দৈন্যতা কোথায়?

সংলাপ ॥ বর্ষ-চক্র ঘুরে আবারো মহান একুশ সমাগত। চলছে বরণীয় আয়োজন। বায়ান্নোর স্বাধীকার আন্দোলন ছিলো যার একান্ত প্রয়োজন। যে প্রয়োজনের শিকার হয়েছিলো – সালাম, বরকত, রফিক, সফিক, জব্বারসহ আরো কতো নাম না জানা মহাবীর। একুশ আসে একুশ চলে যায়। বায়ান্নোর পর থেকে নিঃসঙ্গ রক্তাক্ত একুশ জাতির শ্রদ্ধাবনত চিত্ত আর মিনারের বেদীভরা পুষ্প স্তূপের উপর দাঁড়িয়ে কেঁদে যায় বার বার। দোয়েল কোয়েল আর বিহঙ্গের কন্ঠেও ভোরের ভারী করা বাতাসে শোনা যায়, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি’। চিরভাস্বর এই গানের সুর ও ছন্দ বাঙালি ভুলে নাই বটে। কিন্তু ভাষা শহীদের রক্ত স্মৃতি মাতৃভাষার পাশাপাশি একটা চেনা-অচেনা পুরনো শক্তি যেন নীরবে নিঃশব্দে ভুল করার পথ দেখিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে উর্দু-হিন্দীর সুর সঙ্গীতে প্রায়শই ভ্রান্ত সিন্ধুর কৃত্রিম জলরাশিতে ডুবে যাই আমরা। নিঃশ্বাস ফেলার জন্য ভেসে উঠে দেখি, রক্ত ঝরা একুশ আবারো দাঁড়িয়ে। আবারো শুনি কপোতাক্ষ, ধানসিঁড়ি আর বুড়িগঙ্গার অমর স্রোতে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’। দুঃখজনক হলো সরকারী বেসরকারী অফিস আদালতে ব্যক্তিত্ব বিকাশের অমোঘ টানে রক্ত রঞ্জিত অ, আ, ক, খ -এর পরম গুরুত্বকে আজও আমরা প্রবাসী স্রোতে বিলিয়ে দিতে চাই!

নিজের ভাষা মনে প্রাণে জেনে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান রেখে সর্বত্র গর্ব ভরে প্রাধান্য দিয়ে অন্য যে কোনো ভাষা শিখতে কোনো আপত্তি নেই। সে তো জ্ঞান পরিধির প্রসারতা মাত্র। মাতৃভাষা ভালো করে না জানলে অন্য ভাষার স্বাদ এবং তার বিষয়গত নির্যাস সহজে হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। যায় শুধু দুইয়ের মাঝে নিজকে উপস্থিত করে রাখা। অনেকে মনে করেন – এটাই পান্ডিত্য। আসলে পান্ডিত্য তো ভাষা চর্যারই মূল অংশ। একটা জাতিকে ধ্বংস কিংবা কব্জা করে রাখার মূল পূর্ব শর্তই হলো সে জাতির আপন ভাষা কেড়ে নিয়ে অন্য ভাষা চাপিয়ে দেয়া। ১৯৫২ সালে বাঙালির জাতীয় জীবনে তাই তো ঘটতে যাচ্ছিলো। সে সময় আমরা অতি সতর্ক, ঐক্যবদ্ধ এবং নিবেদিত ছিলাম বলেই ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙ্গে দেয়া সম্ভব হয়েছিলো। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাতৃভাষা বাংলার শঙ্কাহীন স্বাধীনতা। প্রশ্ন জাগে আজো সে ভাষা বিস্তারের সফলতা অর্জিত হলো কতটুকু?

ভাষার শঙ্কাহীন স্বাধীনতার জের ছিলো বলেই তো প্রনীত হয়েছিলো বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭। তারপর থেকে বাংলা ভাষা চালু হয়ে থাকলেও সে চালু হলো ধরি মাছ না ছুঁই পানি – সাদামাটা। ইংরেজী প্রীতি শেষ হয়নি। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে আরবী প্রীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। যার মধ্যে ইসলামের মূল্যবোধসমূহ কতটুকু আছে তা নিয়ে চিন্তাবিদগণ শঙ্কিত।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আরবীতে কুরআন তেলাওয়াত দিয়ে শুরু করে আমরা গর্ববোধ করি। এ আমাদের কিসের দৈন্য। পৃথিবীর বুকে অন্য ভাষাভাষি রাষ্ট্র যেমন নিজের ভাষাকে মাথায় করে নিজ ভাষায় কথা বলছে শত চেষ্টাতেও তার মুখ দিয়ে ইংরেজী বা আরবী বের করা যায় না তখন আমরা কোথায়? এই প্রীতি কি আমাদের উন্নতির পথে সহায়ক হয়েছে? এমন প্রমাণ কি কেউ দিতে পারবেন? নাকি দাসত্বের আবরণ খুলে ফেলতে পারিনি আমাদের স্বভাব ধর্মের মধ্যে? আমরা তো জানি গুণীজনেরা বলে গেছেন যে নিজের ভাষায় পারদর্শী নয় সে কোনো ভাষায় পারদর্শী হতে পারে না।তাহলে এটা কি ভুল?

তাই বাংলার স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী মহল তথা বর্তমান সরকারের নিকট তথা সমগ্র বাঙালির নিকট আমাদের আকুল আবেদন বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে জাতীয়করণ করুন যাতে লেখা ও বলায় এবং সর্বস্তরে বাংলা না থাকলে তা বাংলাদেশের মাটিতে গ্রহণযোগ্য না হয়।