দেশবাসী কবে সত্যদ্রষ্টা সাধক নজরুলকে চিনবে!

সংলাপ ॥ ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক অনাচার আর শোষণের বিরুদ্ধে এবং প্রেম, সৌন্দর্য মানবতার পক্ষে সাধক কবি নজরুলের সৃজন কর্ম যুগ যুগ ধরে আজ পর্যন্ত প্রতিটি সূফী সাধকের কাছে সাধনায় অনুপ্রেরণার উৎস। তাই তিনি সাধকদের কাছে পুরুষোত্তম।

“মুখোশের যুগ এটা। মুখোশ! হা-হা মুখোশ চতুর্দিকে। শুয়োরের চামড়া ঢাকা, মাথায় মোষের শিং। ভাড়ামির রঙ্গশালায়। প্রগলভ সঙ্গীত, মুখোশের মঞ্চে মঞ্চে। মহাযোগ্যশালা পিচাশের প্রদর্শনী! শশংকিত, সুরক্ষিত দ্বার! টিকেট লাগেনা মুখোশে! মুখ খোলা নিষিদ্ধ এইখানে। খোলা কথা খোলাখুলি বলা অসম্ভব। মুখোশের আভিজাত্য উচ্চমার্গে উচ্চ প্রশংসিত। খোলাখুলি মত বিনিময় অবাঞ্চিত, অবাস্তব মুখোশের দেশে। মুখোশ হা হা মুখোশ চতুর্দিকে! মুখোশের রঙ্গালয়ে যারা আজো পায়নি টিকিট- অনাহূত, উপেক্ষিত, অনিমন্ত্রিত, অনন্তর, অদ্ভূত হস্তপদ- এ নগরী পথ নিষিদ্ধ যাদের কাছে, খোলামুখ, খোলাবুক, খোলামন ভৈরব উল্লাসে, তারা আসে, দলে দলে আসে। কাঁপে উঠে রঙ্গশালা’- ভেঙ্গে পড়ে নিষিদ্ধ তোরণ।”

এখানে প্রথম অংশে সমাজ চিত্র এবং পরে নজরুলের আত্মচিত্র ফুটে উঠেছে। জাহেরী অর্থ তো ব্যাখার অপেক্ষা রাখে না। হাকিকতে মানব দেহ নামক রঙ্গশালায় রব বন্দি এবং নফ্সের তাবেদারী সবাইকে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন পুরুষোত্তম নজরুল, যাকে কথা বলতে ও কলম চালাতে ওই মুখোশধারীরা কারাগারে নিয়ে – কাফের ফতোয়া দিয়ে – নাস্তিক বলে বাধা প্রদান করতো। কিন্তু সে মুক্তপুরুষ কি আর কারো বাঁধা-বিঘ্নকে তোয়াক্কা করে নাকি! সে যে মুক্ত-চিরমুক্ত — তাঁকে বন্দিতে আনে কার সাধ্য! আলোকে কি কেউ ইচ্ছামত কোন ঘরে বন্দি করে রাখতে পারে নাকি – নাকি পেরেছে! কোন না কোন রাস্তা দিয়ে সে বাহিরে তথা খোলা জায়গায় মুক্ত আলোর সাথে মিলিত হবেই। বন্ধ ঘরে তথা মানব দেহে যে আলোর অংশ – যা কারামুক্তকামী বা মুক্তির দেশের সন্ধানী তাঁর অর্থাৎ ভগবান বা আল্লাহ্র অবস্থান যে মানব দেহে এবং এখানেই যে ইহার প্রকাশ বা জাহের সম্ভব সে সম্বন্ধে পুরুষোত্তম  বলেছেনঃ

