ধাতুসুধায় লালন পাঠ – ৩

এই ধারাবাহিক রচনায় প্রথমবারের মতো ইটিমোলজি’র (শব্দের বুৎপত্তি নির্ণায়ক শাস্ত্র) নিরিখে লালন সাইজি’র পদাবলি বিশ্লেষন করা হয়েছে। পদাবলির প্রতিটি চরণ শব্দমূল অর্থাৎ ধাতুভিত্তিক দর্শনে বর্ণিত; তাই এটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ধাতুসুধায় লালনপাঠ’। গোটা ভাব বা বস্তুকে যা দিয়ে ধরে রাখা যায় সেটাই তার মূল বা ধাতু। দেহ নানা প্রকার প্রাণরস ধারণ করে টিকে থাকে; সেগুলোই দেহের ধাতু। ঠিক তেমনি শব্দ একটি ভাব বা চেতনার কাঠামো যা ধাতুকে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। শব্দের গোটা ছবি দেখতে হলে ধাতুবিচার খুবই জরুরি।

তারিফ হোসেন

তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে

তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে ॥

একটা পাগলামি করে জাত দেয়

সে অজাতেরে দৌড়ে গিয়ে

আবার হরি বলে পড়ছে

লুটে ধুলোর মাঝে ॥

একটা নারকেলের মালা

তাতে জল তোলাফেলা করঙ্গ সে

পাগলের সাথে যাবি

পাগল হবি বুঝবি শেষে ॥

পাগলের নামটি এমন

বলিতে অধীন লালন হয় তরাসে

ও সে চৈতে নিতে

অদ্বয় পাগল নাম ধরে যে।।

‘তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে

তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে।’

উল্লিখিত শব্দমালার তিন পাগল ও ‘নদে’ শব্দজোড়ের রহস্য উদ্ঘাটন হলে এর ভেতরের অর্থ আমাদের বোধগম্য হবে। ‘নদে’: এটিকে অনেকেই একটি স্থাননাম হিসেবে অনুবাদ করে থাকে। মধ্যযুগে শ্রীচৈতন্যসহ তিন আত্মতত্ত্ববিদের নদীয়া ভূখন্ডে যে মিলন মেলা রচিত হয়েছিল তাকে কেউ কেউ ‘তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে’-বলে অভিহিত করে থাকেন। এই অভিমত মেনে নিলে সাঁইজির পদনিহিত বার্তা একটি বিশেষ স্থান-কাল পাত্রে আবদ্ধ হয়ে যায়। একজন কালোত্তীর্ণ পুরুষের বাণী কখনও সীমিত স্থানকালে বন্দি হতে পারে না। তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী সনাতন ও শাশ্বত হওয়াই স্বাভাবিক। এই পদাবলীর অন্তিমে সাঁইজি তিন পাগলের নামগুলি সুস্পষ্ট ঘোষণা করে তাদের সার্বজনীন স্বরূপ নিশ্চিত করেছেন। সুতরাং এই নদ যে ভৌগোলিক নদীয়া নয় তা সুনিশ্চিত। এখানে প্রবাহ অর্থে ‘নদ’কে বোঝানো হয়েছে। মানবদেহে ঈড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না নাড়ির ধারা প্রবাহিত। তাদের সম্মিলিত ধারা মিলেছে কুলকুন্ডলিনীতে-এটাকে সাঁইজি ‘তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে’-বলে বর্ণনা করেছেন। ‘তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে’- এটি হল একধরণের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারী। ঈড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না নাড়ীত্রয়ের সাধন অসম্পূর্ণ থাকলে দেহ সংস্কার হয় না, বিকারগ্রস্ত থাকে। এই বিকৃত মানসিকতায় পরমপ্রেমে আত্মহারা পাগলের কাছে ভেড়াটা ঠিক নয়।

‘একটা পাগলামি করে

জাত দেয় সে অজাতেরে দৌড়ে গিয়ে।’

