নিজের কথা – ২২

শাহ মো. লিয়াকত আলী ॥ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন, ‘মানুষ নিজের সাথে নিজেই সবচেয়ে বেশী প্রতারণা করে।’ প্রশ্ন আসে প্রতারণা কি? কেন কিভাবে মানুষ নিজের সাথে প্রতারণা করে থাকে?

মানুষ অন্তরে যা চায়না বাহিরে তেমন কিছু প্রদর্শন করে অন্যকে ফাঁকি দিয়ে স্বার্থ হাসিল করে থাকে। মানুষের এমন কর্মকেই প্রতারণামূলক কর্ম বলা হয়। প্রতারণাকারীকে প্রতারক বলা হয়। প্রতারণার অপর নাম মুনাফেকী বা দ্বিচারিতা।

প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মঙ্গল চায়। কিন্তু কর্মের নিয়ম অনুসারে যে যেমন কর্ম করে সে তেমনিই কর্মফল ভোগকরে থাকে। অর্থাৎ যে ভাল কর্ম করে সে ভাল কর্মফল ভোগ করে। আর যে মন্দ কর্ম করে সে মন্দ কর্মফল ভোগ করে থাকে। অন্যের ক্ষতি করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিজেই বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে নিজেই নিজের ক্ষতি সাধন করে থাকে।

প্রতারণা করার উদ্দেশ্য অন্যের ক্ষতি সাধন করে নিজে লাভবান হতে চাওয়া। কিন্ত বাস্তবে বিবেকের অশান্তির ছোবলে পড়ায় সে প্রকৃত লাভবান হতে পারেনা। ব্যক্তির নিয়ত মন্দ হওয়ার কারণে তার কর্মফল মন্দ হয় এবং পরিণতি তার স্বার্থের প্রতিকুলে আসে ও অশান্তি ভোগ করতে হয়। প্রশ্ন আসতে পারে কিভাবে প্রতিকুলে যায়? যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতিসাধন করতে চাই তাকে পরিশুদ্ধ চিন্তাথেকে সরে এসে নোংরামির করার চিন্তার মধ্যে নেমে আসতে হয়। ফলে তার মস্তিস্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতা লোপ পায় এবং নোংরামি চিন্তাশক্তির কারণে বিকৃত মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে ভালোলাগার পরিবেশ বিলুপ্ত হয় এবং মন্দলাগার পরিবেশ কার্যকর হয়। ফলে ব্যক্তির মানষিকতা সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। সাথে সাথে মন্দলাগার প্রভাব দেহের উপর পড়তে থাকে। ফলে দেহের সুস্থ্যতার বিঘ্ন ঘটে এবং অসুস্থ্যতার কারণ হিসেবে নানামুখী অসুখ কার্যকর হতে থাকে। এছাড়াও ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আত্মীয় অনাত্মীয় শত্রুতে পরিণত হয়। পারস্পরিক কলহ বাড়ার ফলে এক সময় পরিবেশ বসবাসের অনুপযুক্ত হয়। পরিশেষে ব্যক্তির বাঁচার জন্য পরিবেশ ত্যাগ করে নিজেকে নতুন পরিবেশে স্থানান্তর করতে হয়। এভাবে অন্যের সাথে মন্দ ব্যবহার তথা প্রতারণা করার পরিনতি নিজের উপরই এসে পড়ে।