“তোমাদেরই বুকে জাগে নিত্য ভগবান

ভয়হীন, দ্বীধাহীন, মৃত্যুহীন তিনি।

তোমারে আধাঁর করিয়া সেই মহাশক্তি প্রকাশিত হন নিত্য,

চাহ আঁখি খুলি, আপনার মাঝে দেখ আপন স্বরূপ।

তোমাদের মাঝে আছে বীর সব্যসাচী।

আমি শুনিয়াছি বন্ধু সে ঐশীবাণী।

উর্ধ্ব হতে রুদ্র মোরে নিত্য কহে হাঁকি।

শোনাতে ঐ কথা, এই তাঁহার আদেশ।

কথিত আছে যে, আল্লাহ্কে যাহারা দর্শন করিয়াছেন, যুবক রূপেই দর্শন করিয়াছেন। তাই জ্বরা-জীর্ণ দেহে নয় বরং শুদ্ধ মানব দেহে ভগবান বা রবকে খুঁজতে পুরুষোত্তম এখানে ইঙ্গিত করেছেন এবং এই শুদ্ধদেহ বলে যৌবনের অধিকারী যুবককে বুঝাতে চেয়েছেন এবং যৌবনকে তিনি বয়সের ফ্রেমে বাঁধেননি। যার মাঝে প্রাণ-চাঞ্চল্য আছে — নিজেকে জানার স্পৃহা আছে তাকেই তিনি যৌবনের অধিকারী বলেছেন। তাইতো তিনি যৌবনের গানই গেয়েছেন। এখানে যৌবন বলে এমন একটা শক্তিকে বোঝানো হয়েছে যে শক্তি নিজেকে না জানা পর্যন্ত অদম্য-অপ্রতিরোধ্য। ইহা সালাত ব্যতীত আর কিছু নয়। এ রকম যৌবনের অধিকারী তথা সালাতের মাঝে বা সালাতী সত্ত্বার মাঝেই বিদ্যমান বা জাগ্রত আপনার রব। তাই তিনি যৌবনকে বয়সের ফ্রেমে বাঁধেননি। অর্থাৎ সালাতী লোকদেরকেই এখানে যুবক বলা হয়েছে যারা ধ্যান করতে জানে এবং তাদের মাঝেই আল্লাহ্ বা রবকে খুঁজে পাওয়া যায়। “যে নিজেকে জানলো সে তার রবকে জানলো” হাদিসটির পূর্ণ সমর্থন এখানে নজরুল সাহিত্যেও পাওয়া যায়। যুবকদের প্রতি ইঙ্গিত করে এখানে সালাতী সত্তাকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং তাদের মাঝে “বীর সব্যসাচী” আছে বলে জুলফেকারকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ সব্যসাচী অর্থাৎ দু-ধারী তলোয়ার- ইহা জুলফেকার ব্যতীত কিছুই নয়।

যিনি সর্বশক্তিমান তাঁহার কাছে নজরুল -শুদ্ধ- জ্ঞান কামনা করেন যার দ্বারা ধরার ধূলিতে পুণ্য, প্রেম, ভক্তি মঙ্গল ও কল্যাণে গান তিনি গাইতে পারেন এবং সেই শুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমেই নজরুল যে আত্মশক্তি অর্জন করেছিলেন তার বলেই গেয়ে উঠেনঃ

