ধর্মের নামে…. – ৭

সংলাপ ॥ স্রষ্টা এক ধর্মও এক। এখানে সত্য ধর্ম আর মিথ্যা ধর্মের অবতারণ বোকামী। সত্তাগুণের নিয়ন্ত্রিত বিকাশ হলে সেটা ধর্ম। অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ অধর্ম। ধর্ম সমাজের কোনো বিধি-বিধান নয়। মানুষের সৃষ্টি কোনো আইনের বাধনও নয়। স্রষ্টা কে? আমি কে ? আত্মা কী? আত্মা কিভাবে দেহে প্রবেশ করে? কিভাবে দেহ থেকে তা বেরিয়ে যায়? মন ও প্রাণ জীবের কোথায় থাকে? আত্মা কি জীবকোষের সমপরিমাণ? এসব প্রশ্নের উত্তর পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে জন্ম রহস্যের পরম্পরায়। প্রশ্ন হতে পারে অনেক। আল্লাহর রূপ কী? আল্লাহ কি মানুষ ভাবাপন্ন? মানুষ শোনে, দেখে, বলে আর আল্লাহও তো শোনেন, বলেন এবং দেখেন। আল্লাহর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রূপ কী? স্রষ্টা কি সৃষ্টি হতে ভিন্ন? আল্লাহ নিরাকার-প্রাণও নিরাকার। কার সাথে কার সম্পর্ক ? এসব কি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ? আল্লাহ কি মানুষকে তার প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন? ধর্ম নিয়ে গবেষণা করলে এর সবগুলো উত্তর পরিষ্কার হয়ে যাবে। তখন দেখা যাবে খারাপ কর্ম, খারাপ ধর্ম = নাস্তিক। ভাল কর্ম, ভাল ধর্ম=আস্তিক।

প্রতিটি শিশু একই প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে। পিতা-মাতা এবং সমাজ তাকে অন্যভাবে গড়ে তোলে। সকল শিশুরই ভাব-ভঙ্গি, হাসি-কান্না, ভয়-ভীতি, ক্ষুধা ইত্যাদি একই প্রকৃতির। জন্মকালে কারো দাঁত থাকে না। যদি থাকতো তবে মাতৃস্তনে ক্ষতের সৃষ্টি হতো। তাছাড়া, শিশুরা তখন তরল খাবারেই বেড়ে ওঠে। যখন শক্ত খাবার খাওয়ার সময় হয় তখন দাঁত আপনা আপনি গজিয়ে ওঠে। এগুলো প্রকৃতিরই অংশ। ধর্ম, প্রকৃতি ও বিজ্ঞান একই। একটি অপরটির বিরুদ্ধে কথা বলে না। তাছাড়া বিজ্ঞান স্রষ্টার কর্ম আর ধর্ম বিধান সেই স্রষ্টারই বাণী।

ধর্ম মানবের জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত আইন। এ আইন সর্বজীবে সর্বজড়ে জন্ম থেকেই বিরাজ করছে। রেলগাড়ী যেমন লাইন ছাড়া চলতে পারে না, মানুষ ও জড় তেমনি ধর্ম ছাড়া চলতে পারে না। তাই, জন্মলগ্ন থেকে মানুষ যে প্রকৃতি বা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত তারই অপর নাম ধর্ম। ধর্ম পালন মানুষের জন্য অপরিহার্য। ধর্মই মানুষকে সত্যিকারের মানুষে পরিণত করে। ধর্মহীন মানুষ ভয়ংকর পশুর চাইতেও অধম। সঠিকভাবে ধর্মের অনুশীলন অন্তরের পবিত্রতা আনে, অন্তরের অন্তস্থলে আধিপত্য আনে। এক দেশের মানুষ অন্য দেশের জাগতিক আইন মানতে বাধ্য নয় কিন্তু পৃথিবীর সব মানুষ মানসিক, দৈহিক ও আত্মিকভাবে একই আইনের উপর যেহেতু প্রতিষ্ঠিত সেহেতু সকলকে তা অপরিহার্যরূপেই মেনে চলতে হবে। মানুষের তৈরি জাগতিক আইন নিয়ত পরিবর্তনশীল কিন্তু মানুষের সত্তাগুণের কোনো পরিবর্তন হয় না-হবার নয়। যদি হয়ে যায় তবে সে ধর্মহীন। মানুষ তার নিজের রচিত আইন দ্বারা অন্যের উপর প্রভুত্ব সৃষ্টি করতে পারে-নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে-কিন্তু মানব প্রকৃতি তা পারে না। ধর্মের অনুশীলন মানুষকে শান্ত-শীতল বাতাবরণে এনে দেয়-স্রষ্টার কাছে নিয়ে যায়। শিশুর জন্মের পূর্বেই তার খাদ্যের ব্যবস্থা প্রাকৃতিক। প্রকৃত ধর্মে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের

প্রতিটি অবস্থা ও স্তরের সমাধান বিদ্যমান রয়েছে। মানুষ যখন সত্তাগুণ হারিয়ে বসে তখন ঐশী বাণী নিয়ে মহাপুরুষদের আগমন ঘটে স্রষ্টার নিকট থেকে। যুগ-যুগান্তরে যারা ধর্মের কথা বলে গেছেন তারা সকলেই সাধু, সৎ ও সত্যবাদী। সমস্ত জীবনের সাধনা দিয়ে তারা ধর্মকে সত্য প্রমাণ করে গেছেন। তারা কিন্তু স্রষ্টাকে দেখাতে পারেননি। স্রষ্টাতো আসলে মানুষের ভেতরে। ভেতরের জিনিস বাইরের চোখ দিয়ে দেখবে কিভাবে? অন্তরের চোখ থাকলেই দর্শন সম্ভব। সূর্যের দিকেই তাকানো যায় না – সূর্যের স্রষ্টার দিকে কিভাবে তাকাবে বা দেখবে ? নবীগণ যে প্রক্রিয়ায় সেই মহান স্রষ্টার অস্তিত্বের সন্ধান পেয়েছেন আমাদেরকেও সেই পথেই যেতে হবে। পথ একটাই যত মত তত পথ এটা ঠিক কিন্তু সকল মত ও পথে তাঁকে পাওয়া যায় না। মতের পার্থক্যে পথের সংখ্যা এত বেশি হয়ে গেছে যে কে কোন পথে যাবে তার কোনো দিশা করে উঠতে পারছেনা।