ভারত বিরোধীতার নামে ধর্মীয় কার্ড ব্যবহারের সেই পুরোনো রাজনীতি!

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ সালে, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) দ্বিতীয় সম্মেলনে ৩২ তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল এতে যোগ দেয়। সম্মেলনে যোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে আঞ্চলিক চাপ ছিল। সেই সম্মেলনে বাংলাদেশকে মুসলিম দেশগুলো কি কি দিয়েছিল সেটি একটি বিরাট আলোচনার বিষয়। তবে পুরাতন মসজিদগুলো নির্মাণের সহায়তার আশ্বাস মিলেছিল বলে জানা যায়। সেই বৈঠকে একমঞ্চে পাশাপাশি বসে থাকা বহু ইসলামিক দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টের পূর্বে। উপরন্তু এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনিদের নায্য দাবীর প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল। অথচ জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান সহ বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিম হয়তো আশা করেছিল ইসলামিক দেশগুলো বৃহত্তরস্বার্থেই বাংলাদেশকে সাহায্য সহযোগিতা করবে। সেটা তারা করেনি। পরবর্তীতে দেখা গেল সেনা শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর এদের মধ্যেকার কিছু কিছু দেশের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য সহযোগিতা বাংলাদেশ পেয়েছে!

৭২-৭৫’ এ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল করার পিছনে জাসদ নামক দলটি বিরাট ভূমিকা রাখে। জাসদের লোভের আগুনে পুড়ে ছারখার হয় দেশের রাজনীতি। জাসদও আওয়ামীলীগকে তাবেদার হিসেবে আখ্যায়িত করে ভারত বিরোধীতার রাজনীতিকেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে। দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ৭৫ এর ২৪ জানুয়ারী বাকশাল প্রবর্তন হয়। কিন্তু মাত্র ৭ মাসের মাথায় ১৫ আগস্ট জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে থেমে যায় সমস্ত তৎপরতা। পর্যবেক্ষকদের মতে আরও আগেই বাকশাল গঠন করা গেলে এমনটি নাও হতে পারতো।

১৫ আগস্ট ঘাতকেরা সফল হয়েছে আর তৎকালীন রাজনীতিকরা ব্যর্থ হয়েছে এটিই চুড়ান্ত মূল্যায়ণ। আজকে যেসব প্রবীন বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিক বুদ্ধিজীবীরা বড় বড় কথা বলেন তাদের পরিপক্কতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে অর্জিত সাফল্য এবং ভারত বিরোধীতার নামে ধর্মীয় কার্ড ব্যবহারের সফলতাকে পুজি করেই ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে আছে একটি বিপথগামী শক্তি। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে বর্তমানেও এই শক্তিটি প্রবল প্রতাপে বিপুল বিক্রমে ছড়িয়ে আছে।

ভারতই বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে। ৭১ এ তাদের সরাসরি সহযোগিতায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ভারত আমাদের ১ কোটির বেশি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল, এসব ঘটনা সবাই জানি। প্রতিবেশী হিসেবে ভারত না হয়ে চীন কিংবা অন্য কেউ হলে আর তারা সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলে আমরা তাদের প্রতিও একই কারণে কৃতজ্ঞ থাকতাম। যেহেতু দেশটি ভারত এবং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু ফলে ভারত বিরোধীতার একটি কার্ড রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। কেননা আমাদের দেশটিকে ইসলামীকরণের একটি গোপন গভীর অভিসার নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক কোন কোন গোষ্ঠী। এ কারণে জামায়াতে ইসলামীকে মডারেট মুসলিম দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল আমেরিকা। যুদ্ধপরাধীদের বিচার থামাতে হিলারী ক্লিনটন ফোন দিয়েছিল। কাদের মোল্লা গংদের বিচার প্রশ্নে পাকিস্তানে মিছিল মিটিং হয়েছিল। আমরা হয়তো কখনোই ভেবে দেখি না দেশের বড় বড় ব্যাংক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে রাতারাতি গজিয়ে তোলা হয়েছে ইসলাম, শরীয়াহ, হালাল এর নামে।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সম্পর্ক শত সহস্র বছরের। বলা যেতে পারে বাংলাদেশ নামক দেশটি কিংবা বাঙালি নামক জাতিসত্ত্বার সাথে ভারতের সম্পর্ক এক ও অবিচ্ছেদ্য। বিশেষ করে বাঙালির চিন্তা ও ভাবধারার ক্ষেত্রে। এমনকি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে এককভাবে সবচেয়ে বেশি অবদান বাঙালিদের।