বিধি নিষেধের উর্ধ্বে স্থির,

রহি যেন চির উন্নত শির।

যাহা চায়-যেন জয় করে পাই।

গ্রহণ না করি যেন দান।

এতবড় কথা কেবল তাঁরাই বলতে পারে যাঁরা সেই শক্তির সন্ধান পেয়েছেন। এটা অহংকারের মত শুনালেও এটা অহংকার নয়। এটা পরমাত্মার জ্ঞান-আত্মপলব্ধি-রবের জাগরণ-রবের জগৎ তথা আলোর বা নূরী জগতে অবগাহন করেই একথা বলেছেন পুরুষোত্তম নজরুল। যেমন মনসুর বলেছিলেন – “আনাল হক”। মন-মগজ চোখ ও কানে পর্দা বা পীড়া রেখে খোঁজাখুজি করলে এ দর্শনের সন্ধান মিলবে না। তাঁর ভক্তিগীতি, লোকগীতি, কাব্যগীতি, ইসলামী গান ইত্যাদিতে প্রচুর জ্ঞানের খোরাক বিদ্যমান। ‘বিদ্রোহী’ হয়ে এই বিদ্রোহীকে বা ‘কাফের’ হয়ে এই কাফেরকে বা ‘পাগল’ হয়ে এই পাগলের সন্ধান করতে হবে তাঁর  মাঝে। তবেই সম্যক স্বরূপ খুঁজে পাওয়া যাবে এই কালোত্তীর্ণ পুরুষোত্তম নজরুলের এবং পাওয়া যাবে তাঁর দর্শনের দেশনা।

পুরুষোত্তম তাঁর নিজের সম্বন্ধে নিজে কি বলেছেন বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন  ভাবে:

“আপনারা জেনে রাখুন- আল্লাহ্ ছাড়া আর কিছুর কামনা আমার নাই। আমার সব প্রার্থনা, নামাজ- রোজা, তপস্যা, জীবন মরণ সবকিছু বিশ্বের একমাত্র পরম প্রভু আল্লাহর পবিত্র নামে নিবেদিত। আল্লাহে পূর্ণ আত্মসমর্পণ যার হয়েছে তিনি এই মুহূর্তে এই দুনিয়াকে ফেরদৌসে পরিণত করতে পারেন। আমার মন্ত্র “ইয়াকানা বুদু ওয়া ইয়া কানাস্তাইন”। অসুন্দরের সাধনা আমার নয়। আমরা আল্লাহ্ পরম সুন্দর। তিনি আমার কাছে নিত্য প্রিয় ঘন সুন্দর, প্রেমঘন সুন্দর, রস-ঘন সুন্দর, আনন্দঘন সুন্দর। কুরআনের সূরা নূরের ভিতরে উল্লেখিত জয়তুন ও রসগুনের যেসব কথা রয়েছে, তার অর্থ অনুধাবন করার জন্য আমি সকলকে অনুরোধ জানাচ্ছি। দুঃখ সয়েছি, আঘাতকে আমি হাসিমুখে বরণ করেছি কিন্তু আত্মার অবমাননা কখনো করিনি। নিজের স্বাধীনতাকে (আজাদ) কখনো বিসর্জন দিইনি।

“বলবীর, চির উন্নত মম শির”- এ গান আমি আমার এ শিক্ষার অনুভূতি হতেই পেয়েছি। আমার ‘বিদ্রোহী’ পড়ে যারা আমার উপর বিদ্রোহী হয়ে উঠেন, তারা যে হাফেজ-রুমীকে শ্রদ্ধা করেন – এও আমার মনে হয় না। আমিতো আমার চেয়েও বিদ্রোহী মনে করি তাঁদের। আবার বলি, যারা মনে করেন- আমি ইসলামের বিরুদ্ধবাদী বা তার সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, তারা অনর্থক এ ভুল করেন। ইসলামের নামে যে সব কুসংস্কার, মিথ্যা আবর্জনা স্তুপীকৃত হয়ে উঠেছে- তাকে ইসলাম বলে না মানা কি ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযান? এ ভুল যারা করেন, তারা যেন আমার লেখাগুলি মন দিয়ে পড়েন দয়া করে। এ ছাড়া আমার আর কি বা বলবার থাকতে পারে? কেউ বলে আমার বাণী যবন, কেউ বলে ‘কাফের’, আমি বলি, এ দুটোর কোনটাই নই। বিদ্রোহ মানে কাউকে মানা নয়, বিদ্রোহ মানে ‘যেটা বুঝিনা সেটা মাথা উঁচু করে ‘বুঝিনা’ বলা।’ আর বিদ্রোহ করতে হলে সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে, ‘আমি আপনাকে ছাড়া করিনা কাহারো কুর্ণিশ?”

