প্রস্ফুটিত ফুল হয়ে উঠার মধুক্ষণ…. ২০২০ মুজিব বর্ষ ॥ ২০২১ স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী

নজরুল ইশতিয়াক ॥ সময়ের মধ্যে আছে সময়। জীবনের মধ্যে আছে জীবন। সময় প্রকৃতির একটা ঘড়ি। সেই নিয়মে সময় অতিবাহিত হচ্ছে। দেখতে দেখতে ২০১৯ এর বিদায় ঘন্টা বাজতে শুরু করেছে। মহাকলের গর্ভে অবসান হবে আরেকটি বছরের। এই যে বছরের হিসেব-নিকেশ তার হয়তো কোন মূল্য নেই মহাকালের কাছে। তবু সময়ের রথে চড়েছে জীবন ও জগত উভয়েই। সময় সত্য হয়ে বলে যাচ্ছে, দেখিয়ে যাচ্ছে, প্রকাশ করে যাচ্ছে তার গর্ভে থাকা বিশালত্বের ঐশ্বর্য। ছড়িয়ে পড়ছে তার চিরসুন্দর আলোকছটা। জগত সুন্দরের বন্দনাগীত রচিত হচ্ছে মানুষের হাত ধরে, মানুষের কর্ম সাধনায়।

দেহ নিজেও একটি ঘড়ি। এটি প্রাকৃতিক ঘড়ির একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। ক্ষুদ্রই-বা বলি কিভাবে! এই দেহ ঘড়ির আবর্তন হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম মেনেই। ফলে সময় নয়, বয়ে যাচ্ছে জীবন। এই বয়ে চলার পথে কিছু স্মারক, কিছু স্মৃতি চিহ্ন, কিছু দৃষ্টান্ত, কিছু নিদর্শন রেখে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হাজারো অংকনের ছাঁপ আঁকা পড়ছে সময় নামক কালের রথে। সেসব স্মারক বহন করে চলে মানুষ, মানুষের সৃষ্ট সভ্যতা। রচিত হয় জানা-অজানা কত শত উপাখ্যান। আবিস্কার- উদ্ভাবন, মহত্ব-বীরত্বের। জীবনের খেরোখাতায় লেখা হয় কত কি? অংকের হিসেবে যোগ-বিয়োগ কিন্তু জীবনের গভীরতা অনুমিত হয় যোগ-বিয়োগের পরিমাপে। বিশেষ যোগই জীবনের মাহাত্ম্য। এই যে বিশেষ যোগ তা তো মানুষের দেশে মানুষের জন্য মহত্তমের প্রকাশ। চিন্তনের জীবনে প্রাপ্তির সৌন্দর্যই জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় দেখায়। কত সমৃদ্ধ এক জগত যে, এই জীবনের অন্দর মহলে চাপা পড়ে পড়ে আছে তা দেখে চমকে উঠে এই স্থূল খর্বকায় সীমাবদ্ধ জীবন।

এই যে সময়ের রথে যাত্রা সেই যাত্রায় জীবন, সমাজ, দেশ-জাতি বৈশ্বিক অবস্থায়ও যোগ হচ্ছে নানা মাত্রা। গোটা বিশ্ব সেসব বহুমাত্রিক যোগ বৈচিত্রের মুখোমুখি হচ্ছে। সর্বত্রই কোন না কোন পরিবর্তন বিবর্তন চলছে। নানান উদ্ভাবন আবিস্কার যোগ হচ্ছে। আবার পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্বরতা-নির্মমতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা নামে আধিপত্য বিস্তারের খেলায় পরিণত হয়েছে বহু দেশ। তবু মানুষ শান্তির পক্ষে সোচ্চার হচ্ছে দিন দিন।

সমাজ সময়ের একটি প্রতিবিম্ব হয়ে প্রকাশিত হয়ে আছে নানা মাত্রায়। গোটা বিশ্ব যেমন একটি সমাজ তেমনি তার শত সহস্র শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়ে আছে পৃথিবী নামক এই বৃক্ষাঞ্চলে। নানা রূপে, নানা মাত্রায়, নানান বৈশিষ্ট্যে। চোখ মেলে যার দেখার ক্ষমতা আছে সে দেখে, সে জানে কত বিপুল ঐশ্বর্যময় এই জগত সংসার। এই যে মানবজীবন তা তো দেখবার, মেলাবার, মেলবার জন্য। দেখার চোখ তৈরী না হলে দেখা হয়ে উঠে না। জীবন সমৃদ্ধ হয় না, শান্ত-স্থির গতিশীল হয় না। পরমভাবে পাওয়া যায় না জীবনকে।

