প্রণব বাঙালি প্রমাণ দিয়েছিলেন

সংলাপ ॥ প্রণব মুখার্জী তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সময়টি ১৪১৫ বঙ্গাব্দের ২৭ মাঘ,২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ০৯ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশে এসেছিলেন বর্তমান সরকারের আমন্ত্রণে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সরকারের প্রতিশ্রুতি কোনভাবেই বাংলাদেশকে সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল হতে দেবে না। বাণিজ্য লগ্নির দুটি চুক্তি সই হলো বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে। হলো বোঝাপড়ার অঙ্গীকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে ভারত গড়ে দিচ্ছে একটি কলাভবন। ওইদিন সোমবার বিকেলে তার উদ্বোধন করতে প্রণব মুখার্জি গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫২-র ভাষা শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশে এখন একুশের আবেগভরা ফেব্রুয়ারি মাস। একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালনের পর প্রণব ভাষণ দিতে শুরু করলেন বাংলায়। একেবারে প্রথা ভেঙে। ভারতের বাঙালি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলা ভাষণে বঙ্গীয় ভ্রাতৃত্বের খুশির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-ছাত্রীদের এই সমাবেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকেলের এ-অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন তৎকালীন উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তৎকালীন উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। প্রধান অতিথি ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। নাহিদ বললেন, প্রণব মুখার্জি আমাদের প্রিয়জন। আমাদের আপ্লুত শ্রদ্ধা, ভালবাসা ভারতের এই বরেণ্য বাঙালিকে। ভারতের জনগণ আমাদের স্বাধীনতায় সমর্থন করেছেন, পাশে থেকেছেন, সহায়তা দিয়েছেন। ছাত্রাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সময় ওদের সাহায্য পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের এবং ভারতীয় জনগণের সহায়তা দানের কথা বাংলাদেশ কখনও ভুলবে না। এরপর প্রণবের ভাষণ। প্রণব ভাষণ দিলেন বাংলায়। বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য শুধু খন্ডিত বা অবিভক্ত বংলার নয়। সার্বিকভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয় গোটা উপমহাদেশের মুক্তি ও জাগরণের পীঠস্থান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান উপমহাদেশকে আলো দেখিয়েছে। প্রণব বললেন, ভারতের প্রথিতযশা বিজ্ঞানী, সাহিত্যিকরা ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। ড. মুহম্মদ শহীদউল্লাহ, অধ্যাপক যদুনাথ সরকার, ড.কুদরত-ই- খোদা, আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নাম করে প্রণব বাবু বললেন মনীষী প্রতিম এই অধ্যাপকেরা এই উপমহাদেশের সম্পদ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রবাহ ও বহু ঘটনা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। বহুবার বাংলাদেশে এসেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা হয়নি। আমি কৃতজ্ঞ আপনারা আমাকে আমন্ত্রণ করে এই জ্ঞানতীর্থে আসার সুযোগ করে দিলেন। মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি দিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বললেন, আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের অনেক কিছু করার আছে। তাতেই আমরা ঋণ শোধ করতে পারব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তা পারে, এটা প্রমাণিত। প্রণব বললেন, রামচন্দ্রের সেতু বন্ধনের সময় কাঠবিড়ালির যে ভূমিকা ছিল আমার আজকের ভূমিকা ততটুকুই। উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক ধন্যবাদ জানালেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। বললেন, প্রণব মুখার্জি আমাদের আবেগে ভাসালেন। মুক্তিযুদ্ধে ওরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সহায়তা ভোলার নয়।

উল্লেখ্য, তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের অসুস্থতার পর এই বিশ্রাম সময়ে ভারত সরকারের প্রধানের দায়িত্ব পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির। তাই বাংলাদেশ সরকার প্রণব বাবুর জন্য ব্যবস্থা করেছিল সফরে আসা রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা। সর্বত্রই ছিল র‌্যাব, এসএসএফ, ব্ল্যাকক্যাটদের নিরাপত্তা। কমান্ডোদের উর্দিতে নামের ফলকটিতে বাংলায় লেখা নাম। চমৎকার লাগছিল। মনমোহন সিংয়ের অসুস্থতার কারণে ৩ দিনের সফর কাটছাট করে করা হলো মাত্র ১১ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফর। তবু ভারতের বাঙালি মন্ত্রীকে কয়েক ঘণ্টার জন্য পেয়ে আবেগমথিত হয়েছিল বাংলাদেশ।