বাঙালির আত্মদর্শনে বাংলা ভাষা

ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন ॥ সারা বিশ্ব জুড়ে হাজার হাজার ভাষা রয়েছে। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের এ ভাষার রয়েছে নিজস্ব বিশেষত্ব। প্রতিটি ভাব প্রকাশ বিকাশের ও ভাষা মাধ্যমের রয়েছে ভিন্নতা ও সুক্ষ্মতা। ভিন্নতা ও সুক্ষ্মতার সকল মাত্রাকে ছাড়িয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা। বৈচিত্র্যতার বহুবিধ রূপ শুধু নয় মানব অস্তিত্বের এক অন্তরঙ্গ সূত্রের সাথে ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে বাংলা ভাষা। বাংলা শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম নয়, এ ভাষা বাঙালির সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিকতার সাথে জড়িত আজন্মকাল থেকে। আত্মদর্শনে এক জীবন্ত রূপ ‘বাংলা’। যদিও বাংলা ভাষার এই বিশেষ রূপটি আজ ক্ষমতালোভী ধর্মীয় রাজনীতির খপ্পরে পড়ে তার আপন ঐশ্বর্য হারিয়ে অনেকটা পঙ্গুভাবে এগিয়ে চলছে।

একটু পেছনে গেলেই আমরা বাংলা ভাষার গৌরবময় আধ্যাত্মিক রূপটা বুঝতে পারবো।

বাংলা বর্ণমালার প্রথম বর্ণ অ। অ হচ্ছে ব্রক্ষবীজ তথা সকল সৃষ্টির আদি বীজবর্ণ বা কারণ। অ থেকেই উদ্ভব হয়েছে অনেক তথা বহুত্বের। মানবদেহের সুক্ষ্ম সুর ও স্বরসহ সমস্ত উচ্চারণের আদি স্বর হচ্ছে অ। অ স্বর হতে অক্ষর। বাংলা ভাষার আদ্যস্বর এবং বাংলা বর্ণমালার আদ্যক্ষর ও তাই অ। পন্ডিত ও বৈয়াকরনবিদগণ দাবি করেছেন আবহমান কাল থেকে বাংলা অ’ কার স্বতন্ত্র অবস্থায় বর্তমান ছিল। কেউ কেউ বলে দেবনগরী অ থেকে বাংলা অ-কারের সৃষ্টি হয়েছে। উৎপত্তি বা বুৎপত্তি নিয়ে যত মতান্তর থাকুক না কেন, পৃথিবীর সকল ভাষায় প্রথম স্বরচিহ্ন রূপে ‘অ’ এর ব্যবহার অতিদৃষ্ট হয়। যেমন আরবী ভাষায় আলিফ, রোমান ভাষায় আলফা, ইংরেজী ভাষায় অ্য ইত্যাদি।

প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিক পানিনি বলেন, “অকুহ বিসর্জনারা নং কণ্ঠ অর্থাৎ অ-কারের উচ্চারণ স্থান কন্ঠ সংস্কৃত ব্যাকরণ মতে উচ্চারণ ভেদে অ-কার আঠারো প্রকার। যথা: হ্রস্ব অ, দীর্ঘ অ, পুত অ। এরপর উদাও অ, অনুদাও অ, স্বরিত অ। তারপর পুত উদাও অ, পুত অনুদাও অ ও পুত স্বরিত অ। এ নয় প্রকার উচ্চারণের রয়েছে আনুনাসিক ও অনানুনাসিক উচ্চারণের পার্থক্য যা অষ্টাদশ  স্বরে বা আঠারো পর্দায় বিন্যস্ত। বাংলা অ-কার উচ্চারণের এমন স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য পৃথিবীর অন্য কোন ভাষার আদি অন্তরে নেই। অ-কারের এমন বৈচিত্র্যময় উচ্চারণ আত্মস্থ করার জন্য সম্যক গুরু তথা তত্ত্বজ্ঞানী সূফী সাধকের শরণাপন্ন না হয়ে শিখতে গেলে যথার্থ ‘অ’ আয়ত্ব করা যায় না। তাই বুনিয়াদি ভাষা শিক্ষা প্রাচীন ভারতে এ কারণেই আধ্যাত্মিক শিক্ষার সাথে একত্রে সংযুক্ত বিষয় ছিল। প্রাচীন বাংলা ভাষার ব্যবহার শিক্ষা গুরুমূখী উচ্চাঙ্গ সংগীত সাধনার মতো সমৃদ্ধ ও অত্যন্ত কঠিন বিষয় ছিল। একজন সত্যমানুষ তথা সূফী তথা সম্যক গুরুর কাছে হাতে কলমে বাংলা শিক্ষার জন্য তার আশ্রমে দীর্ঘকাল নানা আসনে ধ্যান ও কণ্ঠসাধনা করতে হতো। কানাই বিনে যেমন গীত নেই আমাদের বাঙালি ঐতিহ্যে তেমনই গুরু তথা আধ্যাত্মিক শিক্ষক ব্যতীত কোন ভাব ও ভাষার অস্তিত্ব মেলে না। প্রাচীন বাংলায় তাই প্রাচীন বঙ্গভাষায় অ এর হ্রস্ব, দীর্ঘ, পুত এ তিন ধরনের উচ্চারণ শুদ্ধভাবে আত্মস্থ করার জন্য তত্ত্বজ্ঞানী গুরুর দ্বারস্থ হতেই হতো। পিতামাতাগণ শৈশবে আপন সন্তানকে তাই গুরুর নিকট হস্তান্তর করতেন বিনীত চিত্তে।

