প্রকৃত নেতা সত্যের ধারক, বাহক ও সাধক

হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে দ্বাদশ পর্বের আলোচনা

সংলাপ ॥ মহান সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের অংশ হিসেবে ‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে আলোচনার দ্বাদশ পর্ব গত ২৮ পৌষ ১৪২৬, ১৮ জানুয়ারি ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’ এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদের সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশ নেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু, সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ পরিচালনা পর্ষদ সদস্য হারুন অর রশীদ এবং হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা)’এর পরিচালক মো. রবিউল আলম। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন শাহ আবেদা বানু তরু। 

শাহ আবেদা বানু তরু বলেন, কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর সংকটময় অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য যখন একজন সুযোগ্য নেতার প্রয়োজন হয় তখন সেখানে তাদের ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভাব ঘটে নেতার। যিনি উত্তরণের পথ দেখান, দীনতা দূর করেন তিনি থাকেন এগিয়ে। তাঁর বলিষ্ঠ নির্দেশনা, কর্মপরিকল্পনাই নেতৃত্ব।

প্রকৃত নেতা সত্যের ধারক, বাহক, তিনি সাধক। তিনি একজন দেশপ্রেমিক। স্বদেশ তার কাছে সত্য। এই সত্য বোধ থেকে তার কর্মপরিকল্পনা, লক্ষ্য যা দেশকে কেন্দ্র করে। কর্মে সততা, নিষ্ঠা দেশের প্রতি প্রেম, শ্রদ্ধা অবলোকন করে দেশবাসী তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করতে শেখে, তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়।

মনুষ্য জাতির অনন্ত মুক্তিদাতা একজন সত্যমানুষ। তিনি মুক্তচিন্তার অধিকারী। প্রাণীত্বের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ সুখ-দুঃখ, হতাশা-নিরাশার দোলাচলে দিকহারা পথিকের মত পথ খোঁজে। সত্যমানুষ তার জন্য নিরাপদ অভিভাবক। তাঁর অভয়বাণী মানুষকে উদ্যমী হতে শেখায়।

নেতা নিজে কর্মী হয়ে অপরকে উৎসাহিত করেন। তাঁর মধ্যে রয়েছে তারুণ্যের শক্তি। পিছিয়ে পড়া মানুষকে গতিশীল ও যুগোপযোগী করে তোলেন নানান সৃজনশীল কর্মকা-ের মাধ্যমে। তিনি যা বলেন, যা করেন তা-ই সঠিক। তাঁর যুগোপযোগী, বাস্তবমুখী চিন্তা ও কর্মে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মানুষ দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধে সচেতনতা অর্জন করতে পারে। নেতা একজন গবেষক। তাঁর চলার পথ থেকে গবেষণালব্ধ ফল তাঁর ‘অজ¯্র অমিয়বাণী’ যা অনুসন্ধানীদের জন্য আলোকবর্তিকা। 

কোমলতা ও কঠোরতার সংমিশ্রণ তাঁর গুণাবলীর মধ্যে লক্ষ্যণীয়। মিথ্যার বিরুদ্ধে তিনি বজ্রকঠোর আপোষহীন। সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, ধৈর্য, বিচক্ষণতাসহ বিভিন্ন গুণাবলী দিয়ে সকলকে পাশাপাশি নিয়ে চলেন। সেই দৃষ্টান্তসমূহের সৌন্দর্যকে যারা ধারণ করতে পারেন, তারাই উর্ধ্বগামী হন। ‘এক’ এর মহিমা সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত। এই ‘এক’ মহাশক্তির আধার। সেই ‘এক’কে সত্যরূপে গ্রহণ করার পথ পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত করে সকলকে শক্তিমান হওয়ার আহবান জানান তিনি। ‘এক’ এর ভাবসম্পন্ন ত্যাগী ব্যক্তিত্ব ভাবজগতে থাকেন, কিন্তু ভাবাবেগে জড়িত হন না। তিনি দূরদর্শী বলে সামনের তিন হাজার বছরকেও দেখতে পান।

সময়ের মূল্য তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, প্রকৃতিতে তার নিজস্ব বলয়ে পরিবর্তন ঘটছে। সেই নিয়মের ধারায় নিজের পরিবর্তন আনতে সময়কে গুরুত্ব দিতে হয়। মানুষের অসীম শক্তির যথাযথ ব্যবহারবিধি দ্বারা আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়া অনুপ্রেরণা দান করেন। তিনি অসীম গুণাবলীর আঁধার। তিনি বিশ্বজয় করার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। 

হারুন অর রশীদ বলেন, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত মিরপুর আস্তানা শরীফ-এ বাহাখাশ আয়োজিত চিন্তন বৈঠকে এই প্রথম বক্তব্য দেওয়ার যে পরম সুযোগ পেয়েছি তার জন্য সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