কেবলমাত্র আকারে বড় বলে নিজেদের অস্তিত্ব হারানোর অজানা শংকা এবং প্রতিবেশী হিসেবে কিছু কিছু ক্ষত্রে ভারতের সংকীর্ণতাকে পুঁজি করেই এখন পর্যন্ত আবর্তিত হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। আমাদের সাথে তাদের রয়েছে ৪০৯৬.৭ কিলোমিটারের সীমান্ত। বৃহৎ প্রতিবেশি হিসেবে তাদের সাথে দেশের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে নানা চুক্তি হয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া সরকারের আমলেও ভারতের সাথে চুক্তি করেছে। বরং জিয়াউর রহমান এক ধাপ এগিয়ে ভারত গিয়ে বলেছিল- ভারত আমাদের অভিভাবক। আর বেগম জিয়া তিস্তার পানির ব্যপারে কোন কথা না বলে দেশে ফিরে এসেছিল।

৭৪ সালে স্বাক্ষরিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকেই ৭৫ এর ১৫ আগস্ট পর গোলামী চুক্তি হিসেবে প্রচারণা চালানো হয়েছে জোরেসোরে। অথচ সেটি ছিল মূলত স্থলবন্দর চুক্তি। শত শত আর্টিকেল লেখা হেয়েছিল। আর সারাদেশ ঘুরে বিএনপি জামাত ফ্রিডমপার্টির লোকেরা ৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে গোলামী চুক্তি হিসেবে প্রচার করেছে।

ইতোপূর্বে ট্রানজিট এবং সাম্প্রতিক সময়ে ফেনী নদীর পানি ও বেসরকারী পর্যায়ে এলপিজি গ্যাস রপ্তানী সংক্রান্ত পৃথক চুক্তি হয়েছে। এসব নিয়ে নতুন করে সেই বিরোধীতার রাজনীতিই দেখা যাচ্ছে। অনুসন্ধান বলছে বে-সরকারী কিংবা বলা যেতে পারে ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে গ্যাস রপ্তানী সংক্রান্ত চুক্তির ফলে বাংলাদেশের যে কোন বৈধ অনুমোদিত ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে এলপিজি গ্যাস এনে তা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ভারতের ত্রিপুরায় রপ্তানী করতে পারবে। এই এলপিজি গ্যাস আমাদের দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। এতে সরকার ট্যাক্স পাবে। কিন্তু কোনভাবে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস ভারতে যাচ্ছে না। আর ফেনী নদীতে গভীর টিউবয়েল বসিয়ে পানি, ভারত আগেই তুলে নিয়ে যেত। তারা কি পরিমান নিয়ে যেত তা আমরা না জেনেই হইচই করছি। এবারে চুক্তির ফলে মাত্র ১.৮২ কিউসেক পানি খাবার পানি হিসেবে বৈধভাবে পাবে।

ভারতের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলো দেশের সার্বিক অগ্রগতিতে কতটুকু কাজ করছে সেটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরাই বিস্তারিত বলতে পারবেন। কিন্তু কথায় কথায় রাজনৈতিক কার্ড হিসেবে ভারত বিরোধীতা চরম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এতে কোন সন্দেহ নেই। এটি চরম রুগ্ন একটি প্রক্রিয়া। এই নীতির উপর ভর করেই টিকে আছে কিছু দলের রুটি রুজি সর্বোপরি ক্ষমতায় যাবার পথ। বাবরী মসজিদ না রাম মন্দির কিংবা গরু খাওয়া না খাওয়ার বিবাদকে কাজে লাগিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির সস্তা কাজটি আজও অব্যাহত রয়েছে। একজন জবর দখলকারী সম্রাট বাবর (ভারতীয় নয়- আফগানিস্তানের মানুষ) নিজ নামে মসজিদ নির্মাণ করলেই সেটি ইসলামের পবিত্র সম্পদ হয়ে যায় না। বাবরী মসজিদ ভেঙে ফেলার পর গোটা দেশে যে ম্যাসাকার করা হয়েছিল, সেই ক্ষত থেকে আজও আমরা বের হতে পারিনি। ইসলামের নামে ভারত বিরোধী ওয়াজে সয়লাব ইউটিউব পাড়া। মাঝে মাঝে মনে হয় তথাকথিত ওয়াজ নসিহতকারীর একমাত্র কাজ ভারত বিরোধীতা। এটি না করলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। ঈমানদার মুসলিম হবার শর্ত যদি হয় কথায় কথায় ভারত বিরোধীতা তবে সেটি সীমাহীন অজ্ঞতা। অনুসন্ধান বলছে ধর্মের নামে ভারত বিরোধীতার পিছনে আধিপত্যবাদীদেরই চক্রান্ত কাজ করছে। এ কাজে বৃহৎ শক্তিগুলোর বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। এ কারণে আমাদের দেশের ধর্মীয় সংগঠনগুলো এমনকি বিএনপির মতো দলগুলোর কখনো টাকার অভাব হয় না। বলা যেতে পারে আমাদের দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেপথ্যে বিশাল বিনিয়োগই কাজ করছে। প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ ধর্মভীরু মুসলিম। ভারত কিংবা হিন্দু উপাসনার বিরোধীতা ধর্মের কোন বিষয় হতে পারে না। পবিত্র কোরআন হাদিসের কোথাও এমন কোন নির্দেশনা কেউ দেখাতে পারবেন না। তবে কোরআনের কয়েকটি সূরার অপব্যাখ্যা দেন ওয়াজকারীরা। যা অজ্ঞ ও চরিত্রহীন আলেমের কাজ। ইসলামের স্পিরিটের সাথে এটি যায় না।

ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় আমাদের দেশের তথাকথিত মুসলিম সংগঠনের কোন কার্যক্রমের প্রতি গুরুত্ব দেয় বলে জানা যায়নি। বরং আমাদের দেশের তথাকথিত নষ্ট ভ্রষ্ট ধর্মপ্রতারকেরাই সব সময় ভারত বিরোধীতাকে ঈমানী দায় হিসেবে দেখে। এমনকি কিছু বামপন্থি রাজনৈতিক দলও ভারত বিরোধীতার নামে সংকীর্ণতার সীমাহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত। কোন কিছু না পেলে ভারতকে জুড়ে একটা গালি দেয়।

ভারত নিজেদের ভারেই ভারাক্রান্ত একটি দেশ। কোন পথে যাবে, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক রচিত হবে কিসের ভিত্তিতে এটি তারা হয়তো আজও পরিস্কার করে নির্ধারণই করতে পারেনি। এটি নির্ভর করে পারস্পরিক আস্থা বিশ্বাসের উপর। আমরা নিজেরাও শতভাগ আস্থার পরিচয় দিতে পারিনি। স্মরণে থাকা উচিত উলফার একাধিক নেতা ঢাকা থেকে গ্রেফতার হয়েছিল। চট্রগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়েছিল। সেই অস্ত্র কাদের, কোন কাজে ব্যবহৃত হতো তা কি দেশের মানুষ জানেন?

উপরন্তু ভারত বহুজাতির বহু বিভেদ-বিভাজন আর সংকটের মধ্য দিয়েই মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে তারা হয়তো উপলব্ধিই করতে পারেনা প্রতিবেশি বাংলাদেশের সাথে তাদের গৃহীত নীতি কৌশল কেমন হবে। সীমান্তে কাটাতারের বেড়া দেয়াটাকে তারা যতটা সহজভাবে দেখছে, বাংলাদেশের মানুষের এতটা সহজভাবে নেয়নি। ২০১৯ সালে এসেও সীমান্তে গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়। হতে পারে এরা ছোটখাটো চোরাকারবারী, গরুর দালাল, তাই বলে কি হত্যা করার পর্যায়ে যেতে পারে? প্রতিবেশি দেশের মানুষের জীবন কি এতটা তুচ্ছতার সাথে দেখা যায়? এমনকি এখনো বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কিভাবে ভারতে দেখানো যায় এই ক্ষুদ্র বিষয়টির কোন যৌক্তিক সমাধান হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে করা এনআরসিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলা হলেও এটি বাড়তি দুঃচিন্তা যোগ করেছে। ভারত একটি পৃথক দেশ হলেও তাদের গৃহীত বিভিন্ন নীতির জোরদার প্রভাব পড়ে আমাদের দেশে। উগ্রধর্মীয় কার্ড ব্যবহারের কুফল আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকেই শংকিত করছে। ভারত বিরোধীতা থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না সংগত কারণেই। তবে কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এ জন্য জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্ক  যোগাযোগ বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পারস্পারিক অবিশ্বাস নিরসনে গুরুত্ব দিতে হবে। শক্তিশালী বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকেই এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।