বাংলার শত্রু বাঙালি!

সংলাপ ॥ প্রতিবছর ফেব্রুয়ারী মাস এলেই বাংলা ভাষার জন্য বাংলাদেশে যে আবেগ-উচ্ছ্বাস দেখা যায় তা বাংলা একাডেমি এবং শহীদ মিনার চত্বরে, পত্রপত্রিকায় ও বৈদ্যুতিন প্রচার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ। ওই এলাকার বাইরে ঢাকা মহানগীর যে দিকে চোখ মেলা যায় শুধু ইংরেজী আর ইংরেজী। বিভিন্ন স্থাপনা, বাণিজ্য বিতান, দোকানপাট, বাড়িঘর সবকিছুর নামধাম ইংরেজী ভাষায়।

কে বলবে যে ঢাকার লোক বাংলাদেশের মানুষ? তাদের মাতৃভাষা বাংলা? হঠাৎ কি হয়ে গেলো যে আমরা আমাদের মাতৃভাষার প্রতি বিমুখ হয়ে উঠতে লাগলাম। ছেলেমেয়েদের ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে পাঠাতে প্রতিযোগিতা শুরু করলাম। আমাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুর ইংরেজী নামকরণ এবং ইংরেজী নামফলক ঝুলিয়ে এক বিচিত্র আত্মপ্রসাদ উপভোগ করতে লাগলাম। আমাদের অবস্থা এখন কবি ঈশ্বর গুপ্তের একটি কবিতার সেই দুটি অবিস্মরণীয় চরণ মনে করিয়ে দেয় – ‘স্বদেশের ঠাকুর ফেলি বিদেশের কুকুর পূজি’। আমরা আমাদের আপন মায়ের ভাষা ত্যাগ করে বর্তমানে বিদেশী মায়ের ভাষাকে আমাদের ভাষা ভাবছি।

বর্তমানে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার যে অবর্ণনীয় দুরাবস্থা চলছে তার জন্য বিশ্বায়ন বা আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহকে দায়ী করে লাভ নেই। প্রয়োজনে আমাদের অবশ্যই বিদেশী ভাষা শিখতে হবে, ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু সে জন্য কি মাতৃভাষা বিসর্জন দিতে হবে? যে কোনো অবস্থাতেই কোনো একটি দেশে কোনো বিদেশী ভাষা সে দেশের মাতৃভাষার বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশেও ইংরেজী ভাষা কোনো বিবেচনাতেই বাংলা ভাষার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক ভাষা। যদি কেউ মনে করে থাকেন যে বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে ইংরেজী ভাষার মাধ্যমে আমরা সমৃদ্ধ হবো তাহলে তিনি মূর্খের কল্পনার বেহেশতে বাস করছেন। বিদেশী ভাষা হচ্ছে বোতলের দুধের মতো, যা কোনো অবস্থাতেই মাতৃদুগ্ধের মতো নয়।

দীর্ঘ পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ বিগত তিন হাজার বছরের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে আমরা যেমন কখনো প্রকৃত অর্থে বাঙালি দ্বারা শাসিত হইনি তেমনি বাংলা ভাষা দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হইনি। আমাদের মুখে ভাষা ছিলো বাংলা, কিন্তু রাজসভার ভাষা ছিলো বাংলার শাসক শশাঙ্কের আমলে সংস্কৃত, পাল রাজাদের আমলে প্রাকৃত বা অপভ্রংশ, সেন রাজাদের আমলে সংস্কৃত। মধ্যযুগের বাংলায় স্বাধীন সুলতানী এবং ঔপনিবেশিক মোঘল আমলে দরবারী ভাষা ছিলো ফার্সী, ইংরেজ ও পাকিস্তানী আমলে উর্দু ও ইংরেজী।

মধ্যযুগে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান কবিরা যথাক্রমে সংস্কৃত ভাষা এবং আরবী-ফার্সী ভাষায় দেবনগরী বা আরবী হরফে সাহিত্য রচনা না করার কারণে ব্রাহ্মণ পন্ডিত ও কাঠ মোল্লাদের অভিশাপ বা ফতোয়ায় বাংলার মানুষ নরক কিংবা হাবিয়া দোযখে যাবার ভয়ে কেঁপেছিলো। কিন্তু সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করলে সে জন্য সাধারণ মানুষকে দায়ী করা চলে না। সর্বোপরী ওইসব ধর্মীয় গোঁড়ামি অতিক্রম করেও মাতৃভাষার সাহিত্য চর্চা হয়েছে।

বাংলা ভাষা আন্দোলনের ফলাফল কি বাঙালি মুসলমানের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশকের মধ্যেই যে আমরা আবার স্বদেশ থেকে বিদেশে ফিরে যাচ্ছি তার কারণ কি? বাঙালি কি প্রকৃতই একটি আত্মবিস্মৃত এবং আত্মঘাতী জাতি! এ জাতিকে জাগিয়ে রাখতে হলে একুশ ও একাত্তরের মতো প্রচন্ড ও ভয়াবহ আঘাত কি আরো প্রয়োজন?

স্বাধীন বাংলাদেশে বৈদ্যুতিন প্রচারমাধ্যমগুলোতে আজ বহিরাগত হলিউড ও বলিউড সংস্কৃতির যে দাপট তাতে বাংলাদেশের মানুষের পিতৃপরিচয়, ঠিকানা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্ম – সব তো ভুলিয়ে দিচ্ছে! বাংলাদেশে প্রতিবেশী দেশের বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোর চেয়ে হিন্দি চ্যানেল পাওয়া যায় বেশি। এসব চ্যানেলের নানা রঙ্গিন অনুষ্ঠানগুলোই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ঘরে ঘরে পরমানন্দে উপভোগ করে থাকেন।

একুশ শতকে হলিউডের নকল করছে বলিউড আর বলিউডের নকল করছে ঢাকার প্রচার মাধ্যমগুলো আর আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা তা বিনা প্রতিবাদে চোখ-কান বন্ধ করে হজম করছি। আমাদের মহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বিস্মৃত হচ্ছি, পক্ষান্তরে আমরা আমাদের মাতৃভাষা ও বর্ণমালাকে বিসর্জন দিচ্ছি। এ কারণেই বলতে হয়, বাঙালি নিজেই তার মাতৃভাষার সবচেয়ে বড় শত্রু!