নেতৃত্ব বিষয়ে কথা বলতে হবে জানতে পারার তাৎক্ষণিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ কীভাবে করবো? তারপরও কিছু কিছু চিন্তা বেশ আনন্দ দেয়, এবং যেগুলো আনন্দ দেয় সেগুলোই বোধ হয় নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য। আমার চিন্তায় ‘নেতৃত্ব’ একটি সামাজিক গুণবাচক শব্দ-যার প্রকৃত অর্থ ¯েœহ, ভালবাসা, ভক্তি, বিশ্বাস ও আস্থা। আবার একইভাবে পরক্ষণেই চিন্তা হয়েছে নেতৃত্ব একটি আধ্যাত্বিক গুণবাচক শব্দ যার অর্থ একইভাবে-¯েœহ, ভালবাসা, ভক্তি, বিশ্বাস ও আস্থা। তবে নেতৃত্ব’ র প্রকৃত অর্থ হল ‘অনুসারী’ অর্থাৎ একজন সঠিক অনুসারীই হতে পারে একজন সত্যিকার নেতা বা নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন মানুষ। অর্থাৎ আগে অনুসারী তারপর নেতৃত্ব।

নেতৃত্বগুণে স্নেহ কি, ভালবাসা কি, ভক্তি কি, বিশ্বাস কি, আস্থা কি?-সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ আমাকে স্নেহ দিলেন-কেমন আছেন, ভালবাসা দিলেন-বসেন বসেন, ভক্তি দিলেন-একসাথে চা খাব, বিশ্বাস করলেন-সময় আছে, পত্রিকায় একটু কাজ করে দেওয়া যায় না, আস্থা রাখলেন-নেন এইটা পড়েন-কেমন হয়েছে; আমার কি ছিল! অস্থিরতা, অহংকার, ক্রোধ, ক্ষোভ, লোভ, লালসা, হিংসা, ঘৃণা, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা আরও অনেক কিছু- যেগুলোকে আমরা খারাপ বলি, বা ঋনাত্মক গুণসম্পন্ন। আমি চুপ করে বসে আছি-সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ তাঁর আধ্যাত্বিক ক্ষমতাবলে আমার অস্থির চিন্তাকে শান্ত বা স্থির করার জন্য উপদেশ দিলেন, পথ বাথলে দিলেন-আমি খুঁজে পেতে থাকলাম সরল পথ-এভাবেই তৈরী হতে থাকল একের পর এক সরল পথের সন্ধান – তৈরী হতে থাকল স্নেহের মধ্যে স্নেহ, ভালবাসার মধ্যে ভালবাসা, ভক্তির মধ্যে ভক্তি, বিশ্বাসের মধ্যে বিশ্বাস এবং আস্থার মধ্যে আস্থার উপলব্দি। যা শুধু একান্ত নিজের চিন্তায় আনন্দিত হতে থাকল। এভাবেই আস্তে আস্তে আমি তাঁর একজন অনুসরণকারী হওয়ার পথে হাঁটতে লাগলাম, আনন্দ পেতে থাকলাম। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফকে দেখার আগ্রহ বেড়ে গেল আমার, আমি কক্ষে ঢোকার সাথে সাথে বললেন, ‘আরে আসেন, আসেন, আমি তো আপনার জন্য অপেক্ষা করছি’-এঁর নেতৃত্ব আমাকে এভাবে দিনের পর দিন বিমোহিত করতে থাকল। অর্থাৎ ওনার নেতৃত্বগুণ – কি ছিল সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর মধ্যে – কি দিলেন আমাকে। আমাকে দিলেন পরমস্নেহ, পরম ভালবাসা, পরম ভক্তি, পরম বিশ্বাস ও আস্থার শিক্ষা। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ হলেন আমার নেতা। কত ঘৃণা তুমি আমাকে করবে, কত অস্থির তুমি হবে, কত অপমান তুমি আমাকে করবে, কত হিংসা তুমি আমাকে করবে-কোন লাভ হবে না-কারণ আমি তো বসে আছি স্নেহের ঝুড়ি নিয়ে, ভালবাসার ঝুড়ি নিয়ে, ভক্তির ঝুড়ি নিয়ে, বিশ্বাসের ঝুড়ি নিয়ে, আস্থার ঝুড়ি নিয়ে – তাই যতই তুমি আমাকে ঘৃণা দিবে আমি তোমাকে দেব ভালবাসা, যতই হিংসা করবে, অবিশ্বাস করবে – কোন লাভ হবে না – কারণ, আমি তো ঐ না-গুণবাচক শব্দগুলো চিন্তা ও চেতনার জগৎ থেকে বিদায় করে দিয়েছি। তাই  আমাকে যত অপমানই করো না কেন আমার এই পাঁচটি পরম গুণ ছাড়া কিছুই নেই। অর্থাৎ তোমার হিংসা, ঘৃণা, লোভ, লালসা, পরনিন্দা, মোহ সবকিছুকে পরমভাবে স্নেহ করি, ভালবাসি, ভক্তি করি, বিশ্বাস করি ও আস্থা রাখি। আমার কাছে মনে হয় এটাই সত্যিকার নেতৃত্ব। আর এভাবে তৈরী হয় অনুসারী-এক থেকে একাধিক।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বাহ্যিকতা আর আধ্যাত্বিকতা দিয়ে সর্বোতভাবে ব্যস্ত আমার এবং তাঁর সকল অনুসারীদের মঙ্গল কামনায়। কোনোভাবেই ওনার একজন অনুসারী কষ্ট পাক, দুঃখ পাক- এ চিন্তা  যেন ওনার চিন্তা জগৎ থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে অন্য কোন চিন্তাহীন জড় পদার্থে। মিরপুর আস্তানা শরীফ, বাহাখাশ, হামিবা তে যারা আছি আমি এবং আমরা সবাই অনুসারী, পরিপূর্ণ অনুসারী না হলেও কিছু অনুসরণ আমার মধ্যে বিরাজমান আছে। আর সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ হলেন এই অনুসারীদের নেতা, আর আমি এবং আমাদের মধ্যে রয়েছে তারই নেতৃত্ব গুণের অনেক বৈশিষ্ট যেটা ধারন করে আমার মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে পারি নেতৃত্বগুণ, যাকে আমি বলতে পারি একটা খন্ড নেতৃত্ব, আর সেই খন্ড নেতৃত্বগুণ দ্বারা তৈরি করতে পারি অনুসারী এবং সেখানে প্রতিষ্ঠা হবে আমার পরিপূর্ণ নেতৃত্ব। উল্লেখ্য, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফের অনুসারীদের নেতা বা নেতৃত্বগুণ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ নিজেই, ওনার অনুসারীদের মধ্যে থেকে কোনদিন ওনার অনুসারীদের নেতৃত্ব হতে পারে না, অনুসারীরা সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এর মত অনুসারী তৈরী করে নেতৃত্ব দেবেন-এবং সেই নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা চলে আসছে সেই সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দীন-এঁর নেতৃত্ব থেকে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক -এঁর নেতৃত্ব থেকে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর নেতৃত্ব-আর এরপর আমি বা আমরা নেতা হয়ে অনুসারী তৈরীর মাধ্যমে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তবেই প্রতিষ্ঠা হবে, আমার মাধ্যমে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর নেতৃত্ব।

