নিজের কথা – ২৩

শাহ মো. লিয়াকত আলী ॥ তাপ তথা আলোকম-ল বায়ুমন্ডল জলমন্ডল ও ভুমন্ডল নিয়ে গঠিত আমাদের পরিবেশ। এ পরিবেশেরই উপাদান নিয়ে গড়ে ওঠে আমাদের স্থূল দেহকাঠামো। বলা হয় আগুন পানি মাটি বায়ু এসকল উপাদানই হল আমাদের স্থূল দেহের মৌলিক উপাদান। কিন্তু স্বাস্থ্য বিজ্ঞাপনের গবেষণা থেকে জানা যায়, সুস্থ দেহের জন্য যে শক্তির প্রয়োজন  তার মাত্র ৩০ শতাংশ শক্তির যোগান আসে আমাদের পরিবেশের এসকল মৌলিক উপাদান থেকে। যার ১০ ভাগ আসে জলমণ্ডল ও ভূমন্ডল থেকে এবং ২০ ভাগ আসে বায়ুমন্ডল ও তাপমন্ডল থেকে। আর বাকি ৭০ শতাংশ শক্তির যোগান আসে ব্যক্তির চেতনা জগতের চিন্তনশক্তি থেকে। তাই স্বাস্থ্য সংরক্ষণের জন্য কেবল পরিবেশের বিশুদ্ধ খাবার তাপ পানি বায়ুই যথেস্ট নয় বরং এর সাথে বিশুদ্ধ চিন্তন শক্তির পরিমিত যোগান নিয়মিত রাখা অত্যাবশ্যক ।

আমাদের স্থূলদেহজগত সুক্ষআত্মার আত্মিকশক্তির সাহায্যে পরিচালিত হয় এবং সুনির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনে অংশগ্রহণ করে থাকে। তাই বাহ্যিক দেহজগতের সুস্থ্যতা অন্তরের আত্মার সুস্থ্যতার উপর নির্ভরশীল। আমাদের স্থূল সুস্থ্য দেহজগতের জন্য আগুন (তাপ) পানি বায়ু মাটি ইত্যাদির বিশুদ্ধ খোরাক যেমন দরকার, তেমনি দরকার আত্মার সুস্থ্যতার জন্য আত্মিক বিশুদ্ধ খোরাকের। বিশুদ্ধ চিন্তন শক্তি হল আত্মার বিশুদ্ধ খোরাক। বিশুদ্ধ পড়া শোনা ও দেখার মাধ্যমে বিশুদ্ধ চিন্তন শক্তির যোগান দেয়া হয়। সুস্থ্য আত্মা একই সাথে শারিরীক মানসিক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জগতের কর্ম সম্পাদন করতে সক্ষম। তাই স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীগণ আমাদের জীবনের স্বাস্থ্যকে চার ভাগে ভাগ করেছেন। যথা – শারিরীক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য সামাজিক স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য । 

যে ব্যক্তি সাঁতার কাটা জানে আর যে জানেনা তাদের উভয় এর দেহ কাঠামো এক নয়। আর স্বাস্থ্যের অবস্থাও ভিন্ন। আবার যিনি সাঁতার শিক্ষা দেন আর যে শিক্ষা গ্রহণ করে তাদেরও দেহ কাঠামো এক নয় এবং স্বাস্থ্যেরও ভিন্নতা থাকে। তেমনিভাবে যে ব্যক্তি কেবল অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে সাঁতার শিক্ষা দেন আর যিনি অর্থসহ সমাজের মঙ্গল ও কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সাঁতার শিক্ষা দেন তাঁদের উভয়ের দেহ কাঠামোও এক হতে পারেনা। স্বাস্থ্যের মধ্যেও ভিন্নতা থাকে। এ বিভিন্নতাকে বিচার করে সাঁতার না জানা ব্যক্তির স্বাস্থ্যকে শারিরীক স্বাস্থ্য ধরা হলে সাঁতার শিক্ষানবিশের স্বাস্থ্যকে মানসিক স্বাস্থ্য কেবল অর্থউপার্জনকারী সাঁতার শিক্ষকের স্বাস্থ্যকে সামাজিক স্বাস্থ্য এবং অর্থউপার্জন সহ সমাজের মঙ্গল ও কল্যাণ বিবেচনাকারী সাঁতার শিক্ষকের স্বাস্থ্যকে আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য বলা যাবে।

স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের গবেষণা থেকে আরও জানা যায়, দৈহিক স্বাস্থ্য মানষিক স্বাস্থ্য সামাজিক স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য এ চার ধরনের স্বাস্থ্যের প্রভাব বিদ্যমান থাকে সুস্থ মানব দেহে। তাই সুস্থ মানবদেহের অধিকারী হতে হলে কেবলমাত্র নির্ভেজাল তাপ বায়ু জল স্থূল খাবার সামগ্রীই যথেস্ট নয় বরং পরিমিত নির্ভেজাল চিন্তা সামাজিক ও আধ্যাত্মিক খোরাকের নিয়মিত যোগান থাকা অত্যাবশ্যক হবে। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব?

