নিজেদের চরিত্র না বদলালে দেশ ও জাতির চরিত্র বদলায় না

সংলাপ ॥ বিশ্ববাজার এবং বিশ্বমহাজনদের নিয়ন্ত্রিত উপমহাদেশে আর্থ-সামরিক নীতির স্বীকৃতি পেয়েছিলো বাংলাদেশ। দুর্নীতি দমনের নামে যে সন্ত্রাস এবং লুটপাট চালিয়েছিলো তদারকি সুশীলরা এবং তার আগের পাঁচ বছর তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা, তা দেখে পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা আরম্ভ করেছিল। ইতিহাস বলছে, আমলা-সুশীল-সামরিক শাসনের থেকে যে-কোনও নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের শাসন ব্যবস্থা অনেক ভাল। পঁচতে পঁচতে তারা এক জায়গাতে থামতে বাধ্য হয় বলেই একসময় তারা বদলায়। সীমাহীন মিথ্যাচার, ভন্ডামী, বেঈমানী, অকৃতজ্ঞতা থেকে তারা সহজে নিজেদের বদলায় না। কিন্তু জনতার চাপ পড়লে এবং তাদের ওপর আঘাত আসলে বদলায় অতি দ্রুত।

জমির চরিত্র বদল চাইলে, কৃষকের কৃষি-উত্তর বদল হয় না, মানুষের সংস্কার বদলাতে চাইলে, নিজের চারিত্রিক বদলও হয় না। এগুলোর বদল করতে গেলে বদলাতে হবে নিজেকে, ত্যাগ করতে হবে অনবরত মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভ্যাস। নিজের মিথ্যা বলার অভ্যাস, বলতে বলতে একজন মাদক-আসক্তের মতো মিথ্যাবাদী হয়ে যায়। মসজিদের অনেক ইমামদের মতো কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হাদিসের নামে মিথ্যা বলা শুরু করে।

রাজনৈতিক ইসলামের নামে একসময় মসজিদের ইমাম মসজিদের নামাজীদের ডাকলেন মুসলমানদের উদ্ধার করার নিমিত্তে জেহাদ করার জন্য। মিথ্যার মজা হচ্ছে দুধ দোয়ার মতো, মনে হয় বালতি ভরে গেছে, রেখে দিলে একটু পরে দেখা যাবে ২০০ গ্রাম! অল্প সময়ে ধর্মের কথা বলে প্রচুর লোক জমায়েত হয়, সব মানুষকে তো আর চিরকাল বোকা বানানো যায় না। বুঝতে পেরে তারা সরে পড়ে, মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্তরে সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করে, ¯্রফে গোষ্ঠী লাভের জন্য ধর্মের আবেগে সুড়সুড়ি দেয়। কৌশল ফাঁস হয়ে যায়। মানুষ দ্বিগুণ ঘৃণা করে। নিজের ধর্মের অনুশীলন করে ধ্বংস হওয়া শ্রেয়! ত্যাগ করতে হয় মাথা-মুখ-হাতের স্ববিরোধিতা। মুখে বলব কৃষক-কৃষক, মাথায় থাকবে জমির বা সম্পত্তির চিন্তা, কাজে করব আধিপত্যবাদীদের পুঁজির সেবা-আজকের মানুষ তা বুঝতে পারে। ত্যাগ করতে হয় নামের আকাঙ্খা, ধ্বংস করতে হয় ‘আমিত্বের আবরণ’। কেউ যখন সত্যি সত্যি বদলের কাজে হাত লাগান, তার আকাঙ্খাগুলো ধ্বংস হয়। তিনি নিজেও বদলে যান। যখন দেখা যায় তিনি বদলাচ্ছেন না, অথচ বদলের কথা বলছেন, মানে তিনি নিজের বদল চাইছেন না।

