই বদলে ফেলব। কিন্তু দুয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমরা অত্যাধুনিক মায়েদের সাথেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে চমৎকার ভাবে অভিযোজিত হয়ে গেছি। এছাড়া গতি নেই। এই পূর্ণপ্রতিযোগিতার বাজারে আমাদের সোনামণিদের টিকিয়ে রাখতে যে লাইফসাপোর্ট দরকার! কিন্তু একটিবারের জন্য কি কেউ ভেবেছিলেন যে, ইরাকের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার জেনারেল গাদ্দাফি কিংবা ধনকুরের ওসামা বিন লাদেনকেও গুহায় বাস করতে হবে? আজকের আরাম-আয়েশে দিনাতিপাত করা আমাকে, আপনাকে যে বিয়ার গ্রিলস বা এযুগের রবিনসন ক্রুসোর মতো জঙ্গলে কাটাতে হবে না এর নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবেন? তাহলে এ আয়েশি জীবনে শখের বশবর্তী হয়ে হলেও আপদকালিন দূর্যোগ মোকাবেলার কিছু দক্ষতা অর্জন আবশ্যক। এক্ষেত্রে একজন প্রকৃত মা হিসেবে তার সন্তানকে প্রকৃতির কোলে সমর্পণ করাই সর্বোত্তম।

আবার রিংটোন বেজে উঠল।

– হ্যালো! কী করছ?

গিন্নির স্বর এবার খুবই মোলায়েম।

– এই তো, একটু লেখালেখি করছিলাম। কেন? কিছু বলবে?

– জানো! আজ আমার চাকুরিকাল পাঁচ বছর পূর্ণ হলো।

– হ্যাঁ, জানি। তো কী হয়েছে?

– তোমার তো অনেক পুরাতন কথাই মনে থাকে। কালরাতে একটু মনে করিয়ে দিলে একটা পার্টি দিতে পারতাম। থাক, সন্ধ্যায় তুমি চলে এসো। সবাই মিলে হোটেল ডায়মন্ড এ ডিনার করব।

– কী প্রয়োজন? আমিই তো আজ বিবাহিত ব্যাচেলার জীবনের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে মেন্যুতে রাখছি কাচ্চিবিরিয়ানি, খাসির গোস্ত, কাঁচকি মাছের ঝোল এবং টাকি মাছের ভর্তা। সাথে একটু ফিরনির আয়োজনও থাকছে। ভেবেছিলাম খাবার সময় ভিডিও কল দিয়ে সারপ্রাইজ দেবো, কিন্তু এখন যেহেতু ঘটনা ফাঁস হয়ে গেল তাই দাওয়াত করলাম।

– ছিঃ! এমন অপমানের দাওয়াতে যাব আমি!

–  আরে শোনো, রাগ করো না, সোনা। ভেবে দেখো তো – এই পাঁচ বছরে কোনো দিনও আমাকে বাক্সে করে তরকারি পাঠাতে হয়নি বরং আমি তোমাকে পাঠিয়েছি। শুধু তোমার বাসায় গেলেই তোমার রান্না খেয়েছি। এ কৃতিত্ত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ আমাকে পুরস্কৃত করতে পার। কি? ঠিক বলিনি?

– হয়েছে, হয়েছে। এত সব শিখলে কোথায়? আমার কাছেই তো। বরং আমাকে গিফট পাঠাও।

– তুমি শিখিয়েছ, একথা পুরোপুরি সত্য নয়; আংশিক সত্য। তোমাদের আগমনের বহুকাল আগে যখন আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, ছিল না কোনো গ্যাস সংযোগ তখন হিন্দুদের মতো মুসলমানরাও সন্ধ্যারতি করত। সন্ধ্যায় প্রতিটি ঘর ঝাড়ু দেয়া, প্রতিটি ঘরে কিছু সময়ের জন্য কুপিবাতি বা হারিকেন রাখার বিধান ছিল; শুধু উলুধ্বনি আর ভক্তিটা ছিল না। বলি, তখন কি আপনি এসে সন্ধ্যারতি সারতেন? – না, আমিই প্রায় প্রতিদিন সাঁঝের কাজটি করতাম। বিকালে খেলতে যাওয়ার আগে মাঠ থেকে গরুগুলিকে গোয়ালে নিয়ে আসা, দুগ্ধবতী গাভীর জন্য এক টুকরি কাঁচাঘাস সংগ্রহ, গরুকে ফেনপানি খাওয়ানোর কাজগুলি আমরা মহাআনন্দে করতাম। বাড়িতে যখন বছরচুক্তি কামলা থাকত, তখনো কিন্তু একটু আধটুকু হালচাষ, বোরো জমি রোয়া, উইডার দেয়া, ফসল কাটা ও মাড়াইয়ে সবার আগে আগেই থাকতাম। এ ধরণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মালিক কিন্তু শুধু আমার মতো চুঁনোপুঁটিই নয়; এ অভিজ্ঞতা এ যুগের অনেক আমলা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পপতি কিংবা রাজনীতিবিদেরও আছে। অবশ্য এসব অভিজ্ঞতা নগরসভ্যতার কাছে কিছুটা ম্লান হয়ে পড়েছে।

– হ্যাঁ গো, সত্যিই তুমিই সব পার। তবে চাকরির পর থেকে কিন্তু আমি তোমার গৃহস্থালি সাহায্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।

– ছোটবেলায় কখন যে নিজের কাপড়চোপড় ধোয়া শুরু করেছিলাম, মনে নেই। খাবার পর নিজের প্লেটবাটি ধোয়ার অভ্যাস কখন গড়ে উঠেছিল, তাও মনে নেই। আর এখন নিজে উপার্জন করি, রাঁধিবাড়ি এবং খাই । রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে উৎসাহিত করে বলেছেন, “দুই হাতের উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কোনোদিন আহার করেনি।” (বুখারি)। আর নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্য যদি স্বহস্তে পাকানো হয়, তা কতটা উত্তম একটু ভেবে দেখো, সোনা। এখনও দুপুরের ট্রেন ছেড়ে আসতে অনেক বাকি। সবাই চলে এসো, আজ একটা ঘরোয়া ডিনার হয়ে যাক।

– সত্যিই ! আসছি তাহলে? রাখলাম। উম্ম……

– চপাচপ শব্দ শুনতে পেলাম। এটা ভালোবাসার এভারেস্ট থেকে একখ- ভালোবাসার হিমবাহ গলে পড়ার শব্দ। যা মুহূর্তেই ভালোবাসার নদী হয়ে আমার অন্তরকে সিক্ত করে গেল। বুঝলাম, মিঠাকথায় নয়, হাতের গুনে ভালোবাসা সমীকরণের সমাধান শুদ্ধিপরীক্ষা সহ যথার্থ হয়েছে। এ ক্ষুদ্র জীবনে এর চে’ আর বেশি কিছুই চাওয়ার থাকে না।