দুষ্টচক্র থেকে মুক্তির মধ্যেই কৃতিত্ব

শাহ্ উল্লাস ॥ ‘রাজনীতি কোন পেশা বা ব্যবসা নয়, রাজনীতি একটা ব্রত, রাজনীতির মূল লক্ষ্য দেশপ্রেম, জনসেবা’-এই কথাগুলো মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের ঘনিষ্ট সহকর্মী, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নেতা হিসেবে খ্যাত জীবন্ত কিংবদন্তী অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক-এ কথাগুলো ভাইরাল হয়েছে। আজ দেশ যখন একদিকে অর্থনৈতিকভাবে অপার সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সমাজের শিক্ষা-সংস্কৃতি-মূল্যবোধ-নারীর সম্মান ও মর্যাদা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নানা অবক্ষয়ের চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। আর এইসব অবক্ষয়ের জন্য সার্বিক ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেকার দুষ্টচক্রকেই দায়ী করা হচ্ছে।

সামাজিক অবক্ষয়ের সর্বশেষ চিত্র ফুটে উঠেছে চট্টগ্রামে ইংরেজি বিভাগের একজন প্রবীণ অধ্যাপককে শিক্ষার্থী কর্তৃক লাঞ্চিত করা এবং অধ্যাপকের গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে। বরগুনায় গত ২৬ জুন কলেজছাত্র রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার প্রধান আসামী সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ডকে  ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার পর এই হত্যা মামলার অগ্রগতি বিষয়ক শুনানীতে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘নয়ন বন্ডরা একদিনে তৈরি হয় না। কেউ না কেউ তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। আদালত বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যা পছন্দ করি না। এতে পাবলিকের কাছে ভুল তথ্য যেতে পারে।’  এখানে নয়নবন্ডদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সমাজের যাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তারা যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আজকের দিনের রাজনীতির সাথে যুক্ত তা সহজেই অনুমেয়। দেশের সর্ববৃহৎ, সবচেয়ে পুরনো, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগই এখন ‘কাউয়া’ এবং ‘হাইব্রিড’-এ ভরে গেছে-এ অভিযোগ দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের বহুদিন আগেরই। গত ৪ জুলাই আওয়ামী লীগের বরিশাল বিভাগীয় প্রতিনিধি সমাবেশে স্থানীয় প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘দলে অনুপ্রবেশকারী, সুবিধাভোগী হাইব্রিড নেতাদের কাছে ত্যাগী নেতা-কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এই বসন্তের কোকিলদের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সব পরিশ্রম, অর্জন ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে’। সমাবেশে দলের একজন প্রবীণ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নয়ন বন্ড একদিনে তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পেলে নয়ন বন্ডরা তৈরি হতে পারে না। সমাবেশে অন্তত চার জন নেতা নয়ন বন্ডের আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী সম্পর্কে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এই প্রতিনিধি সভায় উপস্থিত থাকলেও কোনো কথা বলেননি। এই সংসদ সদস্যের পুত্রের সাথে নয়ন বন্ডের ঘনিষ্টতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে সংকীর্ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ, পরিবারের স্বাধীনতাবিরোধী ইমেজ ও বেকারত্ব দূরীকরণে ও ব্যবসায়িক প্রতিপত্তি অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে সারা দেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীরা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। রাজনীতির অঙ্গনকে কলুষিত করছে যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ, যদিও এ দুঃখজনক অবস্থা নতুন কিছু নয়। জাতীয় পার্টি ও বিএনপির মতো দলগুলোতে এ সমস্যা আরও অনেক বেশি এবং পুরনো। কারণ, এ দল দুটির জন্মের মধ্যেই ছিল মিথ্যাচার এবং জনসেবা ও জনকল্যাণের বিপরীতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অপশক্তির অন্যায় ও অগণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য প্রয়াস। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে ১২ জন সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকুরি দিয়েছিলেন। একজন চিহ্নিত রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। আর এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালেই ‘বিশ্ববেহায়া’ খেতাব অর্জন করেছিলেন।  বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মোশতাক ও জিয়া এবং তাদের পথ ধরে এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে এদেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করার সকল সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়। দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের চরিত্র হননের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এদের দীর্ঘ ২১-বছরের শাসনামলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।

এভাবে তাদের আমলে চালু হওয়া যাবতীয় সব রাজনৈতিক অপকর্ম ও অপসংস্কৃতি থেকে দেশবাসীকে উদ্ধারের দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের ওপরই বর্তায়। সেই গুরুদায়িত্ব যথাযথ পালনের ওপরই আজ এই দলের কৃতিত্ব ও কর্তৃত্ব নির্ভর করছে। এই গুরুদায়িত্ব পালনে সক্ষমতা অর্জনের জন্য দলটির মধ্যে অনুপ্রবেশকারী সব দুষ্ট চক্রকে চিহ্নিত করে দল থেকে বের করার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণই আজ সময়ের দাবি। কারণ, এই দুষ্টচক্র কখনও জনসেবায় ব্রতী ছিল না, হয়নি, হবেও না। দেশের জন্য বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং সর্বশেষে পরিবারের সদস্যবৃন্দসহ নিজের জীবনদানের মূল্য তারা কখনও দিতে আসবে না, অতীতেও  দেয়নি, ভবিষ্যতেও দেবে না।

বাংলাদেশের মাটিতে রাজনীতি করতে হলে সকল নেতা-কর্মীর এই কথাটি অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখান, দেশের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সাধনের ব্রত নিয়েই সারাজীবন কাজ করে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এবং শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্যই তাঁরা আজীবন অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন এবং জীবনও উৎসর্গ করে গেছেন।