মানুষ কেন চোরের জায়গায় ডাকাত এনে বদলানোর পথে যাবেন? সুখের থেকে স্বস্থি ভালো। বাংলায় স্বৈরশাসকেরা ভেবেছিল মিথ্যা, হুমকি আর মস্তানি করে বাংলাকে শাসন করে  যাবে। করেও ছিল, শারীরিক মানসিকভাবে মানুষকে সন্ত্রস্ত করেছিল। অনবরত ভয় দেখিয়ে মানুষকে বাধ্য করা হয়েছিল অনুসরণ করতে। শান্তিপ্রিয় মানুষ গুন্ডামি আর ভন্ডামির অভ্যুত্থানের মুখে নিরাপত্তা-বিধানকারী রাষ্ট্রকে যখন দেখল, গুন্ডামি আর ভন্ডামির সামনে অসহায় মানুষ ঘরে ঢুকে গেল। মস্তানের সঙ্গে সমঝোতা করে বাঁচতে চাইল। যা ঘটেছিল ২০০১ এর নির্বাচনে। নিস্ক্রিয় প্রতিরোধ মানুষকে লুটেরাদের হাতে ঠেলে দেয়। কিন্তু কতদিন? দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ খালি হাতেই তাদেরকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দেয়। ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তান্ডবের ফল হলো অনেক মিথ্যার সঙ্গে কিছু সত্যও মানুষ বর্জন করলেন। যেমন প্রাক্তন শাসকদের দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র সেগুলোও মানুষ মনে রাখলেন না। না-রাখাটাই স্বাভাবিক। আগের সরকাররা যে এসব ক্ষেত্রে সমস্ত সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল। বিশ্বব্যাংক এবং আমেরিকাও সুযোগ নিয়েছিল। সত্যিকারের দুর্নীতিগ্রস্তরা জাল কেটে বেরিয়ে গেলো। সন্ত্রাস দমনের নামে রাজনীতিক ও সত্যভাষী মানুষের ওপর নামিয়ে আনা হয়েছিল অবর্ণনীয় অত্যাচার। নির্বাচনী বিধি তৈরির নামে বাধ্য করা হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে। কিন্তু সব পাল্টে দিলেন বাংলাদেশের জনগণ। আড়ালে চলে গেলো রাজনৈতিক চৌর্যবৃত্তি, দুর্নীতি আর গ্রামবাংলার হা-অন্ন, হা-অন্ন চিৎকার। একমুঠো আটার জন্য সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে গ্রামবাংলার মানুষ মরেছে। জড়ো হচ্ছিল এবং সুযোগ নিচ্ছিল নানা অনভিপ্রেত শক্তি। বড় গলা করে সস্তায় বাজিমাত করতে চেয়েছিল ধর্মের নামে রাজনৈতিক ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীরা। লোকের হাতে পয়সাও নেই। ১৬ কোটির দেশে শুধু হাহাকার। ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে বন্ধ হয়ে গেল আমদানি-চাল, ডাল, গম, বিদ্যুৎ আর গ্যাস নিয়ে চুক্তির নামে একতরফা হুমড়ি খেয়ে পড়ল, হাহাকার রূপান্তরিত হলো ক্ষোভে। প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার জন্য মানুষ অন্যপথে ভাবতে শুরু করেন। ভাবনাটা বার করে দিতে না পারলে পুরো মাথাটাই যে নষ্ট হয়ে যেতো। তদারকি সরকার তদারকির অবসান ঘটিয়ে মানুষের উত্তেজনা প্রশমনের জন্য নির্বাচনী ঘোষণা করতে বাধ্য হলো নিজেদেরকে বাঁচাবার জন্য। যেহেতু তারা যে মই দিয়ে গাছে উঠেছিলেন সেই মই তাদের অজান্তে কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

তাদের স্বস্থি নির্বাচিত সরকার তাদের বিচার আজো করেনি। সুতরাং বদলান বললেই বদল হয় না। ‘বদলানো’ একটা প্রক্রিয়া, যার মধ্যে নিজেকে বদলিয়ে নিয়ে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হয়। প্রক্রিয়া মানেই ‘গতি’, ভাঙা রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি নয়।

এক অস্ত্র বার বার ব্যবহার করলে ভোঁতা হয়ে যায়। গতিতে থাকলে পরিবর্তন আসে, এই পরিবর্তনে থেমে থাকলে দেশ ও জাতি পিছিয়ে পড়ে হাবুডুবু খেতে বাধ্য। আর রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকরা ‘ভাঁড়ে’ পরিণত হয়ে জনগণের কাছে হাস্যকর হয়ে ওঠে।

পরিবর্তন আনে বিকাশ। প্রতিটি স্তরে বিকাশ-সচেতন থেকে নিজেকে পাল্টে নিতে হয়। একজনের মুখ থেকে ‘বদলে দেয়ার’ আহ্বান তখনই মানুষ গুরুত্ব দেন, যখন দেখেন আহ্বায়ক নিজে বদলানোর প্রক্রিয়াতে নিজেকে বদলেছেন। বদলেছেন নিজের স্বভাব, চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, জীবন-জীবিকার সংগ্রামে। না-হলে ব্যাপারটা হয়ে যাবে যাত্রাদলের অভিনয়ের মতো।