কেন বাংলাভাষা আধ্যাত্মিক গুরুর নিকট শিখতে হয় তা অ কারের উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। অ কার শুরু একটি অক্ষর নয়। এটি একটি অস্তিত্বের নাম যা সকল অস্তিত্বের অস্তিত্ব। অ-কারে আল্লাহ তথা ঈশ্বরত্ব প্রতিপাদিত। অ-কারের মধ্যে ব্রহ্ম, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও শক্তি সকলই বিরাজমান। কোন কোন স্থানে অ কারে ব্রহ্ম তথা আল্লাহর অস্তিত্ব ও বুঝানো হয়েছে। যেমন- ভারতচন্দ্র রায় গুনাকার অন্নদামঙ্গলে বলেছেন- অ কার ব্রহ্ম কেবল একাক্ষর কোষ।

অউম তথা প্রণবনাদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রাচীন সূফীগণ করেছেন। জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি ও তুরীয়Ñ এ চারটি স্তর আত্মচেতনার। ব্রহ্মের চারটি পর্যায় – বিরাট, হিরন্যগর্ভ, ঈশ্বর ও ব্রহ্ম। জগত তথা দেহ চারভাবে বিভক্ত। যথা – স্থুল, সূক্ষ্ম, কারন ও মহাকারন। বোধের চার পর্যায় – বস্তু, ভাব, শক্তি ও চৈতন্য। এ সকল কিছুর বাচক হলো অউম নাদ বিন্দু। সাধারণত যে ‘ওম’ উচ্চারণ করা হয় তা বৈলরী বাক। এর তিনটি স্তর – সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর ও সূক্ষ্মতম এবং বোধের পর্যায় অনুসারে ওর আরও তিনটি গোপন তল আছে। সেগুলোকে বলা যায়- ভাবনা, জ্যোতি ও স্পন্দন। সব মন্ত্রই শেষ পর্যন্ত অউমকারে পর্যবসিত হয়। সেটা শূণ্যচিত্তে বা চিন্তাকাশের গভীরে একটি স্পন্দন মাত্র। স্পন্দন জ্যোতি হয়, জ্যোতি চিন্তা জগতের ভেতর ফুটে উঠে ভাবনার ভেতর দিয়ে, অত:পর বাক বা বাক্য হয়ে বেরিয়ে আসে। যে কোন মন্ত্রের বা গুরুদেবতার বা অবতারের এটাই পরম তাৎপর্য। দেবতা, মন্ত্র, গুরু ও আমি এ চারটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দক্ষিণা মুর্তিই হচ্ছে আত্ম চৈতন্য যা স্ফুরিত হয় ব্রহ্ম চৈতন্যে। আত্মচৈতন্য আর ব্রহ্ম চৈতন্যের মধ্যের মন্ত্রটি ওমকারের স্পন্দন সেতু। আর দক্ষিণা মুর্তি হলো পানিতে একফোটা পানি ফেললে যেমন ছড়িয়ে পড়ে তেমনি তিনি তুরীয়রূপে ছড়িয়ে পড়ছেন। এভাবে তিনি (উম) প্রণবার্থ, মন্ত্রের অর্থ বা প্রতিপাদ্য বা বাচ্য।

