পুলিশ : স্বচ্ছতা-অসচ্ছতার দোলাচলে

police

সংলাপ ॥ বাংলাদেশে পুলিশ যেন একটি প্রজাতি বিশেষ। দেশে-কালে কোথাও পুলিশকে রাষ্ট্রশাসনের হাতিয়ার, কোথাও ভয়ঙ্কর ও একাধারে হাসির পাত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। সত্যিই পুলিশে চাকরির মতো বিড়ম্বনা বোধ হয় আর কোথাও নেই! তা সত্ত্বেও এক বিশেষ অর্থকরী মোহে পুলিশে চাকরির কোনও বিকল্প নেই। সমাজে ছেলেবেলা থেকেই অনেক সময় পুলিশ সম্পর্কে এক ভয়ভীতি চলে আসছে। পুলিশ এখনও পর্যন্ত আমজনতার কাছে ‘বন্ধু’ চরিত্রে পৌঁছতে পারেনি। বাঘে ছোঁয়ার চেয়েও পুলিশে ছোঁয়ার গুরুভার বাংলা প্রবাদেও আছে। সব মিলিয়ে পুলিশ আমাদের স্বাভাবিক জনজীবন-বিচ্ছিন্ন ও সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কাছ থেকে অনেক দূরের হয়েই রয়েছে। আর পুলিশি চরিত্রের সেই তকমাকেই ফের একবার ঘষেমেজে চকচকে রূপ দিলেন তাদেরই এক কর্মকর্তা। একথা অবশ্য স্বীকার্য যে, একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কখনওই সামগ্রিক রূপ দিলে চলবে না। তা সত্ত্বেও বলা যায়, ওই ভদ্রলোক অভিন্ন পোষাক গায়ে গোটা পুলিশ বিভাগের প্রতিনিধি, তাও নিশ্চয়ই অস্বীকার করা যায় না।

জানা যায়, বহু গুরুত্বপূর্ণ থানার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আরও নানান অভিযোগ নাকি জমা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু, সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নটাই এখন বড় হয়ে উঠছে। কারণ, একজনের আচরণে গোটা ব্যবস্থারই মুখে চুনকালি পড়ছে। সামগ্রিক এই সমস্ত বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, নাগরিকরা অভিযোগ বা প্রতিবাদ জানান। কিন্তু এ নিয়ে ক’য়েকজন মন্ত্রীর অযাচিত মন্তব্য শুনে আসা লোকজন হাসাহাসি করেন তাদের যোগ্যতা নিয়ে।

যে কোন বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে পুলিশের অগ্রণী ভূমিকা থাকার প্রচেষ্টা যখন চলছে, তখন তা একমাত্র এ রকম একজন কর্মকর্তার ‘বদান্যতায়’ কালিমালিপ্ত হয়ে থাকছে। পুলিশের বিরুদ্ধে নানান সময় নানান অভিযোগ ওঠে, একথা সত্যি। কিন্তু, এটাও ঠিক যে পুলিশই আমাদের অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জিয়নকাঠি। কয়েকজন অসৎ, উচ্ছৃঙ্খল, দুর্বিনীত, পথভ্রষ্ট, অর্থ লালায়িত ও দলদাসের জন্য গোটা বিভাগটার উপর মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছেন। সুতরাং, তাদেরই নৈতিক দায়িত্ব সাধারণ মানুষের চিন্তা থেকে সেই ভয়ভীতি, ঘৃণা, অশ্রদ্ধা দূর করে সমাজের কল্যাণে নিজেদের আচরণকে আরও সংযত করা। পোষাক দেখলে যাতে সাধারণ মানুষের চিন্তা  না হয়, শত্রু আসছে। মাথার টুপিটাকে মর্যাদার সঙ্গে মাথায় রাখাই দক্ষ পুলিশের কাজ। কারণ, ওই টুপিতেই দেশের সুরক্ষার, সুশাসনের কবজ আঁকা আছে।

