প্রার্থনা

॥ শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক ॥

এক শিশু একটি ফুল পেয়েছিল। ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে সে যা চাইতো তা-ই পেত। একটি পাপড়ি ছিঁড়ে শিশুটি বলল – ‘খেলনা চাই, অনেক-অনেক খেলনা’। অমনি আকাশ থেকে এত খেলনা আসতে থাকলো যে, সে খেলার মতো খালি জায়গাই পেলো না। তাড়াতাড়ি সে আর একটি পাপড়ি ছিঁড়ে বলল -‘সব খেলনা ফিরিয়ে নাও’।

এক দম্পতীর ৪০তম বিবাহ বার্ষিকীতে স্বয়ং বিধাতা এসে বললেন, ‘তোমাদের প্রেমে আমি সন্তুষ্ট। আমার কাছে কিছু একটা চাও তোমরা, যা চাও তা-ই পাবে। স্ত্রী বললেন, ‘আমি আমার বরের সঙ্গে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে চাই’। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বভ্রমণের সরঞ্জাম পেয়ে গেলেন। স্বামী একটু ভেবে-চিন্তে বললেন, ‘আপনি যা দিলেন তা অতি চমৎকার, কিন্তু আমি চাই আমার স্ত্রী যেন বয়সে আমার থেকে ২৫ বছরের ছোট হয়’। বিধাতা বললেন, ‘তথাস্ত’ সঙ্গে সঙ্গে সে ৯৩ বছরের বৃদ্ধ হয়ে গেল।

এক অন্ধ ভিখারিকে বিধাতা বলেলেন, ‘দেখ হে! আমি তোমার উপাসনায় সন্তুষ্ট। তুমি কিছু একটা চাও কিন্তু একটিমাত্র জিনিসই চাইতে পারবে’। ভিখারি খুব বিপদে পড়ে গেল। কী যে চাইবে, কিছুতেই ঠিক করতে পারল না। একবার ভাবল দৃষ্টি ফিরে চাইবে, আবার ভাবল টাকাকড়ি চাইবে, আবার ভাবল দীর্ঘজীবন চাইবে কিন্তু কী যে চাইবে ঠিক করতে পারল না। অগত্যা সে বলল, ‘আমি একদিনের সময় চাই’। বিধাতা বললেন – ‘তথাস্ত’।

মানুষ তার অসহায়ত্বকে অতিক্রম করতে পারে না। জীবন চলার পথে প্রত্যেকে অনুভব করে, আমাদের সমস্যার সমাধান, সুরক্ষা এবং বিভিন্ন চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তির সাহায্য প্রয়োজন। তাই আমরা সাহায্য পার্থনা করি।

যে ছাত্র পড়াশোনা করে না, পরীক্ষা দেয় না, সে যদি কলেজের অধ্যক্ষের কাছে পরীক্ষা পাশের সনদ চায় তবে সে প্রার্থনায় অধ্যক্ষ ছাত্রের প্রতি আরো রুষ্ট হবেন, এটাই স্বাভাবিক। অধ্যক্ষের সাথে আমরা বিদ্রুপ করতে পারি না। মানুষকে সফলতা দেয়ার দায়িত্ব বিধাতা নেন নি। আমরা যদি মেনে নেই যে, বিধাতা আমাদের কোনো কোনো প্রার্থনা গ্রহণ করেন আর কোনো কোনো প্রার্থনা গ্রহণ করেন না তবে তা ভুল। মানুষ তার কর্মের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। মানুষ নিজেই তার কর্মফল তৈরি করে।

বিধাতা তাই চান যা আমরা চাই। তা-ই করেন যা আমরা নিজেরা নিজেদের জন্য নিজেরা করি। আমাদের কোনো কর্মে বিধাতা হস্তক্ষেপ করেন না। কোনোদিন করবেনও না। বিধাতা আমাদের কর্মের দ্রষ্টা, স্রষ্টা নন। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু জীবনে যা কিছু সৃষ্টি হয় তা আমাদের দ্বারাই হয়। যদি তিনিই আমাদের কর্মের স্রষ্টা হবেন তাহলে কেমন করে তিনি আমাদের যোগ্যতা বিচার করবেন? বিধাতা আমাদের পালনকর্তা। কিন্তু তিনি আমাদের সেভাবেই পালন করেন যেভাবে আমরা চাই এবং যেভাবে পালিত হওয়ার যোগ্যতা আমরা অর্জন করি। তিনি যদি তার ইচ্ছামতো আমাদের পালন করেন তাহলে কীভাবে তিনি সত্য? আমার জীবনের চৌহদ্দিতে আমার ইচ্ছাই বিধাতার ইচ্ছা। আমাদের যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই জীবনযাপন করতে পারি, করছিও তাই। এখানে বিধাতার করার কিছুই নাই। প্রার্থনা করার আগে এটা উপলব্ধিতে আসতেই হবে যে বিধাতার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার নেই, চাওয়ার কোনো তাৎপর্যও নেই।

