ধর্মের নামে…. – ১৭

সংলাপ ॥ জীবন বিধান কেমন হবে তা আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি। এখন প্রশ্ন হলো মতভেদ হলো কেন? এই মতভেদের মূল উৎস কোথায়? কারা এর হোতা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা অবার যাবো ধর্মগ্রন্থে। যেখানে খুঁজে পেতে চেষ্টা করবো কারা স্রষ্টার দেয়া জীবন বিধানকে খন্ডখন্ড করেছে? কারা মতবিরোধ ঘটিয়েছে? কারা অভক্তি দেখিয়ে বিভক্তি এনেছে? বিভক্তি এবং মতভেদের কারণে ইসলামী জীবন বিধানের কী পরিণতি হয়েছে? যারা বিভক্তি এনেছে তাদের পরিণতিই বা কী হয়েছে? কতকাল পূর্ব থেকে এ ধারা বিরাজ করছে? ধর্মের সংখ্যা মানুষের জন্য একটিই। আল্লাহও এক, কোরানও এক, অথচ জীবন বিধানে এই যে ব্যপক পার্থক্য সুদূর অতীত থেকে শুরু হয়ে তার পরম্পরা অদ্যাবধি চলছে-আরো হয়তো চলবে এবং এই চলার পরিণতি কী হয়েছে, কী হচ্ছে এবং হবে তা আমরা একটু বিশ্লেষণে যাবো। প্রথমে কোরানের সাহায্য নেবো। সুরা রুমের ৩০ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আপনি শান্তিপূর্ণ জীবন বিধানের জন্য মুখ তুলে দাঁড়ান-একনিষ্ঠভাবে। আল্লাহর ফিতরাত গতি-প্রকৃতি ও তাই যার উপরে মানব সন্তানকে সাজিয়ে তুলেছেন। আল্লাহর সৃষ্টি ধারার কোন রদবদল নেই মোটেই। এইতো হচ্ছে সহজ-সরল জীবন ব্যবস্থা। কিন্তু বেশীর ভাগ মানুষই তো কিছুই বুঝে না।’ সুরা কাসাসের ৫০ নং আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘কিন্তু ওরা যদি আপনার দাবী পূরণ না করে তাহলে আপনি জানবেন ওরা নিজেদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করছে। অথচ তার চাইতে বেশী পথহারা গোমরাহ আর কে-ই বা হতে পারে, যে নাকি শুধু নিজের খেয়াল খুশীটাকেই মেনে চলছে-আল্লাহর কাছ থেকে যে পথ নির্দেশ এসেছে তা বাদ দিয়ে। আল্লাহ জালিমকে পথ দেখান না একথা সত্য সুনিশ্চিত।’ সুরা ফাতির-এর ৪৩নং আয়াত দ্বারা আমরা আল্লাহর সুন্নতের প্রমাণ করবো। এই ছত্রের শেষাংশে বলা হয়েছে –

ফালান তাজেদা লিছুন্নতিল্লাহ তাবদিলা, ওলান তাজেদা লিছুন্নাতিল্লাহি তাহবিলা অর্থাৎ ‘আপনি আল্লাহর বিধানে কোনও রদবদল পাবেন না, আর আপনি আল্লাহর বিধানে কিছুমাত্র নড়চড়ও দেখতে পাবেন না।’ এখানে আল্লাহর দ্বীন, আল্লাহর সুন্নত এ দুটো শব্দ দিয়ে আমরা পরিস্কারভাবে বুঝতে পারলাম যে হযরত (সাঃ) যা করেছেন তা আল্লাহর নির্দেশে করেছেন, যা বলেছেন তা আল্লাহ বলছেন বলেই বলেছেন। তিনি নিজে কিছু বানিয়ে বলেননি বা নিজে কোন মতবাদ তৈরি করে রেখে যাননি। তিনি আল্লাহর দ্বীন অর্থাৎ আল্লাহর সুন্নতই পালন করেছেন। সুতরাং রছুলের নামে আলাদা যে একটা সুন্নত সমাজে আমরা দেখতে পাই এটার উৎস কোথায়? কে তৈরি করল