সামাজিক পরিস্থিতি যে আজ রীতিমতো অশান্ত হয়ে উঠছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মারদাঙ্গা বোমাবাজি ভাঙচুর খুনোখুনি, এমনকী পুলিশের গুলি কিছুই বাকি থাকছে না! রাজনৈতিক সংঘর্ষ উত্তর থেকে দক্ষিণ, পুব থেকে পশ্চিম, বাংলার নানা জায়গায় উত্তাপ ছড়িয়েছে, রক্ত ঝরেছে এবং ঝরেই চলেছে। এর মধ্যেই এইসব অশান্তিতে বেশ কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। নিহতরা সকলেই যে রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থক এমন নয়, সাধারণ লোকও ঘটনাচক্রে হাঙ্গামার বলি হচ্ছেন। বিশেষ করে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে অশান্তির যে আগুন জ্বলেছিল তার তাপ এখনও পুরোপুরি ঠান্ডা হয়নি। বিরোধীদলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব এলাকায় গিয়ে সরজমিনে সবকিছু দেখে বুঝে এসেছেন, সেইমতো দলীয় নির্দেশও দিয়েছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছেন এমন নজির দেখা যায় না। বরং এক একটা ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক দ্বেষ-বিদ্বেষে অশান্তির আগুনের হলকা ছুটাচ্ছেন মাঝে মধ্যেই। তার তাপ পৌঁছে যাচ্ছে দেশের সংসদে ! তাতে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতিকদের যে খুব মুখ উজ্জ্বল হচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য।

সে যাই হোক, ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক লড়াই থেমে থাকতে পারে না। নানান অপ্রীতিকর ঘটনাকে সাক্ষীশিখন্ডী করে চলছে ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসনকে বেকায়দায় ফেলে রাজনৈতিক জনসমর্থন বাড়ানোর রাজনৈতিক প্রয়াস। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে একটা রাজনৈতিক সংঘাত সংঘর্ষের আবহ তৈরী করার প্রয়াস ক্রমশ সাধারণ জনজীবনে চিন্তার ছায়া ফেলতে শুরু করেছে।

আর এখানেই পুলিশের একাংশের ভূমিকা ও সক্রিয়তার ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে! কার্যকালে তাদের একাংশের ভূমিকা সন্তুষ্ট করতে পারেনি যুযুধান রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রী থেকে সাধারণ মানুষ কাউকেই! অভিযোগ এমনই পাওয়া যায়। কিন্তু কেন? পুলিশের বড় কর্মকর্তারা এলাকা সফর করে আসার পরও নাকি পরিস্থিতিতে খুব একটা রকমফের হয় না! এটা আশ্চর্যের নয়! বিশেষ করে খোদ প্রধানমন্ত্রী যখন বলছেন, যে কোনও মূল্যে সন্ত্রাস থামান, কে কোন দলের কী গোত্রের তা না দেখে গুন্ডা বদমাস এবং এলাকার বহিরাগতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করুন তখনও পুলিশের একাংশের এই আচরণ কি সন্দেহ জাগায় না?

বেনিয়মগুলোই আজ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সকলেই ধরে নেন, পুলিশ আইন অমান্য করবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ তারা নিয়মের ঊর্ধ্বে। নিজেদের ক্ষেত্রে পুলিশ নিয়ম মানে না বলেই অন্যান্য ‘প্রভাবশালী’ বা তাদের ঘনিষ্ঠদেরও ছাড় দেয়, না কি প্রভাবশালীদের ছাড় দেওয়াই দস্তুর বলে নিজেদেরও আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে, সেই কূট তর্কে প্রবেশ না করেও বলা বিধেয়, শহরের রাজপথে যা চলে, তাকে চলতে দেওয়া যায় না।