মানবাত্মা মানব দেহের চালিকা শক্তি। মানবদেহ আত্মার উপস্থিতিতে জীবন্ত থাকে। আর আত্মার অনুপস্থিতিতে মৃত্যু ঘটে। তাই মানবের চেতনা জগতের কার্যকারিতা মানবাত্মার উপর নির্ভর করেই স্বক্রীয় থাকে।

আত্মা যতটা শক্তিশালী হবে মানবদেহ ততটাই সতেজ ও সুস্থ্য থাকবে। অপরদিকে আত্মা যতটা নিস্তেজ ও দুর্বল হবে মানব দেহ সেভাবেই অসুস্থ ও দুর্বল হতে থাকে। প্রশ্ন আসতে পারে আত্মা কিভাবে সতেজ ও দুর্বল হয়? দেহের সুস্থ থাকার জন্য যেমন পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ বিশুদ্ধ ও পরিমিত খাবার দরকার হয়, আত্মারও তেমনি সুস্থ্য থাকার জন্য নিয়মিত বিশুদ্ধ পরিমিত খাবারের দরকার হয়।

সতেজ আত্মার প্রাণশক্তি আছে। তাই আমরা যে নিস্প্রাণ খাবার দেহে গ্রহণ করি সতেজআত্মা সে সকল নিস্প্রাণ খাদ্য সামগ্রীকে প্রাণশক্তি ও দেহকোষে  রূপান্তর করে সুচারুভাবে আমাদের দেহের প্রয়োজনীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠন করে। কিন্তু অসুস্থ নিস্তেজ আত্মা সুচারুভাবে আমাদের দেহের অঙ্গ – প্রত্যঙ্গের গঠনসাধন করতে পারেনা।

সবল আত্মার বিভিন্ন চিন্তন ক্ষমতার স্তর আছে। তাই আমরা চেতনা জগতের অচেতন অবচেতন প্রাকচেতন স্তরের বিষয়াদি মুখস্ত ও আত্মস্থ করে বিভিন্ন অনুমান ও ধারণার সাহায্যে বিভিন্নভাবে পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে চলতে পারি। কিন্তু অসুস্থ দুর্বল আত্মা চেতনাজগতের বিভিন্ন স্তরে বিচরণ করতে ও পরিবেশের সাথে খাপখেয়ে চলতে অক্ষম ।

সুস্থ্য সবল আত্মার ব্যক্তির মাঝে প্রেমশক্তি কার্যকর থাকে তাই তাঁরা স্বদেশপ্রেম প্রকিতি প্রেম পিতৃত্ব ভ্রাতৃত্ব মাতৃত্ব এ সকল গুনাবলীর মাধ্যমে কৃপা ক্ষমা ভাললাগা ভালবাসা সন্মান শ্রদ্ধা স্নেহ ভক্তি এসকল উদার মানবিক গুণাবলীর ব্যবহার করে পরস্পরের সাথে সাচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে। অপরদিকে অসুস্থ দুর্বল আত্মার ব্যক্তি মানবিক গুণাবলীর সুষ্ঠ ব্যবহার করে অন্যদের সাথে সদাচারন করে চলতে পারেনা। তাই তারা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে চলার পথে পারস্পরিক কলহ ও অশান্তির মাঝে জীবনযাপন করে থাকে। সুস্থ্য সবল আত্মার হিতাহিত জ্ঞানশক্তি থাকে। তাই সহজেই জীবনের ভাল- মন্দ ন্যায় -অন্যায় মঙ্গল- অমঙ্গল যাচাই- বাছাই করে বিশুদ্ধ আনন্দলোকের জীবনযাপন করার সুযোগলাভ করে কিন্তু অসুস্থ্য দুর্বল আত্মা অজ্ঞতার করনে এসব যাচাই-বাছাই পুর্বক আনন্দলোকে জীবনযাপন করতে পারেনা। তাই তারা অধিকাংশই কর্মে ভুল করে দুরবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করে ।

সুস্থ্য সবল আত্মার আস্থা ও আত্মবিশ্বাস থাকে। সুস্থ্য সবল আত্মার জ্ঞানশক্তির কারনে কে প্রতারক কে প্রতারসক নয় কোনটি সত্য কোনটি সত্য নয় ইত্যাদির তফাত সহজেই ধরতে পারেন। তাই সুস্থ্য সবল আত্মা বিশ্বাস অতি খাঁটি ও অটল হয়। তাই তাঁরা সন্দেহমুক্ত জীবনযাপন করে থাকে। কিন্তু দুর্বল ও অসুস্থ্য আত্মার বিশ্বাস অজ্ঞতার কারণে নড়বড়ে ও ঠুনকো হয়। তাই তারা সন্দেহ প্রবণ ও নিরানন্দের জীবনযাপন করে থাকে।

সুস্থ্য সবল আত্মা পবিত্র। কারন তাঁরা জ্ঞানার্জন ও বিশ্বস্ততার কারনে তাঁরা সহজেই স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করে থাকেন। (চলবে)