দয়ালের উপদেশ – ৭

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-২৬ ॥ মানবের চেয়ে শক্তিশালী আর কেউই নেই। সাধারণ মানুষ তা জানে না। এই শক্তিকে জাগ্রত করার নামই সাধনা। জীবন্মুক্ত মহাপুরুষের চিন্তা, সাধনা, ত্যাগ, বৈরাগ্য, সংযম, শিক্ষা নষ্ট হয় না-সূক্ষ্মভাবে থাকে। তাঁকে চিন্তা করলেই আধ্যাত্মিক দরজা খুলে যায়। দেখ! মুক্তি গাছের ফল নয় যে, গুরু তোদের হাতে তুলে দেবেন, – মুক্তি অনুভূতির জিনিস, তাঁর উপদেশ মতো কাজ করতে হবে তবে তো!

উপদেশ বাক্য শুনলি, যদি এ কান দিয়ে গিয়ে অপর কান দিয়ে বের হয়ে যায়, কি ফল হবে? উপদেশগুলো কানের ভেতর দিয়ে প্রাণের কাছে নিতে হয়। বার বার চিন্তা করে মনে একটা দাগ ফেলতে হয়।

আধ্যাত্মিক উন্নতি, ভক্তি, মুক্তি দয়ালের কৃপাতেই হয়। তপস্যা, জপ, সাধন, ভজন উপলক্ষ্য মাত্র। তবুও এগুলোর প্রয়োজন আছে, এগুলোই কৃপা পাওয়ার উপায়। কায়িক, বাচনিক, মানসিক তিন ভাবে প্রেমময়কে ভজন করা হয়।

উপদেশ-২৭ ॥ নবাবকে যদি তোর বাড়িতে আনতে চাস্ কি করবি? বাড়ি-ঘর পরিস্কার করবি-সাজাবি। তবেই না তাঁকে আসবার জন্য নিয়ন্ত্রণ করবি। আর যদি গোয়ালঘরে তাকে আনতে চাস্ তবে তিনি কি আসবেন? আনতে তো পারবিই না বরং তাঁকে অপমান করা হয়-তাচ্ছিল্য করা হয়।

দেখ্ দয়াল বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের বাদশাহ্। তাঁকে আনতে হলে হৃদয়-মন্দির পরিস্কার করতে হবে-সাজাতে হবে। হিংসা, নিন্দা, ঘৃণা, কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি ক্লেদে পূর্ণ গোয়ালঘরে তাঁকে আসবার জন্য ডাকলে, তিনি আসবেন কেন? ক্লেদগুলো আদর-যত্ন করে রেখে দয়ালকে আসবার জন্য ডাকলে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাই হয়। কাম, ক্রোধ, অহংকার, হিংসা, নিন্দা প্রভৃতি দিয়ে হৃদয় সাজাতে হবে। তবেই তিনি সেখানে এসে উদয় হবেন, নতুবা নয়। দয়ালের কাছে প্রার্থনা করতে হয়, ‘দয়াল, আমায় পবিত্র করে দাও।’

মনে রাখবি, প্রবৃত্তির স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে, দয়ালকে রক্ষা করতে বললে, তিনি রক্ষা করবেন না, তোকেও চেষ্টা করতে হবে। আত্মকৃপা না হলে দয়ালের কৃপা কখনও হতে পারে না।

উপদেশ-২৮ ॥ সহ্য করতে শিখ্। ‘যে সয় সে রয়, যে না সয় সে নাশ হয়।’ সংসারে থাকতে গেলে বিপদ-আপদ, রোগ-শোক, জরা-মৃত্যু এগুলো আছেই, সহ্য করতেই হবে। ওরে! সময় থাকে না, সে চলে যাবেই। আজ বিপদে-আপদে হাবুডুবু করছিস, অস্থির না হয়ে সহ্য কর, দুদিন পরই এই আপদ-বিপদ থাকবে না। আজ তোকে যে মিথ্যা নিন্দা করছে, দুদিন পর সেই তোর গুণকীর্তন করবে। আজ যে তোর সর্বনাশ করবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কয়দিন পর হয়তো সেই তোর শ্রেষ্ঠ বন্ধু হবে।

রোগ, শোক, আপদ, বিপদ এগুলো নিজেরই কৃতকর্মের ফল। ঘুমন্ত মনকে জাগাবার জন্য এগুলো দরকার।

দয়াল যা করেন সমস্তই আমার মঙ্গলের জন্য-এই ভাব মনে রাখলে সহ্য করা সহজ হয়। মনে একটা বল রাখবি-বিশ্বাস রাখবি, -‘আমার পেছনে দয়াল খাড়া আছেন, ভয় চিন্তা কিসের-রোগ-শোক, আপদ-বিপদ-আমার কি করতে পারে ?’ দয়ালের দান মনে করে, হাসিমুখে সব সহ্য করতে হয়। মনে রাখবি, সকল আপদের মূল ধৈয্যের অল্পতা।

উপদেশ-২৯ ॥ মনের চঞ্চলতার একমাত্র কারণ বিষয়-আসক্তি-ভোগের আকাক্সক্ষা। মন এক সময়ে একটি মাত্র বিষয় চিন্তা করতে পারে, দু’বিষয় বা বহু বিষয় চিন্তা করতে পারে না। তোরা যতই দয়ালকে, প্রেমময়কে ভাববি ততই তাঁর প্রতি টান আসবে-ভালোবাসা বাড়তে থাকবে। প্রেমময়ের প্রতি যতই ভালোবাসা বাড়তে থাকবে ততই ভোগাকাক্সক্ষা বিষয়-আসক্তি কমতে থাকবে। দয়ালকে যতই গভীরভাবে ভাবতে থাকবি ততই মন স্থির হয়ে আসবে।

বহুমুখী মনকে অভ্যাসের দ্বারা একমুখী করার নামই সাধন। যে যত বেশি সময় একমুখী-দয়ালমুখী হয়ে থাকতে পারে, সেই তত বড় সাধক।

তোরা শুধু গাছের গোড়ায় জল ঢাল, আপনি গাছ বড় হয়ে ফল দিবে। শুধু প্রেমময়কে ভাব-চিন্তা কর। যতই ভাব গাঢ় হবে, তাতে মজনু হয়ে থাকতে পারবি ততই কাম, ক্রোধ, লোভ শত্রুগুলো দূরে চলে যাবে, বিষয়-আসক্তি-ভোগাকাক্সক্ষা নিস্তেজ হয়ে আসবে। দেখিস না বিড়াল আসলে ইঁদুরগুলো কেমন লুকিয়ে পড়ে!

কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, প্রভৃতি ইঁদুরগুলো একটি একটি করে দমন করবি, ইহা পাগলের প্রলাপ। বিড়াল নিয়ে আয়, সব দমন হতে থাকবে। দয়ালকে হৃদয়ে বসিয়ে রাখ, বেশ, আর কিছু করতে হবে না।  (চলবে)