এমন সুন্নত? আল্লাহর সুন্নতের পাশাপাশি নবী কি একটা সুন্নত ব্যবস্থ আলাদা করে রেখে গেছেন? হতেই পারে না। যা ওহীযোগে এসেছে তা আল্লাহর সুন্নত। সুতরাং সুন্নাতাল্লাহ কী করে সুন্নতে রাছুলুল্লাহ হয় সেটা আমার প্রশ্ন। প্রশ্ন করি, রাছুল (সাঃ) কোন সুন্নত পালন করতেন? আল্লাহরটা না নিজেরটা? আল্লাহর সুন্নতের বাইরে আরো সুন্নত আছে কি? থাকতে পারে কি? নবী (সাঃ) কি আল্লাহর সুন্নত প্রচার করেননি? দু’জনের সুন্নত কি এক? যদি একই হয় তবে নাম ভিন্ন কেন? যদি ভিন্ন হয় তবে দু’জনের সুন্নত পালন করে আমরা কি শেরেকি করছি? আমাদের নবীর নামের সুন্নত কি নকল? হাদিসে বলা হচ্ছে-(মান তারাকা সুন্নতি ফালাইছা মিন্নি) অর্থাৎ যে আমার সুন্নত পালন করবে না সে আমার উম্মতের মধ্যে নহে। এই যে, সুন্নাতিল্লাহ এবং সুন্নাতি রাছুলুল্লাহ নামে দুটো সুন্নত নিয়ে আমরা দিশেহারা হয়ে আছি তার বিধান আজ কে দেবে? বাংলাদেশ নয় সমগ্র বিশে^র জ্ঞানী সমাজের কাছে প্রশ্ন করছি। আপনারা এর সঠিক নির্দেশনা দিতে পারবেন কি? ধর্মের নামে ধর্মের মাঝে এই যে সমস্যা তা মিটবে কবে? তাহলে কি ধরে নেবো কোরানের বিধান যাতে দুনিয়ার বুকে স্থায়ী হতে না পারে তার জন্য আলাদা করে মানুষই রাছুলের নামে রাছুলকে ভাঙিয়ে খাবার জন্য একটি আলাদা জীবন ব্যবস্থা তৈরি করেছে? স্বয়ং রছুল যেখানে বলছেন তিনি আল্লাহর ওহী বা জীবন বিধান ছাড়া কিছু বলেননি সেখানে আমরা সুন্নতের নামে মতানৈক্যে ভরা একটি বিশাল ‘সুন্নাতি রাছুলুল্লাহ’ পেয়ে গেলাম যার আকার বই-এর পাতা হিসেবে কোরানের প্রায় দশগুণ বেশী। এই বেশী কথা কে বলেছেন? কাদের প্ররোচনায় কারা এসব করে ধর্মজীবনকে খন্ড খন্ড করে ফেলেছে? ভেবে চিন্তে আলেম সমাজের কাছে এর উত্তর গঠনমূলকভাবে কামনা করছি। শুনেছি নবীর আমলেই নাকি বলা হয়েছিল মুসলমানদের মধ্যে তিয়াত্তরটি দল হবে এবং এর মধ্যে একটি দল মাত্র বেহেশতে যাবে। স্বয়ং রাছুলুল্লাহ (সাঃ) কি একথা বলেছেন? রাছুলতো ভবিষ্যৎ বা গায়েবের খবর জানতেন না। অদৃশ্য কোন বিষয়ে তিনি মন্তব্যও করতেন না। এমন কি গণকের নিকট যেতেও তিনি নিষেধ করেছেন। তাহলে একথা তিনি কেমন করে বললেন? আমার মনে হয় এটা মানুষের বানানো কথা যা রাছুলের নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। তা না হলে কোরান বিরোধী বক্তব্য এসে যায়। সুরা আরাফের ১৮৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি ঘোষণা করে দিন, আমিতো নিজের লাভ লোকসানের ক্ষমতাও রাখি না। তবে আল্লাহ যা ইচ্ছা করবেন। আমি যদি গায়েব বা অদৃশ্য জানতাম তবে অনেক সম্পদ জমা করে নিতাম।’ সুরা মায়েদার ১০৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ পাক যেদিন রাছুলগণকে সমবেত করবেন, আর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন; তোমরা কী উত্তর পেয়েছিলে? তাঁরা বলবেন, আমরাতো কিছুই জানিনা। আপনিইতো অপ্রকাশ্য সব কথা ভাল করেই জানেন।’ এমতাবস্থায় নবীর নামে এ ধরনের কথা চালু করাটা কারো জন্য শোভা পায়? নবীর নামে এমন অনেক কথা চালু আছে যা নবী বলেননি অথচ তা অনেকে ভক্তি ভরে পালন করছে, পালন করতে গিয়ে মারামারি পর্যন্ত করছে।

এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাঠক সমাজের সামনে তুলে ধরবো। তুলে ধরবো এ কারণে যে চুলচেরাভাবে ধর্মকে সংজ্ঞায়িত করেছি-ধর্মকে বিকৃত করার কারণ ও পরিবেশটাও দেখেছি। পাঠক সমাজকে সালাত এবং জাকাতের ব্যাখা দিতে গিয়ে এখানে অনেক কথা বলতে হয়েছে। সামনে আরো কিছু কথা বলতে হচ্ছে। কেননা, যে কারণে জীবন বিধানে বিভেদ, সে কারণের মূল উৎসের সন্ধানে আমাদেরকে কষ্ট করে হলেও একটু যেতেই হচ্ছে। এটা সত্য যে, আমাদের জ্ঞান ও বিবেক, স্বাধীন আলোচনা ও গবেষণার দ্বারা অসত্যের পুঞ্জীকৃত ন্যাক্কারজনক আবর্জনা রাশির নিচ থেকে সত্যের উদ্ধার সাধন করার জন্য পরিশ্রম করি না-ভাবিনা। ৮ বাজে মানসিকতা, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের রকেটে চড়ে জীবন যাপনে জ্বালানীর কমতি নেই। মহাপুরুষদের জ্ঞানের গভীরতা, তাঁদের চরিত্রের মহিমা, তাঁদের জীবনের ব্রত ও সাধনা এসব নিয়ে আলোচনা করলে হাঙ্গামা হয়। আবার ভক্তি করতে হলে জীবনীকে বাদও দেয়া যায় না। এমতাবস্থায় ভক্তকুল কিছু আজগুবী, অনৈতিহাসিক গল্প গুজব, অলৌকিক ও অস্বাভাবিক উপকথার আবিস্কার করে উভয় কূল রক্ষা করে একথা মনে করেন যে তারা বিরাট একটা কিছু করে ফেললেন। কালক্রমে ঐসব কুসংস্কারমূলক ও অলৌকিক কেচ্ছাকাহিনী, মহাপুরুষগণের জীবনের প্রকৃত শিক্ষণীয় বিষয়গুলোকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং ইতিহাস ও পুরাণ পুস্তকের পৃষ্ঠায় আসন নেয় যা পরবর্তীতে শাস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। এ শাস্ত্রের বিপরীতে কথা বলা যায় না। যারা বলেন, তাদেরকে মুরতাদ, ধর্মদ্রেহিী বানিয়ে দেয় সমাজের বোকারা। মূলধর্ম গ্রন্থ থেকে যত যুক্তিবাণী দেখানো হোক না কেন শাস্ত্র ছাড়া ভক্তরা কিছু বোঝে না। সত্য বলতে গেলে ভক্তরা বলে বসে তুমি কোন নতুন পাগল আজ এসব বলছো? মোদের পূর্বপুরুষেরা কি মূর্খ ছিলেন? এসব কথা কোরানেও আছে আজো লোকে বলে। এ ধরনের জঞ্জাল পরিস্কার করাকেই কোরান নিজের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য বলে নির্ধারণ করেছে। কিন্তু জন্মগত ও পারিপার্শ্বিক কুসংস্কারের চাপে কোরানের স্পষ্ট শিক্ষার বিরুদ্ধাচারণ করাকেই অনেকে ইসলাম বলে মনে করে। (চলবে)