বাঙালি জীবন প্রবাহে কত মাত্রা তা অনুসন্ধানী মাত্রই জানেন। আর্থ-সামাজিক প্রবাহের ভাঁজে ভাঁজে যেমন বেঁচে থাকা সহায়ক কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে আবার পারস্পারিক দ্বন্ধ বৈরীতাও আছে। সংঘাত সংকটের বিপরীতে শুভযোগ শুভবারতা। দু’য়ে মিলেই আবর্তিত হচ্ছে আমাদের এগিয়ে চলার স্বপ্ন-সম্ভাবনা। সার্বিকভাবেই অভাব দারিদ্র কমেছে। সচেতন হয়ে উঠার নানান সুযোগ-সুবিধা দৌঁড়গোড়ায়। পোশাকে, পুষ্টিতে আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আমরা। বিদ্যুৎ ও  যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে বাংলাদেশ। গভীর আলোচনায় না যেয়েও বলা যাচ্ছে- ‘এগিয়ে যাচ্ছি আমরা শুভ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে।’

বাস্তবতার নিরিখেই রাজনীতিতে নেতৃত্ব সৃষ্টির একটা নব উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে। আড়মোড়া ভেঙে এমন কান্ড হয়তো সহসাই মেনে নিতে পারছেন না খোদ রাজনীতিক নেতা কর্মীরাই। মোটা কাপড়, মোটা চালের কথা শুনতে অভ্যস্ত নয় অনেকে। চরিত্র যে বেশ খানিকটা হননের রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বপ্ন দেখাচ্ছেন দেশরতœ  শেখ হাসিনা। পিতার মতোই দুর্বার এক অভিযাত্রা তিনি শুরু করেছেন অনেকটা ¯্রােতের প্রতিকূলেই। এ এক বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দূরদর্শীতাকেই তুলে ধরে। ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটি বাংলা – বাঙালির ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের পথে আহবান জানাচ্ছেন। জাতিস্বত্ত্বার সাথে যোগস্থাপন ব্যতিরেকে যে কোন জাতি এগুতে পারে না এই শিক্ষা দিচ্ছেন। এটিই আমাদের জন্য বিরাট প্রাপ্তি।

যৌক্তিক সুযোগ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণমূলক জনসমাজ সৃষ্টির মধ্য দিয়েই তো কেবল ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যার বিচার সম্ভব। ধর্ম আর দারিদ্রকে পুঁজি করে মিথ্যাচারের রাজনীতির বিপরীতে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার এই পদক্ষেপ দলীয় কর্মীদের যোগ্য দক্ষ করে গড়ে তোলার অভিপ্রায় থেকে উৎসরিত। 

শুদ্ধি অভিযান অপেক্ষা দলীয় নেতা-কর্মীর আত্মশুদ্ধিই যে এই সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেটা তিনি ভালো করেই জানেন। একজন মহান দেশনেতা হিসেবে তার যে এই উপলব্ধি এটি বাঙালিকে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তবু বলবো- কারো কথায় বলায় কারো আত্মশুদ্ধি হয়ে যাবে না। দেশতো কেবল বাইরে নয়, প্রতিটি আত্মশুদ্ধির এই যাত্রা শুরু হতে পারে আত্ম-উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। দেশ মানে দিশা, দিশা থেকে দিশারী দশা কিংবা দশ কিংবা মৈত্রী একতা।

দলীয় কর্মীরা না হোক, যারা নেতা তাদেরকে সবার আগে নিজের দেশটিকে আবিস্কার করতে হবে। সেখানেই দেখা মিলবে কেন আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন।

মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করার চিরসুন্দর আবেদনের মধ্য দিয়ে আশা জাগানিয়া এক মাহেন্দ্রক্ষণ উপনিত আমাদের সামনে। আগামী বছর ২০২০ সাল বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ। এটিকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যাপক আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। ২০২১ সাল স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পালিত হবে। এই দুটি বিশেষ বছর আমাদের জাতীয় জীবনে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে। তরুণ প্রজন্ম যেমন জানতে পারবে ইতিহাসের সত্য, তেমনি দায় বাড়বে বয়স্কদের। প্রস্ফুটিত ফুল হয়ে উঠার মধুক্ষণ আমাদের সকলের সামনে….