অ-উ-ম এ তিন বীজবর্ণের সমবায়ে ওঁ প্রণবের উৎপত্তি। শুদ্ধচিত্ত সাধু যোগীগণ বলেন, চিন্তা একাগ্র করতে হলে প্রথম অবস্থায় ওঁংকার উচ্চারণ করলে চলবে না। তারপূর্বে ওঁকারের আদিস্বর অ- কার এবং অ-উ-ম কার উচ্চারণ করতে হবে। অ হচ্ছে আদি ব্রহ্মনাদ। তাই সকল নামের সমষ্টি ‘অ’।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাংলা ভাষার অ অক্ষর এবং অউম (ওম/ওঁ) এর উচ্চারণের মাহাত্মের সাথে সত্যমানুষ তথা সূফী সাধকগণ জড়িয়ে আছেন অর্থাৎ আত্মদর্শনের জন্য বাংলা ভাষা একটি জীবন্ত মানবভাষা যা অন্যান্য ভাষা থেকে একেবারেই ভিন্নতর ও বৈচিত্র্যময়। কিন্তু ভাষা যখন মানবিক ভাববিকাশের সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয় তখন আর আত্মদর্শনমুখী গুরুবাদের মর্যাদা এবং ধর্মের ভাব কোথাও রক্ষিত হয় না। ফলে পররাজ্যগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী কূটাচার অনুসারে ভাষাভিত্তিক ধর্ম হয়ে উঠে ক্ষমতা দখলমূলক রাজনীতির হাতিয়ার। তাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষে শাসন শোষণ পোক্ত করতে ইংরেজ পন্ডিত হ্যালহেড সাহেবকে দিয়ে ইংরেজী ভাষায় প্রথম বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশ করেন তাদের মতো করে। এর অন্তরালে ছিল রাজনৈতিক ধর্ম ব্যবসার এক সুদূর প্রসারী চিন্তা-ভাবনা। ১৮০১ সালে এদেশে রাজনৈতিকভাবে বাঙালিদের ধর্মান্ত করনের লক্ষ্যে বাংলা ভাষায় বাইবেল অনুবাদ ও প্রকাশের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ কাজ দ্রুত গতিতে সফল সরার  জন্য খ্রিষ্টান পাদ্রি উইলিয়াম কেরিকে দিয়ে বাংলা ব্যাকরণ ও লিপি সংস্কারের নামে বাংলা বর্ণ অ এর হ্রস্ব ও দীর্ঘ এ দুটি রূপ অর্থাৎ “অ-কার ও আ-কার” রেখে বাকী উচ্চারণ বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যকে নিধন করা হয়। আর এরই সাথে নিধন করা হয় আত্মদর্শনমূলক জীবন্ত মানবভাষা বাংলার আধ্যাত্মিক স্বরূপকে। কারণ প্রাচ্যের গুরুমূখী (আধ্যাত্মিক শিক্ষক) এ সূক্ষ্মতর ভাষা একাডেমিক চর্চার মাধ্যমে কোন পাশ্চাত্যে পন্ডিতের পক্ষে আয়ত্ব করা একেবারে অসম্ভব ব্যপার ছিল। তাছাড়া এদেশে দ্রুতগতিতে অধিক সংখ্যক বাঙালিকে খ্রিষ্টান বানানোর পথে দীর্ঘকালীন সাধনা সাপেক্ষ এমন কঠিন পদ্ধতির ভাষাশিক্ষাকে মারাত্মক একটি প্রতিবন্ধক রূপে দেখেছিল ব্রিটিশ রাজতন্ত্র। আর তাই আত্মদর্শনের জীবন্ত মানবভাষা বাংলা আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের ধর্মীয় রাজনীতির চক্রান্তে পড়ে তার আপন ঐশ্বর্য হারাল। রুদ্ধ হলো বাংলা ভাষার স্বাধীন গ্রহণ-বর্জন ক্ষমতা ও অবারিত বিকাশ পথ।

সুতরাং আমরা এখন যে প্রমিত নামক তথাকথিত শুদ্ধ বাংলায় বলতে ও লিখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি তা আমাদের মায়ের ভাষার প্রকৃত ঐতিহ্যের বিকশিত রূপ মোটেও নয়। কলোনিয়াল ধর্মান্ধ শোষকদের সংস্কারকৃত ভাষা মাত্র। প্রকৃত বাংলা ভাষা নান্দনিকভাবে নিগৃহীত,রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত সাংস্কৃতিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের দালালদের দ্বারা।

আর এভাবেই আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের মূল অস্তিত্বকে। যদিও বাংলা ভাষা সহজ হয়েছে কিন্তু ভেতরের প্রাণটুকু অনেকটাই নিষ্প্রভ। সাধনার সংযোগ নেই। তাই ভাষার ব্যবহারে আধ্যাত্মিক বাঙালি চরিত্র ব্রিটিশ দালালী তথা ভিন্ন সংস্কৃতির মাঝে হারিয়ে গেছে অনেকটাই ব্রিটিশ বিদায়ের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালির ধর্মীয় পরিচয়টাকে প্রধান করে দেখানোর চেষ্টা করেছে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী। বাঙালি পরিচয়কে ভেঙ্গে হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি রূপে চিত্রিত করা হয়েছে ধর্মান্ধতার মুখোশে। হিন্দু বাঙালির চেয়ে মুসলমান বাঙালি ভিন্ন জাতি সত্ত্বার মানুষ সেটা বুঝানোর প্রাণান্ত চেষ্টায় লিপ্ত হয় পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী। বাঙালি মুসলমানকে তার স্বজাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এমনকি মুখের ভাষা থেকেও বিচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়। এমনিভাবে আরবী, ফারসী, পর্তুগীজ, উর্দু ইত্যাদি ভাষার শব্দের আগমনে বাংলা তথাকথিত সমৃদ্ধির নামের স্বকীয়তা বিলীন বিসর্জন দিয়েছে বার বার। শাসন শোষন ধর্মান্ধতার মাধ্যমে গভীর আধ্যাত্মিক গুরুমূখী ভাষাটিকে বার বার অস্ত্রোপাচার করার চেষ্টা হয়েছে সুক্ষ্মভাবে।

সময় এসেছে আবারো গুরুমূখী হয়ে প্রকৃত বিদ্যা শিক্ষা করার। প্রকৃত বাঙালি ও বাংলাভাষী হয়ে বিধাতাচরিত্র গ্রহণ ও ধারণ করবার।