বাজেট ভাবনা ও বাস্তবতা

হাসান জামান টিপু 

করোনার আঘাতে কঠিন বিপদে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি দেশ। মাঝ দরিয়ায় ঝড়ে পড়লে যে রূপ ঠাহর করা যায় না কোথায় তীর বা কোন দিকে দিশা,এখন সকলের অবস্থাই তাই। এখন শুধুই টিকে থাকার লড়াই। 

বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থা সকলে অবহিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রচুর মেগা প্রকল্প নিয়ে নূন্যতম গণতন্ত্র নিয়ে বিরোধীদলহীন অদ্ভুতভাবে দেশ এগিয়ে চলছিলো। এতোদিন ইকোনোমিস্টসহ বিভিন্ন পত্রিকা তাই লিখছিলো- অর্থনৈতিক সকল সূচকে আমরা উড়ন্তগতিতে বাংলাদেশ । টাকা সারাদেশে উড়ছিলো, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছিল, কানাডায় বেগম পল্লী, মালয়েশিয়ায় ও দুবাইতে সেকেন্ড হোম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দূর্নীতিববাজদের উপনিবেশ তৈরী হচ্ছিল। সুইচ ব্যাংকে জমা হচ্ছিল এই গরিব দেশের কোটিপতি লুটেরাদের টাকা। করোনায় সব তছনছ হয়ে গেল। বিদেশ থেকে আমাদের শ্রমিক রেমিট্যান্স যোদ্ধারা ফেরত আসছেন দলে দলে, গার্মেন্টস এর অর্ডার একে একে বাতিল হচ্ছে, আমাদের বায়ার জায়ান্ট কোম্পানীগুলি একে একে দেউলিয়া যাচ্ছে, রপ্তানীর সকল খাত বন্ধ নতুন বিনিয়োগ আসা শূন্যের কোঠায়। এতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে আমাদের অর্থমন্ত্রী যে একটা বাজেট দিতে পেরেছেন এটা বিরাট সাফল্য। 

একটা পরিকল্পনা তৈরী করার জন্য একটা সুস্থ বা স্বাভাবিক পরিবেশ অগ্রগন্য এই করোনাকালের ঝড়ে সে অবস্থা তিরোহিত। টানেলের ওপারে শুধুই অন্ধকার,আলো কোথাও নাই। এই অবস্থায় যে বাজেট অর্থমন্ত্রী পেশ করেছেন কিছু সমালোচনাসহ প্রশংসাই করবো|

সবচেয়ে যে বিষয় নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে তা হলো, কালো টাকা সাদা করা বিষয়ে। টাকার আবার কালো আর সাদা কি? এই টাকা কি শুধুই দূর্নীতির টাকা? এগুলি কি অন্য দেশের টাকা?  

অর্থনীতিবিদ এবং আয়কর আইনজীবীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে কালো টাকা বলতে সে সম্পদ বা আয়কে বুঝায় যে সম্পদ বা আয়ের বিপরীতে কর প্রদান করা হয়নি৷ কিন্তু এর আবার দু’টি ভাগ আছে বলে তাঁরা জানান৷ এর একটি হলো বৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ, আরেকটি হলো অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ৷

তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, ‘‘আইনে কালো টাকা হলো অপ্রদর্শিত আয়৷ যে আয়ের কর দেয়া হয়নি৷ সেই আয় বৈধ এবং অবৈধ দুটোই হতে পারে৷ কিন্তু এনবিআর আয়কর নেয়ার সময় আয়ের উৎস জানতে চায়না৷ এখানে আয় বৈধ না অবৈধ সেটা আলাদা করার সুযোগ নেই৷ তবে খরচের খাত যখন দেখানো হয় তখন তার আয়ের উৎস বলতে হয়৷ এটি আয়কর দেয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়৷’’

বিদেশের নয় টাকাগুলি দেশের। এখানে প্রশ্ন থেকে যায় সরকার কালো টাকা টাকাকে সাদা করতে এতো ইতস্তত করে কেন? কালো টাকা সাদা করার বিধান আগেও ছিলো। ফখরুদ্দিন সরকারের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও সাবেক প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান কালোটাকা সাদা করেছিলেন সরকারের আইন মেনেই। গত বাজেটেও এই সুযোগ ছিলো সেটা উচ্চ কর হারের ফলে কালো টাকার মালিকরা নিরুৎসাহিত বোধ করতো। আর টাকার প্রবাহ বেশী হলে মুদ্রাস্ফিতি হওয়ার সম্ভবনা থাকে, দূর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার ব্যাপার থাকে। 

