নিজেকে বদলালে দেশ ও জাতিকে বদলানো যায়

সংলাপ ॥ ইতিহাস বলছে, আমলা-সুশীল -সামরিক শাসনের থেকে এবং সমাজকল্যাণের নামে এনজিও-র দাপাদাপি থেকে যে-কোনও নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের শাসন ব্যবস্থা অনেক ভাল। পঁচতে পঁচতে তারা এক জায়গাতে থামতে বাধ্য হয় বলেই একসময় তারা বদলায়। সীমাহীন মিথ্যাচার, ভন্ডামী, বেঈমানী, অকৃতজ্ঞতা থেকে তারা সহজে নিজেদের বদলায় না। কিন্তু জনতার চাপ পড়লে বা তাদের ওপর অত্যাচার হলে বদলায় অনেক সময়।

জমির চরিত্র বদল চাইলে, কৃষকের কৃষি-উত্তর বদল হয় না, মানুষের সংস্কার বদলাতে চাইলে, নিজের চারিত্রিক বদলও হয় না। এগুলোর বদল করতে গেলে বদলাতে হবে নিজেকে, ত্যাগ করতে হবে অনবরত মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভ্যাস। নিজের মিথ্যা বলার অভ্যাস, বলতে বলতে একজন মাদক -আসক্তের মতো মিথ্যাবাদী হয়ে যায়। মসজিদের অনেক ইমামদের মতো কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হাদিসের নামে মিথ্যা বলা শুরু করে। মিথ্যার মজা হচ্ছে দুধ দোহনের মতো, মনে হয় বালতি ভরে গেছে, রেখে দিলে একটু পরে দেখা যাবে ২০০ গ্রাম!

অল্প সময়ে ধর্মের কথা বলে প্রচুর লোক জমায়েত হয়, সব মানুষকে তো আর চিরকাল বোকা বানানো        যায় না।

বুঝতে পেরে তারা সরে পড়ে, মুখ ফিরিয়ে নেয়। মনেপ্রাণে সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করে, স্রেফ লাভের জন্য ‘মনোজ্ঞ’ কিংবা অন্য ধর্মের আবেগে সুড়সুড়ি দেয়। কৌশল ফাঁস হয়ে যায়। মানুষ দ্বিগুণ ঘৃণা করে। তার থেকে বরং ‘অন্য ধর্মের ভাল’-র চেয়ে নিজের ধর্মের খারাপ অনুশীলন করে ধ্বংস হওয়া শ্রেয়! ত্যাগ করতে হয় মাথা-মুখ-হাতের স্ববিরোধিতা। মুখে বলব কৃষক-কৃষক, মাথায় থাকবে জমির বা সম্পত্তির চিন্তা, কাজে করব আধিপত্যবাদীদের পুঁজির সেবা-আজকের মানুষ তা বুঝতে পারে। ত্যাগ করতে হয় নামের আকাঙ্খা, ধ্বংস করতে হয় ‘আমি’-কে। কেউ যখন সত্যি সত্যি বদলের কাজে হাত লাগান, তার আকাঙ্খাগুলো ধ্বংস হয়। তিনি নিজেও বদলে যান। যখন দেখা যায় তিনি বদলাচ্ছেন না, অথচ বদলের কথা বলছেন, মানে তিনি নিজের বদল চাইছেন না।

মানুষ কেন চোরের জায়গায় ডাকাত এনে বদলানোর পথে যাবেন? সুখের থেকে স্বস্তি ভাল। হিটলার ভেবেছিল মিথ্যা, হুমকি আর মস্তানি করে দুনিয়াটা শাসন করবে। লিখেও ছিল, শারীরিক মানসিকভাবে মানুষকে সন্ত্রস্ত করে রাখো। অনবরত ভয় দেখাও, মানুষ তোমাকে অনুসরণ করবে। শান্তিপ্রিয় মানুষ জার্মানিতে গুন্ডামির অভ্যুত্থানের মুখে নিরাপত্তা-বিধানকারী রাষ্ট্রকে যখন দেখল, গুন্ডামির সামনে অসহায় মানুষ ঘরে ঢুকে গেল। মস্তানের সঙ্গে সমঝোতা করে বাঁচতে চাইল। নিস্ক্রিয় প্রতিরোধ মানুষকে ফ্যাসিস্টদের হাতে ঠেলে দেয়। কিন্তু কতদিন? দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ খালি হাতেই তাদের ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দেয়।

বদলান বললেই বদল হয় না। ‘বদলানো’ একটা প্রক্রিয়া, যার মধ্যে নিজেকে বদলিয়ে নিয়ে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হয়। প্রক্রিয়া মানে ‘গতি’, ভাঙা রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি নয়। এক অস্ত্র বার বার ব্যবহার করলে ভোঁতা হয়ে যায়। গতিতে থাকলে পরিবর্তন আসে, এই পরিবর্তনে থেমে থাকলে দেশ ও জাতি পিছিয়ে পড়ে হাবুডুবু খেতে বাধ্য। পরিবর্তন আনে বিকাশ। প্রতিটি স্তরে বিকাশ-সচেতন থেকে নিজেকে পাল্টে নিতে হয়। একজনের মুখে থেকে ‘বদলে দেয়ার’ আহ্বান সাধারণ মানুষ তখনই গুরুত্ব দেন, যখন দেখেন আহ্বায়ক নিজে বদলানোর প্রক্রিয়াতে নিজেকে বদলেছেন।  বদলেছেন নিজের স্বভাব, চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, জীবন-জীবিকার সংগ্রামে। না-হলে ব্যাপারটা হয়ে যাবে বাজে যাত্রাদলের অভিনয়ের মতো।