ধর্মের নামে…. – ৬

‘যার যার অভ্যন্তরীণ গুণাবলীই তার ধর্ম। প্রতিটি জীব ও জড়ের অভ্যন্তরীণ গুণাবলীর স্বকীয় বিকাশকে ধর্ম বলা হয়। এসব প্রকৃতি যখন অনিয়ন্ত্রিত হয় তখন তা হয় অধর্ম। নিয়ন্ত্রিত হলে অর্থাৎ স্রষ্টার নির্দেশ মতে চললে তা হয় ধর্ম।’

সংলাপ ॥ প্রশ্ন হচ্ছে অন্য সব সৃষ্টিরও তো ধর্ম আছে অর্থাৎ ফিৎরাত আছে সেটা কেমন এবং কিভাবে? যার যার অভ্যন্তরীণ গুণাবলীই তার ধর্ম। এটাই ধর্মের একমাত্র পরিচয়-একমাত্র সংজ্ঞা। প্রতিটি পদার্থের প্রকৃতি ঐ পদার্থেই নিহিত থাকে সারাজীবন সুপ্তভাবে এবং তা যথাসময়ে প্রকাশিত হয়। ষড়রিপুকে পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যথাযথ নিয়ন্ত্রণের নাম ধর্ম। রিপু আসলে অপগুণ নয়। এগুলো মানব প্রকৃতির বিভিন্ন বিকাশ বা রূপ মাত্র। এক কথায়, এগুলো মানবীয় গুণ বিশেষ। আগুনের প্রকৃতি হচ্ছে দাহ করা, তাপ দেয়া, আলো দেয়া। যে কোনো একটি প্রকৃতি না থাকলে তাকে আগুন বলা যায় না। পানির প্রকৃতি হচ্ছে দ্রব করা এবং আগুন ও পানির প্রকৃতিকে অপ-ব্যবহার অধর্ম। আবার কাম, ক্রোধ, লোভ মোহ, মদ, মাৎসর্য প্রভৃতি প্রকৃতি যখন অনিয়ন্ত্রিত হয় তখন তা অধর্ম। সুতরাং, প্রতিটি জীব ও জড়ের অভ্যন্তরীণ গুণাবলীর স্বকীয় বিকাশকে ধর্ম বলা হয়। এসব প্রকৃতি যখন অনিয়ন্ত্রিত হয় তখন তা হয় অধর্ম। নিয়ন্ত্রিত হলে অর্থাৎ স্রষ্টার নির্দেশ মতে চললে তা হয় ধর্ম। লবণের ধর্ম কটুতা, চিনির ধর্ম মিষ্টতা, মরিচের ধর্ম ঝাল ইত্যাদি। এগুলো হচ্ছে সত্তাজ্ঞান যা মানুষকে চালিত করে জীবনের পথে-স্রষ্টার পথে। যা প্রকৃতি বিরুদ্ধে তা কখনো ধর্ম নয়। ধর্ম কখনো প্রকৃতির বিরুদ্ধে কথা বলে না। মানুষের ধর্ম তা-ই যা তার কর্মের মাঝে বিদ্যমান। যেখানে স্রষ্টার বিধান, সেখানে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। মানব প্রকৃতি ধর্ম ও স্রষ্টার প্রতি এমনিভাবে জড়িত যেমন বাতাসের সঙ্গে জীব বা পানির সঙ্গে মাছের সম্পর্ক।

ধর্ম মেনে চলবো কেন? কী দরকার? এ প্রশ্নের উত্তরে স্রষ্টাকে প্রাসঙ্গিকভাবেই টানতে হয়। স্রষ্টার সৃষ্টি স্রষ্টারই দেয়া সত্ত্বাজ্ঞানে চলবে এটাই প্রকৃতি। যারা স্রষ্টাকে মানে না তারা বলে যে স্রষ্টাকে দেখাও যদি তিনি থেকেই থাকে বিরাজমান। এগুলো বোকাদের প্রশ্ন। যা আছে তা কেবল দেখানোর মাধ্যমেই লাভ করা যায় তা সব সময় সত্য নয়। ঝাল অনুভব করতে জিহ্বা লাগে। টক, মিষ্টতা, তিক্ততার বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। বাতাস তো দেখি না। তাই বলে বাতাস নেই একথা বলতে পারি না। সুগন্ধ বা দুর্গন্ধ নাক দ্বারা বোঝা যায়। জীবনের পরিচয় আমরা পাই তার বিকাশের মাধ্যমে। দুধের মধ্যে ঘি অবশ্যই আছে। দেখানো সম্ভব নয় ? অসম্ভব বলা যাবে না। দুধ জ¦াল দিলে সর জমবে। সর ফেটিয়ে নিলে মাখন বের হবে। মাখন দিলে ঘি প্রকাশ পাবে। সুতরাং দুধেই তো ঘি থাকে এবং সেটা দেখাতে হলে যে সকল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অবশ্যই দরকার তা আমরা করলেই বুঝবো, দেখবো এবং অনুভব করবো। মানুষ তার স্রষ্টাকে দেখবে কিভাবে ? ঐ যে প্রক্রিয়ার কথা বললাম। সৎ পথে থেকে ষড়রিপুকে পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সত্যিকারের স্রষ্টার দাস হতে হবে। নিজের দেহের ভেতর সাধনার বীজমন্ত্র দিয়ে নিজকে উত্তপ্ত করতে হবে। চরম সাধনার দ্বারা জীবাত্মা থেকে সূক্ষ্মত্মায়, সূক্ষ্মত্মা থেকে পরমাত্মায় বিলীন হলে স্রষ্টাকে আর দেখার বাকী থাকবে না। লোহাকে উত্তপ্ত করলে আগুন আর লোহা যেমন বিচ্ছিন্ন নয়, চিনির সাথে পানি মিশালে তা যেমন আলাদা কিছু নয়, ঠিক তেমনি স্রষ্টাও তার স্বরূপে প্রতি জীবে, প্রতি বস্তুতে, অণুতে সর্বত্র বিরাজ করে বাঁচা-বৃদ্ধির লীলা খেলায় খেলে চলছেন নিরবধিকাল। আজ যেটা ধর্ম কাল সেটার কোনো পরিবর্তন হবে না। হলে সেটা ধর্ম নয়। সূর্য সঠিক সময়ে চলে। ফল-ফুলের মৌসুম না এলে তার বিকাশ সম্ভব নয়। কোরানের মতে, ‘পৃথিবীর সবকিছুই তাদের ধর্ম মেনে চলছে, সেজদা করছে স্রষ্টাকে, পালন করছে স্রষ্টার আদেশ সৃষ্টির সেই শুরু থেকেই।’