পথ চলা বন্ধ হয় না

পৃথিবীর অগণিত মানুষ নাম জপ করে। শ্রীগুরু-প্রদর্শিত পথে জপ-ধ্যান করা অবশ্যই কর্তব্য। অনেকে দীক্ষা গ্রহণ করে প্রত্যহ নির্দিষ্ট সংখ্যক জপ করে ভাবেন-যথেষ্ট। বিভিন্ন শাস্ত্রে নিজকে চৈতন্যময় করবার নানাবিধ সাধন আছে। আমরা চোখ বুজে ধ্যান-জপ করি আর চারিদিকে অন্ধকার দেখি। কখনো নিজের মাঝে হতাশ ভাবও আসে। তাই শ্রীগুরুর কাছ থেকে চৈতন্যশীল হওয়ার প্রক্রিয়া জেনে নিয়ে সাধন করলে জপ-ধ্যানের আস্বাদ পাওয়া যায়। শব্দের বারবার উচ্চারণে ও জপে একপ্রকার উপলব্ধি হয়। জপ করতে করতে জাপকের সামনে তার লক্ষ্যের আবির্ভাব হয়।

জপ হচ্ছে বর্ণের সমষ্টি। বর্ণের সমষ্টি হচ্ছে পদ। যে-পদের শক্তি থাকে, তাই সার্থক, নইলে শক্তিহীন পদ নিরর্থক। এই শক্তিজ্ঞান শ্রীগুরুর নিকট হতে লাভ হয়। এই শক্তিজ্ঞান লাভ হলে, তখন উচ্চারণ করলে সেই জ্ঞানের স্মরণ হয়। প্রতিপাদ্য বস্তুর জাগরণও ঘটে। এরই নাম চৈতন্য সাধন। প্রতিপাদ্য বস্তু গুরুর কাছ থেকে শুনতে হয়। কিন্তু একবার শুনলেই যে বোঝা যায়, তা নয়, কারণ সাধারণতঃ আমাদের বুদ্ধি মলিন। সেইজন্য পুনঃপুনঃ স্মরণ অভ্যাস করতে হয়।

শ্রীগুরুরা সচরাচর উপদেশ দ্বারা শিষ্য ও ভক্তগণের ভেতরে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বীজ বপন করেন। বিভিন্ন ধর্মীয় দর্শন মতে সমুদয় জগৎ নাম-রূপাত্মক। ব্যক্তি মানুষের চিত্তমধ্যে এমন একটি তরঙ্গ থাকতে পারে না, যা নাম-রূপাত্মক নয়। প্রকৃতি সর্বত্র এক নিয়মে নির্মিত হয় বলেই এই নাম-রূপাত্মকতা সমুদয় জগতের নিয়ম। এ দেহ-ভান্ডকে জানতে পারলে বিশ্বব্রহ্মান্ডকে জানতে পারা যায়। রূপ বস্তুর বাহ্যিক স্বরূপ আর নাম বা ভাব তার অন্তর্নিহিত শস্যস্বরূপ। দেহ-রূপ আর অন্তঃকরণ-নাম, আর বাক্শক্তিযুক্ত প্রাণিসমূহে এই নামের সাথে তাদের ব্যষ্টি চিত্তে চিন্তা-তরঙ্গগুলো উত্থিত হয়ে প্রথমে শব্দ, পরে তদপেক্ষা স্থূলতর আকার ধারণ করে।

প্রথমে নাম, পরে রূপাকারে জগৎ রূপে অভিব্যক্ত। ব্যক্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎই রূপ। এর পশ্চাতে অনস্থ অব্যক্ত শব্দ রয়েছে। সমুদয় জগতের অভিব্যক্তির কারণ শব্দজগৎ। সমুদয় নাম অর্থাৎ ভাবের নিত্য-সমবায়ী উপাদান-স্বরূপ নিত্য শব্দজগৎই সেই শক্তি, যা এই জগৎ সৃজন করে। কোনরূপ বিশ্লেষণ বলেই যখন ব্যক্তি ভাব হতে শব্দকে পৃথক করতে পারেন না, তখন নিত্য-শব্দজগতের মধ্যে নিত্যসম্বন্ধ বর্তমান। সমুদয় নামরূপের জনকস্বরূপ পবিত্রতম শব্দ হতে জগৎ সৃষ্ট হয়েছে। শব্দ ও ভাব নিত্যসম্বন্ধ একটি ভাবের বাচক অনন্ত শব্দ থাকতে পারে, সুতরাং সমুদয় জগতের অভিব্যক্তির কারণ স্বরূপ ভাবের বাচক যে একটিমাত্র শব্দই তার কোন অর্থ নেই। শব্দজগৎ সমুদয় ভাবের উপাদান অথচ কোন পূর্ণ বিকশিত ভাব নয়; অর্থাৎ বিভিন্ন ভাবগুলোর মধ্যে পরস্পর যে প্রভেদ তা যখন দূর করে দেয়া হয়, তখন এই শব্দই অবশিষ্ট থাকবে। আর যখন, যে কোন বাচক শব্দ দ্বারা অব্যক্ত শব্দজগৎকে প্রকাশ করতে হলে তাকে এতদূর আবিষ্ট করে ফেলে যে তাতে আর শব্দজগৎ থাকে না, তখন যে শব্দ দ্বারা উহা খুব অল্প পরিমাণে বিশেষভাবাপন্ন হয় আর যারা যথাসম্ভব উহার স্বরূপ প্রকাশ করে, তাই তার সর্বাপেক্ষা প্রকৃত বাচক ‘অ’ সমুদয় শব্দের ভিতর সর্ব্বাপেক্ষা অল্প বিশেষ ভাবাপন্ন। এই ‘আমি অক্ষরের মধ্যে আকার।’ আর সমুদয় স্পষ্টোচ্চারিত শব্দই মুখগহব্বরের মধ্যে জিহ্বামূল হতে আরম্ভ করে স্পর্শ করে উচ্চারিত হয়। ‘অ’ কণ্ঠ হতে উচ্চারিত, ‘ম’ শেষ ওষ্ঠ শব্দ।