“আমি সত্য, হাতে ন্যায় দন্ড।” আমার পক্ষে সকল রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্ত কাল ধরে সত্য জাগ্রত ভগবান। আমার পক্ষে আদি অন্তহীন অন্তত স্রষ্টা। রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে রুদ্র। রাজার বাণী বুদবুদ, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র। আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। আমি ভগবাণের হাতের বীণা। সে যাহার সৃষ্টি তাঁহাকেই সে বন্দী করতে চায়, শাস্তি দিতে চায়। আমি সত্য প্রকাশের যন্ত্র। আমার হাতের বাঁশী কেড়ে বাঁশীর সুরের মৃত্যু হবে না; কেননা আমি আর এক বাঁশী নিয়ে বা তৈরি করে তাতে সেই সুর ফোটাতে পারি। সুর আমার বাঁশীতে নয়- আমার মনে ও বাঁশী সৃষ্টির কৌশলে। অতএব দোষ বাঁশীরও নয়- সুরেরও নয়, দোষ আমার, যে বাজায়, তেমনি যে বাণী আমার কণ্ঠ দিয়ে নির্গত হয়েছে তার জন্য দায়ী আমি নই। দোষ আমারও নয়- বীণারও নয়, দোষ- তাঁর যিনি আমার কণ্ঠে বীণা বাজান। সুতরাং রাজবিদ্রোহী আমি নই। প্রধান রাজবিদ্রোহী সেই বীণাবাদক ভগবান। রাজার অনুবাদক রাজসভায় সে বাণীর শুধু ভাষাকে অনুবাদ করেছে, তাঁর প্রাণকে অনুবাদ করেনি, তাঁর সত্যকে অনুবাদ করেনি, করতে পারেনি। আমি রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি নাই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি। আমি জানি এবং দেখেছি, আসামী কাঠগড়ায় আমি একা দাঁড়িয়ে নই, আমার পশ্চাতে স্বয়ং সত্য-সুন্দর ভগবানও দাঁড়িয়ে। আমার আত্মা সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা। আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এ আমার অহৎকার নয় – আত্মোপলব্ধি, আত্মবিশ্বাসের চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি। আমি সত্য রক্ষার ন্যায় উদ্ধারের বিশ্ব প্রলয় বাহিনীর লাল সৈনিক। মহারুদ্রের তীব্র আহবান নিদ্রিত ভূমে আমায় তিনি পাঠিয়েছিলেন অগ্রদূত তুর্যবাদক করে। অমৃতের পুত্র আমি। চিরশিশু প্রাণের উচ্ছল আনন্দের পরশমণি দিয়ে নির্যাতিত লোহাকে মনিকাঞ্চনে পরিণত করার শক্তি ভগবান আমায় না চাইতেই দিয়েছেন। আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই কেননা ভগবান আমার সাথে আছেন। আমি জানি আমাকে পরিপূর্ণরূপে আজো দিতে পারিনি, আমার দেয়ার ক্ষুধা আজো মেটেনি। বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরি অভিযান সেনাদলের তুর্য বাদকের একজন আমি। এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। কোন অনাসৃষ্টি করতে আমি আসিনি। আমি যেখানে ঘা দিয়েছি, সেখানে ঘা খাবার প্রয়োজন অনেক আগে থেকেই তৈরি ছিল।”

