ধর্মের নামে…. – ১৮

সংলাপ ॥ পূর্ব কথিত ভক্তরূপী শত্রুগণের কল্পনার বাহাদূরী এবং তাদের সহজসাধ্য অতিভক্তি শোচনীয়তার ফলে যুগবাণী আজও সত্যের আলোক থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে। এতে জ্ঞান, ধর্ম, জীবনবিধান, কর্ম ও মনুষত্বের যা ক্ষতি হয়েছে তা অবর্ণণীয়। এ প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব ও যীশু খ্রীষ্টের কথা কলা যেতে পারে।

পাক-ভারত ও তৎসংলগ্ন এলাকা অতিশয় প্রাচীন এবংসভ্য দেশ এটা সর্বসম্মত বিষয়। কৃষির প্রচলনও এখানেই। দর্শনে, গণিতে এবং সাহিত্যে, পাক ভারত উপমহাদেশ ইউরোপের সভ্যতা তো সামান্য কথা যীশুখ্রীষ্টের জন্মের বহু শতাব্দী পূর্বেও যে উন্নতি লাভ করেছিল, আজকের এই উন্নত বিশ^ জ্ঞানের হিসেবে তার নিকট মাথা নত করে। কিন্তু সংস্কৃত ভাষা এবং হিন্দুদের প্রাচীন শাস্ত্র সাহিত্য ও পুরাণ ইতিহাস প্রভৃতির সূক্ষ্ম গবেষণার দ্বারা, বহু শতাব্দীর জমিয়ে রাখা রাশিকৃত আবর্জনার মধ্য থেকে কৃষ্ণ চরিত্রের কতকটা অস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু বিধি-বিধানের মতো বিষয়ে মতৈক্য হয় না। বুদ্ধদেবের বিষয়টা আরো শোচনীয়। প্রামাণ্য দলিল না থাকায় ভক্তদের কল্পনা, অজ্ঞতা ও অতিরঞ্জনের ফলে তার মাধ্যমে প্রাপ্ত স্রষ্টার বিধি-বিধান কার্যত দুর্বোধ্য হয়ে পড়েছে। বুদ্ধদেবের পরলোকের সাথে সাথে বৌদ্ধরা তাঁকে হারিয়ে তাঁর স্থলে ‘তথাগত’ ও ত্রিকায়াবিশিষ্ট একজন আদি বুদ্ধকে বসিয়েছেন, যিনি আবার অতিমানব এবং স্বয়ং সাক্ষাৎ শ্রীভগবান। শ্রীকৃষ্ণের বেলায়ও তা-ই ঘটেছে। যীশু সম্বন্ধে সমস্যা, তথ্য আরো প্রকট, জটিল ও অবোধ্য। কারণ, বহু শতাব্দী পর্যন্ত কতগুলো অলৌকিক, অস্বাভাবিক এবং অযৌক্তিক আজগুবী ঘটনার মধ্যে যীশু চরিত্রের মহত্বগুলোকে বাইবেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। কিন্তু ইউরোপের নিরপেক্ষ পন্ডিতগণ নানা ধরনের অকাট্য যুক্তি প্রমাণের দ্বারা অখন্ডনীয়রূপে প্রমাণ করেছেন যে, ইতিহাসের হিসেবে এই বাইবেলগুলোর কানাকড়ি মূল্যও নাই। হযরত (সা:) এ জীবনী নিয়ে তো আজ রীতিমতো তুলকালাম কান্ড। তাঁর জীবনী নিয়ে যে সকল বই পুস্তক রচনা হয়েছে তার অধিকাংশই সত্য-মিথ্যা-বিশ্বাস্য ও অবিশ্বাস্য বিবরণে পরিপূর্ণ। অজ্ঞ ও অল্পজ্ঞ লোকদের কথা না হয় বাদই দিলাম, অনেক পন্ডিতের পক্ষেও তার যথার্থতা বের করা দু:সাধ্য। আশার বাণী এই যে, পবিত্র কোরান অবিকৃত থাকাতে পথটি সহজ হয়েছে। তবে মস্তিষ্কের দাসত্ব-শৃংখল যিনি কাটাকে না পারবেন, বাপ-দাদা তথা পূর্বপুরুষদের কথা, পীর মুর্শেদগণের প্রতি অতিভক্তি যিনি পরিহার করতে না পারবেন, পূর্বতন পন্ডিতগণের নজির বা দৃষ্টান্ত যিনি এড়াতে না পারবেন, মক্কার মোশরেকগণ তথা পরবর্তীকালের রাজ-রাজাদের চোখ রাঙানীকে যিনি উপেক্ষা করতে না পারবেন তার পক্ষে মূল তত্ত্বে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। তাই ইসলামী জীবন বিধান তথা হযরত (সা:)- এর বক্তব্যের সথ-মিথ্যা কোরান থেকে যাচাই করে নেয়ার যথেষ্ট তথ্য রয়েছে আমরা যে বিষয় নিয়ে মূলত ভাবছি সে বিষয়গুলো হলো জীবন-বিধান তথা ধর্ম, স্রষ্টার দাসত্বের জন্য করণীয় ব্যবস্থা ও পদ্ধতি। এ দুটো বিষয় নিয়ে মূলত সমাজে তুমুল সমালোচনা, হানাহানি, রক্তপাত ও যুদ্ধ হয়েছে। এ দুটো বিষয়ের সঠিক ব্যাখ্যার অভাবে মানুষের মধ্যে বিভক্তি এসেছে, উপধর্মের জাল চারিদিকে ছড়িয়েছে, লোকাচারকে শাস্ত্র বিধি মেনে তার উপর যে যেমনে পেরেছে নিজেকে ধার্মিক ভাবার চেষ্টা করেছে। পূর্বেই দেখেছি যে মানুষ ও জ্বীনকে সৃষ্টি করা হয়েছে স্রষ্টার দাসত্ব করার জন্য। সেই দাসগণেরা কিভাবে দাসত্ব করবে? কেন করবে? করলে তার ফলাফল কী হবে? এসবের বিস্তারিত বিবরণ কোরানেই বিবৃত আছে। কোরান থেকে বের হয়ে যখনই অন্য কোনো তথ্যের কাছে যাবো তখনই দেখবো যে, মূল সত্যের চেয়ে মিথ্যার বাবুগিরি আর ফালাফালি অনেক বেশী।