প্রশ্ন থাকে এই টাকা থাকে কোথায়? অবৈধ কালোটাকা বেশীর ভাগই পাচার হয়ে যায়, কিছু টাকা থাকে সিন্ধুকে, তোষকের নীচে, আলমারীর উপরে, ফলস সিলিং এর ভিতর ও চিপায় চাপায়। কিছু থাকে বেনামী একাউন্টে, আত্নীয় স্বজনের কাছে। অর্থাৎ দেশে থাকে।  

সত্যমানুষ শেখ হানিফ এঁর সাথে একদিন এসব ব্যাপারে কথা হচ্ছিল। উঁনি বলেছিলেন, যারা বিদেশে টাকা পাচার করে তারা জারজ, দেশের টাকা দেশে থাকলে দেশের কাজে লাগালে দেশ উন্নতি হবে, কর্মসংস্থান হবে।” উনি বলেছিলেন, “দূর্নীতি তো হবেই এটাকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়,এই টাকাকে অস্বীকার করার জো নাই। ” সেই সুযোগ কে অবারিত করেছে সরকার দেশের প্রয়োজনেই। সত্য মানুষের অভিপ্রায় এভাবেই প্রতিফলিত হলো। 

দেশে যে দূর্নীতি হচ্ছে তা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না, টাকা যে হাজারে হাজারে পাচার হচ্ছে তা সাবেক অর্থমন্ত্রী স্বীকার করে গিয়েছেন। এই টাকাকে আটকানো প্রয়োজন, টাকাকে সচল করতে হবে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই এই টাকাকে হিসাবের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। দেশের ঘোরতর অন্ধকার সময়ে এই সিদ্ধান্ত আমি ইতিবাচক হিসাবেই নিবো। 

আপনি হয়তো বলবেন দূর্নীতিকে জিরো টলারেন্স বলে কলো টাকাকে সাদা করবেন এটা সাংঘর্ষিক। আমি তা মনে করি না। দূর্নীতি কেন হয় সে বিষয়ে আগে ব্যবস্থা নিতে হবে। সিস্টেমে বহু ফাঁক ফোকর আছে নীতির বিচ্যুতি ঘটানোর সেই ফাঁক দিয়ে হয় দূর্নীতি। সেই ফাঁক বন্ধ না করে জিরো টলারেন্স রাজনৈতিক ফাঁকা বুলি ভিন্ন কিছু নয়। 

 সমাজে যে অবৈধ টাকা আছে একথাটা অস্বীকার করার অর্থই হলো আপনি জেগে ঘুমান। বিশেষজ্ঞ দের ধারণা বাংলাদেশের মোট বাজেটের দ্বিগুন, তিনগুন টাকা থাকতে পারে হিসাবের বাইরে কালো টাকা হিসাবে। এতো টাকা বাইরে রাখা যে কোন সরকারের জন্যই বিশাল ঝুঁকির কারণ। সেই ঝুঁকি কোন সরকারই নিতে চাইবে না স্বাভাবিক কারণে।

আধুনিক মালয়েশিয়ায় রূপকার ড.মাহাথির মোহাম্মদ একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন তখন এক  প্রশ্নে একজন বললেন আমাদের দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে, কিভাবে উন্নয়ন হবে অর্থনীতির?তিনি বললেন, পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশে বিভিন্ন মাত্রায় দূর্ণীতি বিদ্যমান রয়েছে। সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত দেশ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে দুর্ণীতি দুই প্রকারের। টেবিলের উপরে আর টেবিলের নিচদিয়ে, দ্বিতীয় পন্থায় দুর্ণীতি করলে কিছুটা হলেও মানুষ শংকিত থাকে, লজ্জিত থাকে এবং এ প্রকারের দুর্নীতি নিয়ে খুব বেশি আশঙ্কা নেই। প্রকৃতপক্ষে প্রথম প্রকারের দূর্ণীতি অর্থাৎ নির্লজ্জ দূর্ণীতিকে দূর করতে হবে, যার মাধ্যমে অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। (তথ্য সূত্র ঃড.নূরল ইসলাম তপন, আমার শ্রদ্ধেয়)

এই সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনা বৃদ্ধিতে কাজ করতে পারে সরকার, অগ্রসর ব্যাক্তিবর্গ, মিডিয়া। আমরা কি করো প্রতি নীতিবাক্য প্রদানকরার মতো ব্যক্তিগতভাবে নীতিবান?