পুরুষোত্তম নজরুলের এতসব উক্তি কি কোনদিনও কেউ বিচার করে দেখবে না? অবশ্যই দেখবে। যারা দেখার তারা ঠিকই দেখবে। কিন্তু যাদের মগজে-কানে-চোখে পীড়া/পর্দা তারা যখন নজরুলেকে নিয়ে হৈ চৈ করে তখন যেমনি হাসি পায়- তেমনি দুঃখও লাগে। অনেক লেখক নজরুলকে স্ববিরোধী হিসাবে দেখাতে চেয়েছেন তাদের বিশ্লেষণে এবং ‘বিদ্রোহীতে” নাকি স্ববিরোধী উক্তি বিদ্যমান তাদের ভাষায়। এ রকম আরো বই বাজারে দেখা যায়, যার মাঝে ‘নজরুলকে স্রষ্টা বিরোধী ও অনুসরণকারী হিসাবে অংকিত করা হয়েছে’ আবার বলা হয়েছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করেছেন। আসলে তাদের বিশ্লেষণগুলি স্ববিরোধীতায় ভরপুর। মন-মগজে পর্দা নিয়ে পুরুষোত্তম নজরুলের স্বরূপ বুঝা এবং তাঁর দর্শনের সন্ধান পাওয়া সম্ভব নয়। অতএব নজরুলকে নিয়ে এরা নাড়াচাড়া করলে সম্মানের চেয়ে অসম্মানই হবে বেশি।

যেমনটি হচ্ছে প্রচলিত ভন্ড মোল্লাদের দ্বারা ইসলাম ও মহানবীর অমর্যাদা, যারা মহানবীকে তাদের বড় ভাই বানাতে সদা উদ্যত (নাউযুবিল্লাহ)। বহুল প্রচলিত আযানের দোয়ার মাধ্যমে মহানবীকে কতটুকু সম্মান করা হয় সেটা ভেবে দেখার বিষয় নয় কি? এজিদ পন্থী মোল্লা, মৌ-লভীদের কথা না হয় বাদই দিলাম। ঠিক তেমনি আমাদের দেশের বিদ্যার জাহাজ ও দিকপালদিগকে আগে চিন্তা করতে হবে নজরুলকে তারা কি মনে করেন। এটা তাদের পান্ডিত্য বিস্তারের ক্ষেত্র নয়-পান্ডিত্য দিয়ে নজরুলের স্বরূপ বোঝা বা বুঝতে যাওয়া এক ধরনের মূর্খ বিলাসিতা। নজরুলের লেখা বা বাণীর উপর হাত দিতে গিয়ে প্রথমেই মনে করতে হবে যে, একজন মহাপুরুষ, আলোক শিশু, কালোত্তীর্ণ পুরুষ, নূরী বীর্যের ধারক-বাহক একজন মুক্ত পুরুষের বাণীর উপর হাত দিতে যাচ্ছি। এতটুকু মনে করতে না পারলে সেখানে নজরুল কবিতার ব্যাখ্যা হবে না। এতে করে মহাপুরুষের স্বরূপটি হয়ে উঠবে বিতর্কিত। এমতাবস্থায় যারা নজরুলকে ভালবাসেন তাদের নীরবে ভালবাসাই সমীচীন-সরব বা কলমে নয়। এই শুদ্ধ ও সিদ্ধ-পুরুষের ‘বিদ্রোহী’ নামক কবিতাটি ব্যাখ্যা করার মত কাউকে আমি জানিনা বা চিনিনা। হয়তো থাকতে পারে আমার পরিচয় নেই। দিকপাল বিদ্যার জাহাজদের কাছে অনুরোধ নিজেদের পান্ডিত্য বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে পুরুষোত্তম নজরুল ও তাঁর দর্শনের সাহিত্য দয়া করে বেচে দিবেন না। এতে সম্মান দিতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। একজন নজরুল প্রেমিক হিসেবেই আমার অনুভূতিটুকু প্রকাশ করলাম মাত্র। কেউ আমাকে ভুল বুঝবেন না। অবশ্যই নজরুল ও তাঁর সাহিত্যের উপর সবারই সমান অধিকার আছে। পাশাপাশি মহাপুরুষের ভাবমূর্তি ও তাঁর  দর্শনকে বিতর্কিত করার অধিকারতো আপনার আমার কারো নেই। এতটুকু মনে রাখলেই তাঁর সঠিক স্বরূপ অনুধাবন করে তাঁর দর্শন থেকে  আমরা সবাই উপকৃত হতে পারবো সমষ্টিগতভাবে। ব্যক্তিগতভাবে তো যার যা পাওয়ার তা পেয়েছি এবং তা পেয়েই চলেছি। এবার দেখা যাক পুরুষোত্তমের আপন ভাষায় কি পরিচয় আমাদের দিচ্ছেনঃ