এটিই সবচেয়ে বড় প্রহেলিকা যে, আমরা মনে করি আমাদের জীবনে যা কিছু হচ্ছে তা তিনিই করছেন। যত বিপদ-আপদ আসছে তা তাঁর কাছ থেকেই আসছে। যত সফলতা আসছে তা তাঁর কাছ থেকেই আসছে। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। আর তা হতেও পারে না। বিধাতা খেলা দেখেন কিন্তু কারো পক্ষ হয়ে খেলেন না। শেষ বলে চার রান হলেই খেলায় জিত। বিধাতার কাছে কোটি মানুষ হাত তোলে ‘প্রার্থনা’ করতে পারে। চার দেয়ার ক্ষমতাও তাঁর আছে কিন্তু কারো ‘প্রার্থনায়’ সাড়া দিয়ে চার দিলে যে অন্যায় পক্ষপাতিত্ব হয়, তা বিধাতা কদাপি করেন না। কোটি কোটি মানুষের ‘প্রার্থনার’ চেয়ে সত্য অনেক বড়।

সাময়িক আবেগে ‘প্রার্থনা’ কিংবা অন্যের শিখানো তথাকথিত যেসব ‘প্রার্থনা’ আমরা আবৃত্তি করি তা যে ছাদ পর্যন্তও পৌঁছায় না তা আমরা জানি। কিন্তু ‘যা চাইবো তা-ই পাবো’ এই সুযোগ কিংবা ‘বিশ্বাস’ যদি আমাদের থাকে, তাহলে ‘কী চাইবো’ তা নির্ণয়ের জন্য আমাদের সময় চাইতে হবে। আমরা জানি না প্রকৃতই কী চাই। অর্থ, বিত্ত, খ্যাতি সহজেই সবাই চাইতে পারি। কিন্তু কী পেলে যে আর কোনো অভাববোধ থাকবে না, তা আমরা জানি না।

আমি যা চাই তা-ই আমার সত্য। আমার সত্য কোনটি?

আমার সত্য আমার কাছে রহস্য, গুপ্ত। বিধাতা আমার কাছেও আসেন কিন্তু চাওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত নই। তাই আমি ভিখারির মতো বলি – ‘কী যে চাই তা জানার জন্য সময় চাই’। মানব জীবনটাই ‘কী যে চাই’ তা নির্ণয়ের সময়।

কী চাই, তা-ই যখন জানি না তখন তা পাওয়ার যে কোনো আশাও নাই – তা আমি বুঝি। তাই ‘কী চাই’ এ প্রশ্নই নিজেকে করি বারবার। জীবনকে মন্থন করি, বারবার পাঠ করি, চিন্তায় ঝড় তুলি। আমি কিছু একটা চাই। কিছু একটা অন্বেষণ করি। কিন্তু কী যে খুঁজি, কাকে যে খুঁজি, কী পেলে যে আমি পূর্ণ হবো, তা আমি জানি না। কোনো চাওয়াতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারি না। কিছু একটা চাই কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, আমি যা চাই এ তো তা নয়। যাহা পাই তাহা চাই না। যাহা পাই তাহাই আমার কাছে বোঝা মনে হয়, স্বার্থের টানে। তাই আমার ‘চাওয়ায়’ একটার স্থলে অন্যটা প্রতিস্থাপিত হয়। যা অবলম্বন করে আমি জীবনের স্বপ্ন দেখি তা যখন ছেড়ে দেই তখন আমি ভোগ করি আমার মৃত্যু যন্ত্রণা। বারবার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হাঁটছি জীবনের পথে। অথচ আমি এমন কিছু চাই যা পেলে প্রতিস্থাপনের প্রশ্ন উঠবে না।

আমার মধ্যে অ-মৃতের নেশা। মৃত্যুর মধ্যে অ-মৃতের স্বাদ পেয়েছি প্রেমে। কিন্তু প্রেমিক আমি হতে পারিনি হয়েছি শিশু: পাপড়ি ছিঁড়ে বলছি, খেলনা দাও…., হয়েছি কামুক স্বামী, অন্ধ ভিখারি। 

প্রেমিক প্রেমাস্পদের কাছে কী চায়? প্রেমাস্পদ তো চাইবার আগেই জানেন, প্রেমিক কী চায়। তাই সত্যিকার অর্থে প্রার্থনা হলো যখন কোনো প্রার্থনা থাকে না।