পাগলের ‘আমি’ (ঝবষভ)-র মধ্যে যে ভাব তার নাম পাগলামি। লালনঘোষিত পাগলত্রয়- চৈতে, নিতেই, অদ্বয়-এটা মূলত উপনিষদের সৎ-চিৎ-আনন্দ বা সচ্চিদানন্দ সত্তা। চিৎস্বরূপ সত্তা চৈতে, নিতাই হল নিত্যানন্দ এবং অভেদ দ্বৈততাহীন ব্রহ্ম সত্তাই হল সাঁইজি নির্দেশিত অদ্বয়। আবার সাঁইজির এই তিন পাগল রামকৃষ্ণের ভাবসঙ্গীতে মূর্ত হয়েছে এভাবে-

‘বামে অদ্বৈত আর দক্ষিণে নিতাই

তার মাঝে নাচে

আমার চৈতন্য গোঁসাই।’

উক্ত ভাষ্যের আলোকে এটা সুনির্ণীত যে ‘চৈতে-নিতে-অদ্বয়’ এই ত্রয়ীসত্তা একে অপরের পরিপূরক। নিত্য চেতনায় একাকার হলে মানুষের উত্তরণ অর্থাৎ দ্বিতীয় জন্ম বা দ্বিজপ্রাপ্তি ঘটে। এটাকে সাঁইজি ‘জাত দেয় সে অজাতেরে’-বলে পদায়ন করেছেন।

‘আবার হরি বলে পড়ছে

লুটে ধুলোর মাঝে।’

চৈতে, নিতে, অদ্বয়-এর যে কোন একটি আহরিত হলে মানুষ হরিদশায় পৌঁছে যায়। তখন নমঃ নমঃ ভঙ্গি তার নিত্যসঙ্গী। নিজেকে মনে হয় মহাপ্রভুর একান্ত দাস। নিবেদন তার অস্থিমজ্জায়।

‘একটা নারকেলের মালা

তাতে জল তোলাফেলা করঙ্গ সে।’

নারকেলের মালাই হল করঙ্গ। এটি সাঁইজির একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দভেদ। মাথার খুলি, শরীরাস্থি, দেহ ইত্যাদি অর্থে শব্দটির প্রচলন আছে। করঙ্গ ও কম-লু সমার্থক। সন্ন্যাসী বা ব্রহ্মচারীর ব্যবহৃত কাঠ বা মাটি দিয়ে তৈরি জলপাত্রকে কমন্ডলু বলে। তাহলে দেখা যাচ্ছে নারকেলের মালা-করঙ্গ-কুমন্ডলু একই দ্রব্যসামগ্রী। কমুন্ডলুর মধ্যে যে মুন্ড আছে তার ধাতুগত অর্থ হল হর্ষ বা আমোদ। ‘নারকেলের মালাতে জল তোলাফেলার’-আগমিক অর্থ সাধক দেহের বীররসের প্রবাহ শক্তি কুলকুন্ডুলিনীর মাধ্যমে জাগিয়ে তুলে মুন্ডু অর্থাৎ মস্তিষ্কেও সহস্রারে চালনা করে প্রসাদ লাভ করতে পারে। অন্যদিকে রসের স্খলনে অবসাদগ্রস্ত হতে পারে। তবে এ সাধনকর্মের ভেদ বুঝতে হলে চৈতে-নিতে-অদ্বয় পাগলের সঙ্গী হতে হবে। অন্যকথায় সচ্চিদানন্দ বিহার জরুরি। যাকে সাধক লালন – ‘পাগলের সঙ্গে যাবি/পাগল হবি বুঝবি শেষে।’ অভিধায় ভূষিত করেছেন।

‘পাগলের নামটি এমন

বলিতে অধীন লালন হয় তরাসে।’

ভণিতায় যথারীতি খাস লালন আমদরবারে আত্মতত্ত্বের খবর দিতে ভয় পাচ্ছে। এই ভীত হবার কারণটি পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। (চলবে)