“আমার আল্লাহ্ পরম সুন্দর। আপনাদের আহ্বানে যখন কর্ম জগতের ভীড়ে নেমে আসি, তখন আমার পরম সুন্দরের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হই, আমার অন্তরে বাহিরে দুলে উঠে অসীম রোদন। সুন্দরের ধ্যান ও তাঁর স্তবই আমার ধর্ম। আমি তাঁর বিরহ এক মুহূর্তের জন্যও সইতে পারি না। আমার সর্ব অস্তিত্ব, জীবন-মরণ কর্ম, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ যে তাঁরই নামে শপথ করে তাঁকে নিবেদন করেছি। আজ আমার বলতে দ্বিধা নেই, আমার ক্ষমা-সুন্দর প্রিয়তম আমার আমিত্বকে গ্রহণ করেছেন। যদি আর বাঁশি না বাজে আমায় ক্ষমা করবেন- আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন অসাম্য ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে অভেদ-সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। অসুন্দরকে ক্ষমা করতে- অসুরকে সংহার করতে এসেছিলাম- আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম- প্রেম পেতে এসেছিলাম সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম। মনে করবেন পূর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে যে একটি অশান্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতায় বেদনায় তাঁরই নির্গত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল। আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি। আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না। জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান-বেদনার গান গেয়ে যাব আমি, দিয়ে যাব নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে সকলের বাঁচার মাঝে থাকবো আমি বেঁচে। এই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা, এই আমার তপস্যা। রবীন্দ্রনাথ আমাকে প্রায় বলতেন, ‘দেখ উন্মাদ, তোর জীবনে শেলীর মত কীটস্- এর মত খুব বড় একটা ট্রাজেডী আছে, তুই প্রস্তুত হ!’ জীবনে সেই ট্রাজেডী দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারণে অন্যের জীবনে অশ্রূর বর্ষায় আছন্ন করে দিয়েছি। কিন্তু আমারই জীবনে রয়ে গেল বিশুষ্ক মরুভূমির মত তপ্ত মেঘের উর্ধ্বে শূন্যের মত। কেবল হাসি! কেবল গান! কেবল বিদ্রোহ!

আমার বেশ মনে পড়ছে, একদিন আমার জীবনের মহা অনুভূতির কথা! আমার ছেলে মারা গেছে, আমার মন তীব্র পুত্রশোকে যখন ভেঙ্গে পড়েছে-ঠিক সেই দিনই, সেই সময়ে আমার বাড়িতে হাস্না হেনা ফুঠেছে আমি প্রাণ ভরে সেই হাস্না-হেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম।

আমার কাব্য-আমার গান আমার জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য হতে সৃষ্টি হয়েছে। যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়তোবা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা-কত কবিতা বেরুবে হয়তো আমার নামে। দেশ-প্রেমিক, বীর বিদ্রোহী-বিশেষণের পর বিশেষণ, টেবিল ভেঙ্গে ফেলবে থাপ্পড় মেরে। বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রাদ্ধ দিনে, বন্ধু তুমি যেন যেওনা। যদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের একটি কথা স্মরণ করো। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বলো, বন্ধু, আমি তোমায় পেয়েছি।’

“তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু

আর আমি জাগিব না-

কোলাহল করি সারা দিন মান

কারো ধ্যান ভাঙ্গিব না।

নিশ্চল, নিশ্চুপ- আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিধুর ধূপ!”