আধ্যাত্মিক জীবন আরম্ভ করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিচার-নিজের বিচার। যতই বিচারশক্তি বাড়বে ততই ক্ষণস্থায়ী জাগতিক বস্তু থেকে তৃষ্ণা দূর হবে এবং অনন্ত চিরস্থায়ী দৈবসম্পদের প্রতি আকর্ষণ বাড়বে।

নিজের কার্যাবলী বিচার করে মানুষ যে সব বস্তুকে সবচেয়ে ভাল বলে চিন্তা করে তা হচ্ছে-অর্থ, যশ ও সুখানুভুতি। এর মধ্যে শেষটির পরিণাম ঘটে তৃপ্তিতে ও অনুতাপে; অপর দুটি কখনও তৃপ্ত হয় না। ব্যক্তি যত পায় ততই তার তৃষ্ণা বেড়ে যায়। যশোলিপ্সা অপরের মতামত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে ব্যক্তিকে বাধ্য করে। কোন বস্তুর প্রতি আকর্ষণ না থাকলে তা নিয়ে কোন ঝগড়া হবে না, তা ধ্বংস হলে দুঃখ হবে না, কারো থাকলে ঈর্ষাও হবে না-এককথায় অন্তরে কোন চাঞ্চল্য উঠবে না। বস্তুর প্রতি আসক্তিবশতঃ নিজের দোষগুলো জাত হয়। চিরস্থায়ী বস্তুর প্রতি আকর্ষণ চিত্তে আনন্দ আনে আর এ আনন্দ দুঃখহীন। সুতরাং সর্বশক্তি দিয়ে ব্যক্তির এই আনন্দকে কামনা করতে হয় এবং খুঁজতে হয়।

মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, জীবনের চির-চঞ্চলতার মধ্যে শাশ্বত সুখ লাভ করা। এই শাশ্বত সুখ হচ্ছে লক্ষ্যভিত্তিক-আনন্দ। চেতনায় মগ্ন হওয়া হচ্ছে অন্তর রাজ্যে প্রবেশ।

জীবনের উদ্দেশ্য লক্ষ্য-লাভ এবং জাগতিক ভোগসুখ ক্ষণস্থায়ী-এ ধারণা অনেকের আছে। হৃদয় কিন্তু এতে সাড়া দেয় না কারণ ভোগ্যবিষয়ে সুখ খোঁজা ব্যক্তির অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। লক্ষ্যভিত্তিক-আনন্দ খুঁজবার জন্য ব্যক্তির নুতন অভ্যাস সৃষ্টি করতে হয়। লক্ষ্যকে পরিপূর্ণ জানবার জন্য ব্যক্তিকে ঘন ঘন একটানা চিন্তা করতে হয়; আর যখন তার প্রতি ভালবাসা আসবে তখন চিত্ত ক্রমাগত তার কথাই ভাববে। হৃদয় আপ্লুত হবে লক্ষ্যভিত্তিক-আনন্দ ও সম্পদ অর্জনে।

লক্ষ্যভিত্তিক-চিন্তায় নিজকে নিবদ্ধ করতে শিখতে হয়। জীবনে দুর্বলতা ফুটে উঠুক, বিস্মৃতি আসুক-কিছুই এসে যায় না; শেষে লক্ষ্যে পৌঁছাতে অধ্যাত্ম সংগ্রামে নিয়োজিত থাকতে হয়। শিশু যখন হাঁটতে শেখে, সে ক্রমাগত পড়তে থাকে। সে যে কোনদিন হাঁটতে পারবে-সেটা অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। কিন্তু সে নিজেকে বার বার ঠেলে তোলে, কারণ তার ভেতরে রয়েছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তীব্র ইচ্ছা। আর শেষে সে না টলে সোজা হেঁটে চলে। ঠিক তেমনি অধ্যাত্ম জীবনে দৃঢ় প্রত্যয়ী হলে নিষ্ফলতা আসে না। লক্ষ্যই জীবনের যথাসর্বস্ব-এ দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে কখনই পথচলা বন্ধ হয় না। চোখ শরীরের আলোকবর্তিকা। দৃষ্টি একাগ্র ও স্বচ্ছ হলে সারা শরীর দীপ্তিমান হয়ে উঠে।