মিরপুর আস্তানা শরীফ, বাহাখাশ, হামিবা- যত মানুষের সাথে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-কথা বলেছেন, এক সাথে বসে চা খেয়েছেন-বুঝতে হবে সকলের সাথে উনি এক একটা আলাদা এক সম্পর্ক তৈরী করেছেন, সেই সম্পর্কগুলিই হলো সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর একটা পরিপূর্ণ নেতৃত্বের রূপ, আর এই রূপের বহি:প্রকাশ দরকার, যা শুধুমাত্র সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর অনুসারীদের নিজেদের পারস্পারিক সুসম্পর্কের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কারণ, আমি বিশ্বাস করি সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এর সমস্ত অনুসারীরা  হলেন এক একজন আলাদা শেখ আবদুল হানিফ, কারণ প্রত্যেকের কাছে উনার আলাদা আলাদা রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ, উক্তি বিরাজমান আছে।

মিরপুর আস্তানা শরীফ, বাহাখাশ, হামিবা এখানে যত মানুষ আসবে, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর অনুসারীদের সাথে কথা বলবে প্রত্যেকে বিমোহিত হবে, আমার আপনার পরম ভালবাসায়, পরম আতিথেয়তায়, কথাবার্তা, চালচলন, আচার আচারন সমস্ত জায়গায় প্রকাশ পাবে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এর বিশালতা। ইসলামের কথা, মোল্লা মৌলভীদের কথা বলি, মোহাম্মাদের (যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত) ইসলাম নাকি নাই? কীভাবে এমন হল আজ-মোহাম্মদের অনুসারীদের নেতৃত্বের বিভাজন? সত্যমানুষ, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর সত্য ধারণাও একদিন ইসলামের মত ঠিক থাকবে না সত্য মানুষের অনুসারীদের নেতৃত্বের বিভাজনের কারণে।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-আমি তোমার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাই আমার মধ্যে, স্নেহ পেতে চাই-দিতে চাই তোমার অনুসারীদের কাছ থেকে, ভালবাসা পেতে চাই-দিতে চাই, ভক্তি করতে চাই- পেতে চাই, বিশ্বাস রাখতে চাই-দিতে চাই, আস্থা অর্জিত হোক সকল অনুসারীর মধ্যে। তৈরী হোক আপন নেতৃত্ব, আপন ঘরে, কেউ পর নই, সবাই আমি এবং আমরা। হাক্কানী মানে-সত্যমানুষ, সত্য মানুষের নেতৃত্ব মানে স্নেহ, ভালবাসা, ভক্তি, বিশ্বাস ও আস্থা।

জয় হোক সকল অনুসারীদের, জয় হোক হাক্কানী নেতৃত্বের, জয় হোক সত্যমানুষের, জয় সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ।