নিজের কথা – ২০

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ জীবন চলার পথে আমরা রাতদিন ২৪ ঘন্টা সময় অতিবাহিত করে থাকি প্রতি নিয়ত। সরাসরি ভাবে সূর্যরশ্মির কিরণের সাথে সংযোগে থাকে পৃথিবীর যে অংশটি তাকে দিন আর যে অংশটি সংযোগে থাকেনা সে অংশটিকে রাত বলে ধরা হয়। ভৌগলিকদের মতে পৃথিবী তার নিজ কক্ষপথে একবার প্রদক্ষিণ করতে রাতদিন তথা  ২৪ ঘন্টা সময় দরকার হয়। পৃথিবীর নিজ কক্ষপথে যে গতিতে দিবারাত্র ২৪ ঘন্টা পথ অতিক্রম করে, এ গতিকে পৃথিবীর আহ্নিক গতি বলা হয়। আবার পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে তার চারপাশের পরিধিকে একবার প্রদক্ষিণ করতে এক বছর সময় লাগে। পৃথিবী সূর্যের পরিধিকে যে গতিতে একবার প্রদক্ষিণ করে থাকে, এ গতিকে পৃথিবীর বার্ষিক গতি বলা হয়।

মানুষের জড়দেহও পৃথিবীর অংশবিশেষ। তাই এ জড়দেহকেও পৃথিবীর মতই আহ্নিকগতি ও বার্ষিক গতির সাথে তাল মিলাতে হয়। আর এ তাল মিলাতে গিয়ে পৃথিবীর সাথে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তন অনুসারে অবস্থানভেদে বিভিন্ন ঋতুর পরিবর্তনের কারনে শীত বসন্ত গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্তের প্রভাব  আমরা অনুভব করে থাকি। প্রতিদিন আমরা সকালের পর দুপুর, দুপুরের পর সন্ধ্যা, সন্ধ্যার পর রাত্র, ঘোররাত্র, অতপর ভোররাতের পর আবার সকাল দুপুর সন্ধ্যা দিবা- রাত্রির চক্রের মাঝে আবর্তন করে এক এক সময়ের এক এক ধরনের প্রভাব আমরা অনুভব করে থাকি। একইভাবে আমরা বার্ষিক গতির আবর্তনের ফলে স্থান কাল পাত্র ভেদে শীত গ্রীষ্ম শরত বর্ষা ইত্যাদি বিভিন্ন ঋতুর প্রভাব অনুভব করে থাকি।

বছরের পর আসে যুগ যুগান্তর শতাব্দি কাল মহাকাল। আর কাল মহাকালের প্রভাব পড়তে থাকে আমাদের অনাগত আত্মাময় জীবনের উপর।

শাস্ত্রমতে কালের চক্রাকারকে সত্যসনাতন ত্রেতা দাপর কলি ও ঘোরকলি যুগ এবং ঘোরকলি যুগের পর আবার সত্যসনাতন যুগের আবির্ভাব হয় বলে জানা যায়। সত্যসনাতন যুগের মানুষ মানবতার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে জীবনযাপন করতেন বলে শোনা যায়। এ যুগের জীবনযাপন ছিল সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উদারতার জীবন। এ যুগের মানুষ পরস্পরের উপকারে নিবেদিত থেকে জীবনযাপন করা পছন্দ করতেন। তাই এ যুগের জনগনকে বলা হত দাতা বা দেবতা। ক্রমেই মানুষের জীবনযাপনে সংস্কার ঘটতে থাকায় কর্মফল হিসেবে পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে মানব সমাজে ত্রেতা দাপর ও কলিযুগের আগমন ঘটে। মানুষ ক্রমেই উদারতার স্তর থেকে নেমে আসে সংকীর্ণতাপূর্ণ ঘোর কলিযুগের আবর্জনাময় জীবনযাপনে। শান্তিধর্মের জীবনযাপন থেকে ক্রমেই মানুষ ধর্ম বর্ণ গোত্রে বিভাজন করে পারস্পরিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে ক্রমেই অশান্তিময় দ্বান্দিক জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়ে ।

অনন্ত কালের আত্মিক স্বর্গীয় জীবন নিয়েই মানুষের পৃথিবীতে আগমন। এ স্বর্গীয় আত্মিক জীবনকে ধরে রেখে পৃথিবী থেকে স্বর্গে প্রস্থান করার মাধ্যমেই আছে মানব জনমের পরম স্বার্থকতা। কর্মে সচেতন থেকে লক্ষ্যাভিমূখে পথ চলার শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যুগে যুগে নানান নবী রসুল সাধক ওলী আওলিয়াগণ। তাঁদের পদাংক অনুস্মরনের মাধ্যমে পেতে পারে অনুস্মরণকারী কাংখিত সফল জীবন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারীদের জন্য বলেন,‘সফল কর্মের জন্য তিন হাজার বছর আগের ও তিন হাজার বছর পরের অবস্থান বিবেচনা করে কর্মে সচেতন থেকে কর্ম করবেন।’

মহাকালের সুতিকাগার পরমাত্মা ¯্রষ্টার নিকট থেকেই আমাদের (আত্মার) এ মনোরম মর্তের পৃথিবীতে আগমন আবার পৃথিবী হতে আমাদের আশ্রয়দাতা পরমাত্মা ¯্রষ্টার নিকটেই আমাদের অনিবার্য প্রত্যাগমন। তাই পরমশান্তির স্বর্গীয় জীবনযাপন করার জন্য আমাদের দরকার অলীআল্লাহগণের আদর্শিক জীবনযাপনের পদাংক অনুস্মরণ করা।

একদা কোন এক সময় সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ কে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘নানাভাই তোমার জীবনে কতটা সময় ঘুমিয়ে, কতটা সময় খাওয়া-দাওয়ায়, কতটা সময় চলাফেরা, গোসল, প্রসাব পায়খানা ও বাথরুমে কাটিয়েছ আর কতটা সময় তোমার আল্লার সাথে কাটিয়েছ তোমার মতো করে তার হিসেব কষে আন তো দেখি, ভাই।’  নানাভাই এঁর কথামত সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বেশ কয়েকদিন ধরে জীবনের বিভিন্ন কর্মের হিসেব কষে বের করলেন স্বীয় জীবনের নানামুখী ব্যবহারিক তালিকা সাথে সাথে তিনি তাঁর আল্লাহর সাথে কতটা সময় জীবনে কাটিয়েছেন তার হিসেবও বের করে নানাভাই এর নিকট হাযির হলেন। হিসেবের খাতায় দেখা গেল অন্যান্য সকল কর্মের চেয়ে আল্লাহর সাথে সময় ব্যয় করার হিসেব একেবারেই নগন্য কয়েক ঘন্টা মাত্র। সাধক আনোয়ারুল হক হিসেব দেখে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ কে বললেন, ‘নানাভাই! তুমি তোমার জীবনের অন্যান্য কাজের তুলনায় তোমার আল্লাহকে এতে অল্প সময় দেওয়া সত্বেও তোমার আল্লাহ তোমাকে কতকিছু দিয়েছেন। উচ্চতর ডিগ্রী, বড় চাকুরী, সুন্দর পরিবার, মান সম্মান। তুমি তোমার আল্লাহকে আর একটু বেশী সময় দিয়ে দেখ তোমার আল্লাহ কতইনা সুন্দর, তোমার প্রতি তাঁর কতটা ভালবাসা।’ (চলবে)