পুলিশকর্মীদের অভ্যাস বদলাবে, পুলিশের ভাবমূর্তি ফিরবে, এ সব কথা আশার জন্ম দেয়। সমাজে যাদের আদর্শ হয়ে উদাহরণ স্থাপন করা উচিত, তারা দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করছেন দেখলে ভরসা জাগে। স্বচ্ছতা সদিচ্ছার প্রমাণ পুলিশকেই পেশ করতে হবে। অপরাধী চিনিয়ে দেওয়া কিংবা সচেতনতা অভিযানেও সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। ট্র্যাফিক আইনভঙ্গকারী পুলিশকর্মীর সংবাদও সেই মাধ্যমে চোখে পড়লে হয়তো মানুষ বিশ্বাস করবে যে সত্যই পুলিশ বদলাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, পুলিশকর্মীদের মানসিকতার বদল না ঘটলে কি এই পরিবর্তন আদৌ সম্ভব? শাস্তির ভয়ে নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্মানহানির ভয়েও নয় পুলিশকর্মীরা যতক্ষণ না নিজেরা বিশ্বাস করছেন যে আইন মেনে পরবর্তী নিজ প্রজন্মের জন্য আদর্শ স্থাপন করা তাদের কর্তব্য, ততক্ষণ অবধি কোনও নির্দেশ বা উপদেশই কি ওই সমাজের ছবিটি বদলাতে পারবে? ধরা পড়বার ভয়ে নয়, বরং তাদের দেখে সাধারণ মানুষ নিয়ম মানতে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন, এ বোধ হতে পুলিশকর্মীদের নিয়ম মানতে হবে। এ বোধটি তৈরি করবার দায়িত্ব উপরস্থ কর্মকর্তাদের। এত দিনে তারা নিশ্চয় বুঝেছেন, পুলিশ ততক্ষণই কার্যকর, যতক্ষণ অবধি সাধারণ মানুষের অন্তরে তাদের প্রতি সমীহ থাকে। এবং, সেই সমীহ অর্জনের প্রকৃষ্টতম পন্থা আইনের প্রতি দৃশ্যত দায়বদ্ধ থাকা।

শুধু কি তাই? পুলিশের কারও কারও উগ্র ভূমিকায় বিশিষ্টজনেরা বিশেষ উদ্বিগ্ন এবং সাধারণ মানুষজনের মধ্যে যে যথেষ্ট উদ্বেগ ছড়াচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণ মানুষ তো এমন পরিস্থিতিতে অভ্যস্থ নন। তাদের তাই এখন একটাই প্রশ্ন, হিংসা হানাহানি ঠেকাতে পুলিশ লাঠি চালাক, গ্যাস ছুঁড়ুক, জলকামান ব্যবহার করুক কিন্তু গুলি কেন? অনেকেই এও বলছেন, পুলিশের গুলিচালনা একটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ব্যাপার। জনমনে তার একটা আলাদা এবং গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অপরদিকে বিরোধীরা শাসকবিরোধী আন্দোলনে বাড়তি রসদ পেয়ে যাচ্ছে! সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে উদ্বেগ উত্তেজনা বাড়ছে। এহেন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এমন সংশয় জড়িত প্রশ্নও উঠছে যে, অশান্তি ঠেকাতে পুলিশের একাংশের অপ্রত্যাশিত ভূমিকা অশান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে না তো?

প্রশ্নটি নিতান্ত অমূলক বলা যাবে কি? যাবে না। তার কারণ, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট পুলিশের একাংশ তাদের দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন তো করেইনি, উল্টে এমন সব আচরণ করেছে যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল এবং উত্তেজক করে তুলেছে! তথ্যভিজ্ঞরাও বলছেন এমন কথা। সব পুলিশ এমন করছেন না। কিন্তু কয়েকজনের জন্য বদনাম হচ্ছে গোটা পুলিশ বাহিনীর, পুলিশের উপর লোকের বিরূপতা বাড়ছে। তার চেয়েও বড় কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অস্বস্থি বাড়ছে! বিরোধীরা মন্ত্রীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে স্ব-স্ব রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এবং ওই সব পুলিশের জন্য জনমনেও যে কাঁটার খোঁচা বাড়ছে তাতেই বা সন্দেহ কী?

ইতিমধ্যেই পুলিশ প্রশাসনে কিছু রদবদল হয়েছে। তাতে হয়তো পুলিশের কাজকর্মে কিছু উন্নতি হয়েছে বা হবে। কিন্তু, মাদক বিরোধী অনুষ্ঠানে যে পুলিশ উদাসীন দর্শকের ভূমিকা নেয় বা যে পুলিশ হাইওয়েতে লরি-গাড়ি থামিয়ে যানজট বাধিয়ে চাঁদা আদায় করে বা যে পুলিশ অকারণে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করে নির্বিকার চিত্তে শুধু বদলিতে তাদের চিত্তশুদ্ধি হবে, তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে সৎ স্বচ্ছ স্বাভাবিক জনদরদি হয়ে পড়বে এমনটা ভাবা বোধহয় একটু বেশিই হয়ে যায়, তাই না? কিন্তু উপায় কী? হারামে তো আরাম আছে! রদবদল করেই এদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।