রাসুল (সা:)-এর প্রতি আল্লাহ যে নির্দেশ জারী করেছেন তা তিনি অবশ্যই পালন করেছেন। তিনি ওহী গোপন করেন নাই। নিজে কোন কথা বানিয়েও বলেন নাই। যেটা জানতেন না সেটা অকপটে স্বীকার করেছেন। তাই দেখা যায় যে, পুরা কোরান জুড়ে রাছুলের যে বিবরণ দেয়া আছে তাতে আমাদের জবিন বিধানে তাঁর উপর বিশ্বাস আনয়ন করার এবং তা মেনে চলার পথে কোন বাঁধা তো নেই-ই বরং কোরান মেনে চললে যেমন নবীকে মানা হয় তেমনি স্রষ্টার দাসত্বও স্বীকার করা খুবই সহজ হয়। আমরা মূল ধর্মগ্রন্থ কোরান থেকে শিক্ষা না নিয়ে কল্পিত-কল্পনায় বিশ্বাস করে জীবন-বিধানে নানা ধরনের পরিবর্তন আনছি। এটার জন্য আমরাই দায়ী। কোরান বুঝে পড়ি না। পড়লেও তা পড়াতেই সীমাবদ্ধ রাখি কাজে লাগাই না। শতকরা ৯৯% লোক কোরান আরবীতে পড়েন অথচ তাদের মাতৃভাষা আরবী নয়। মাতৃভাষা আরবী না হবার কারণে কোরান বোঝে না। ফলে অন্যের নিকট থেকে সত্য-মিথ্যা যা-ই শোনে তা-ই বিশ্বাস করে এবং সেটাই মেনে চলতে চায়। এটা সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা। স্রষ্টা তাকে কী আদেশ দিয়েছেন, কীভাবে জীবন-বিধি চালাতে বলেছেন তিনি তা না জেনে খুশী তেমন চলবেন এটা তো হতে পারে না। অনেকে আরবী ভাষার কোরান দৈনিকই পাঠ করেন এবং মনে মনে ভাবেন যে অনেক পুণ্যের কাজ করলেন। বোকার স্বর্গে আছেন তিনি। দৈনিক কতবার, কতজন যে কোরান পাঠ খতম করছেন তার ইয়ত্তা নেই। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কোরান পাঠ করলে কী লাভ হবে যদি তা না বোঝা যায়? আসলে আমরা কী পড়ছি? কেন পড়ছি? পড়লে কী লাভ কী ক্ষতি? এ অংকের হিসাব আগে মেলাতে হবে। একজন পুরুষ বা একজন নারী সারা জীবন আরবী কোরান মুখস্থ করে মুখে মুখে পাঠ করল। জীবন শেষে তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় দু’চারটা বিধানের কথা বলুন তো? তিনি কী করবেন? অপারগ হয়ে মাথা নত করবেন। কোরান নিয়ে এ তামাশা আরবী ভাষাভাষী বাদ দিয়ে সকলের মাঝে ব্যাপকভাবে বহমান। কোরানে হাফেজ সাহেব সবটা কোরান মুখস্থ করেও জীবন বিধির অনেক কিছুই বলতে পারেন না।

একদিনে মাইক দিয়ে পুরা কোরান সবিনা খতমে পাঠ করে যে পূণ্যের আশা করা হয় তা কি পূন্য না কোরানের অপমান? আমি মোটামুটি বিত্তবান। আমার পিতাকে শ্রদ্ধা করি। তার সব কথা মেনে চলি। তিনি চিঠি লিখলেন পত্রবাহকের মাধ্যমে কিছু অর্থ প্রেরণের জন্য। পিতার চিঠি শ্রদ্ধাভরে চুমু খেলাম। অবোধ্য ভাষায় পাঠ করলাম। যত্ন করে বুকে রেখে দিলাম। কাজের কাজ কী হলো? মা অসুস্থ, একগ্লাস পানি চাইলেন। মায়ের ভাষা আমি বুঝি না। পানির জন্য কষ্ট পাচ্ছেন। আমি সামনে দাঁড়িয়ে। মায়ের প্রশংসা ও গুণগান করছি। মা পানি চেয়েই চলছেন অরবীতে। আমিও মুখস্থ কতগুলো আরবী বাক্যে মায়ের প্রশংসা করে চলছি। পাঠক! অবস্থাটা চিন্তা করুন। কী উদ্দেশ্যে কী এলো আর কী কাজ করলাম? যদি বুঝতাম তবে পত্রবাহক মাধ্যমে পিতাকে টাকা দিয়ে দিলেই আদেশ পালন হয়ে যেতো। মাকে একগ্লাস পানি দিলেই আদেশ পালন হয়ে যেতো। আর তো কোন ঝামেলাই থাকতো না। আমরা ঠিক তেমনিই আরবীতে পাঠানো আমাদেরই জন্য জীবন বিধান মুখস্থ করে চলছি, বলছি এবং কাজের বেলায় ভক্তিভার ভন্ডামী করছি। তাও আবার নানা মতে নানা ভাগে ভাগ হয়ে। (চলবে)