স্বার্থের ভুবনে ব্যক্তির লোভ মোহ হিংসা পরশ্রীকাতরতা ঈর্ষা এ সকল দুর্বল চিন্তাশক্তির প্রভাব এতবেশী প্রকট হয় যে ব্যক্তি তার হিতাহিত জ্ঞানশক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে অতি ভোগমাত্রা ব্যক্তির মাঝে বিষয় ভোগ আসক্তির প্রভাব বাড়িয়ে তোলে যা ক্রমেই ব্যক্তির মাঝে মধুমোহ বা ডায়াবেটিক্স ব্যধির সুত্রপাত ঘটায়। এ ব্যধির কারণে ব্যক্তির দেহে নানান জটিলতা সৃষ্টি হয় ও জীবনিশক্তি দুর্বল করতে থাকে। পরবর্তীতে মানুষ অতিমাত্রার ভোগলিপ্সা নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে ক্রমেই জীবনিশক্তির দুর্বলতা বৃদ্ধি পায় ও মরনব্যধিতে রূপ নেয়। স্বার্থের জগতে প্রতারণায় ফাঁদে আটকে পড়ে ব্যক্তির চেতনা জগতের জ্ঞানশক্তির প্রভাব ক্রমেই লোপ পেতে থাকে এবং অজ্ঞতার প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ব্যক্তি ক্রমেই হিতাহিত জ্ঞানশুণ্য হতে থাকে এবং নানাবিধ ভুলভ্রান্তির মাঝে জড়িত হয়। ফলে নানাধরনের অসুখ-বিসুখ রোগ ব্যধিতে আক্রান্ত হতে থাকে। যার প্রভাবে ব্যক্তি ক্রমেই অসুস্থ্য বিত্তশুণ্য যন্ত্রণা ও অশান্তির মাঝে পতিত হতে থাকে। এভাবে ব্যক্তি প্রতারণার সাথে জড়িত হয়ে অজ্ঞতার মাঝে পতিত হয় এবং নিজেই নিজেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। এ প্রসংগে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘অভাব নয় অজ্ঞতাই সকল ভুলের মূল।’

বাণীর ‘নিজের’ শব্দটির অর্থ – ব্যক্তি যে সকল বিষয়ের উপর অধিকার বজায় রাখে বা রাখতে চেয়ে কখনো কখনো সুখ-দু:খ কিংবা আনন্দ-বেদনা পেয়ে থাকে।

বাণীর ‘নিজেই’ শব্দটিতে ব্যক্তির স্বয়ং স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বকারী সত্ত্বা তথা আত্মাকে বুঝায়। যে সত্ত্বা ¯্রষ্টার নিকট থেকে এসে ব্যক্তির দেহজগতের প্রতিপালনের দায়িত্ব পালনে রত থাকে আবার ¯্রষ্টার কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে চায়। এ সত্ত্বা ব্যক্তির অর্জিত জ্ঞানশক্তির ক্ষমতানুসারে ব্যক্তির চেতনা জগতের বিভিন্ন স্তরে (অচেতন, অবচেতন, প্রাকচেতন, স্বচেতন, দ্বৈতচেতন, উর্ধচেতন ও পরমচেতন) কর্মরত থাকতে সক্ষম। শাস্ত্রমতে এ সত্ত্বাকে বলা হয় কখনো ‘নফস বা আত্মা , আবার কখনো ‘রূহ্ বা প্রভুর নির্দেশ’, আবার কখনো আদ্যাশক্তি স্বয়ং স্রষ্টা। যার মাঝে থাকে বিভিন্ন আদ্যশক্তির (প্রাণশক্তি চিন্তাশক্তি প্রেমশক্তি ভাবশক্তি ইচ্ছেশক্তি জ্ঞানশক্তি বিশ্বাসশক্তি আনন্দ – শান্তিশক্তি ইত্যাদি শক্তির) সমাহার। হাক্কানী (সত্যনিষ্ট) চিন্তনপীঠে আত্মাকে বলা হয় চৈতন্যশীলদেহ।

জ্ঞানীগুণীজন চেতনাজগতের সচেতনস্তর হতে জ্ঞানশক্তির আলোকে আলোকিত থেকে জীবন চালার পথে স্রষ্টার সান্নিধ্যলাভ (পরম শান্তি) তথা জীবনের লক্ষ্যাভিমূখে কর্ম করতে সক্ষমতা অর্জন করেন বিধায় প্রতারণা বিহীন সফল জীবনলাভ করতে পারেন। অন্যথায় সাধারন ব্যক্তি অজ্ঞতার অন্ধকারে থেকে জীবনের লক্ষ্য (পরম শান্তির কথা) ভুলে গিয়ে নিজের পরিবার সংসার বিষয়-আশয় এর প্রতি নজরদারী ও সময়ব্যয় করে নিজেই নিজেকে সবচেয়ে বেশী প্রতারিত করতে থাকে চিরজীবন। (চলবে)