দয়ালের উপদেশ – ৩৪

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ ১১৪ ॥ সত্ত্বঃ, রজঃ ও তমঃ এই তিনটি গুণের ভিতর দিয়েই জগৎ চলছে। রজোগুণে সৃষ্টি হচ্ছে, সত্ত্বগুণে রক্ষা পাচ্ছে আর তমোগুণে ধ্বংস হচ্ছে।

তমোগুণী লোকের কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি বেশি থাকে। তাদের আহার, নিদ্রা খুব বেশি,-তারা ভোগ করবার জন্যই বাঁচে। দয়ালের কোন খবর নেই।

সংসার নিয়ে হৈ চৈ করা, ছেলে-মেয়ের মায়ায় নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়া-রজোগুণের কাজ। রজোগুণী লোক, সৎভাবেই হোক, আর অসৎভাবেই হোক অর্থ উপার্জন করতে চেষ্টা করে। সংসারের নানা কাজে মেতে ওঠে দয়ালকে ভুলে যায়।

সত্ত্বগুণী লোকের কোন হৈ চৈ নেই। চলে চলুক, না চলে না চলুক। কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি খুব কম থাকে। দয়ালকে লাভ করবার জন্য তাদের বেশ আগ্রহ। আহার,নিদ্রাও কম। জগতের অশান্তি, দুঃখ-কষ্ট তমোগুণ ও রজেগুণ হতে উৎপত্তি। সত্ত্বগুণে শান্তি আনে, আনন্দ আনে।

ভক্তদের মধ্যেও তমোগুণী, রজোগুণী ও সত্ত্বগুণী ভক্ত আছে। তমোগুণী ভক্ত দয়ালের কাছে জোর করে। কোন কোন ছেলে যেমন-এক রকম জোর করে মা-বাপের কাছ থেকে জিনিস আদায় করে, নতুবা কেঁদে-কেটে ভাসিয়ে দেয়, তেমনই তমোগুণী ভক্ত দয়ালকে পাওয়ার জন্য ভক্তিভাবে জোর করে। রজোগুণী ভক্তের হৈ চৈ বেশি। ধ্যান করবে, হয়তো এমন জায়গায় বসবে, যেখানে সকলে দেখতে পায়। তার পূজায় অনেক হৈ চৈ। নামাজ-রোজায় ও আড়ম্বর বেশি।

সত্ত্বগুণী ভক্ত নীরবে, সাধন-ভজন, ধ্যান-ধারণা করবে। কেউ হয়তো টেরই পাবে না। দয়ালের জন্য যদি কাঁদে, তবে এমনভাবে কাঁদবে, কেউ যেন টের না পায়। দয়ালের উপর সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে, তার প্রেমে মশগুল হয়ে থাকতে চায়। দয়ালের উপর কোন দাবি-দাওয়া সে করে না। দয়াল যা দেন তাতেই সন্তুষ্ট ভক্তের মন স্থির, ধীর, কখনও চঞ্চল হয় না।

উপদেশ ১১৫ ॥ এখানে এসেছিস, এ সরকারি দরবার, শান্তি পাওয়ার পুঁজি জোগাড় করে নে। তা না, শুধু বাড়ি যাওয়ার জন্য ছটফট করছিস। মনে মনে সংসারের কাজ করছিস, এমন করলে তোদের দ্বারা উন্নতির কি আশা করা যায়? এতটা বয়স পর্যন্ত তো সংসারের পেছন পেছন দৌড়েছিস। চিন্তা করে দেখ দেখি, কতটুকু করেছিস।

দেখ, জীবন ভর সংসারের কাজ করে যা দেখবি, মৃত্যুও পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তোর বিশ্রাম নেই, ছুটি নেই। যতই কাজ করিস না কেন, কাজের শেষ নেই, নিত্যনতুনভাবে কাজ গজিয়ে উঠবে।

এখানে এসেছিস আর কিছু হোক বা না হোক, বেশ করে কয়দিন বিশ্রাম করে নে। খাওয়া-পরার চিন্তা নেই, কু-চিন্তাও আসবে না। দেখ, একমাত্র তোর দয়াল গুরুই তোর শান্তি চায়, মুক্তি চায়, ছুটি চায়, যতই সাংসারিক মেহনত করিস্ না কেন, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে এক মিনিটও তোকে ছুটি দিতে রাজি নয়। তোর কাছ থেকে যত পারে আদায় করে নেবে। মৃত্যু হলে ছেড়ে দিবে, তবুও আর আদায় করতে পারবে না বলে তার জন্য দু’চার দিন কাঁদবে।

ওরে, এ দরবারে যতদিন থাকবি ততদিন তুইও সরকারি লোক, তোর কোন চিন্তা করতে হবে না। তোর সংসারের কাজ তোর জন্য আটকে থাকবে না, আপনি দেখবি ঠিক চলে গেছে। শান্তি ছেড়ে, আনন্দ ছেড়ে, বিশ্রাম ছেড়ে কেন অশান্তি ও মেহনতে ছুটে যেতে চাস’রে! এখান থেকে বাড়ি গেলেই তোদের যে ইঁদুরে ঠোকরায় তাতে আমার মনে কষ্ট হয়, তাই তো এখানে কয়দিন থেকে যেতে বলি।

দেখ, জগৎ শক্তির পূজারী। যতদিন তোর শক্তি আছে, কাজ করবার ক্ষমতা আছে, বোঝা বহন করতে পারবি ততদিনই তোর খুব আদর। ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী-আত্মীয়-স্বজন ততদিনই তোকে মাথায় তুলে রাখবে, যতদিন পর্যন্ত তোর কাছ থেকে আদায়ের আশা আছে। দয়াল-গুরু তোর কাছে কোন কিছুই চান না, তিনি চান শুধু শান্তি-তোর মুক্তি। শিয়াল-কুকুরের মতো অনর্থক দুঃখ পেয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিবি তা তিনি ইচ্ছা করেন না।

উপদেশ ১১৬ ॥ নিজের কিছু ক্ষতি শিকার করে হলেও মামলা-মোকদ্দমায় যাবি না। মামলা-মোকদ্দমার মূল তালাস করলে দেখা যায় শতকরা নব্বইটিই স্বার্থপরতা ও অহংকার হতে উৎপন্ন। দুনিয়ায় যদি নগদ নরক দেখতে চাস, তবে সে কাচারি। যেখানে সত্যের ছদ্মবেশে শুধু মিথ্যার বেসাতি। মামলা-মোকদ্দমায় শুধু অর্থের ক্ষতি হয় না, শরীর, মন, আধ্যাত্মিক সব দিক দিয়ে ক্ষতি হয়। এমন সর্বনাশা জিনিস জগতে আর দ্বিতীয় নেই।

পশ্চিম বাংলায় কেউ কাউকে অভিশাপ দিলে বলে, ‘তোর ঘরে মামলা ঢুকুক।’ মামলা করলেই উকিল, মোক্তার রাখতে হয়। নিজে না খেয়ে, ছেলে-মেয়েদের না খাওয়ায়ে, না পরায়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলানো টাকা নিয়ে ‘বাবু’ ‘বাবু’ বলে উকিল, মোক্তারকে দিতে হয়। তারপর আবার উল্টা ধমকানিও কত খেতে হয়।

উকিল, মোক্তাররা মক্কেলকে রোজগারী ছেলে মনে করে। নিজের পরিবারের উপবাসের বন্দোবস্ত করে, জমি বন্ধক বা বিক্রি করে হলেও উকিল, মোক্তারকে টাকা দেয়। এমন উপকারী মূর্খ বন্ধু উকিল-মোক্তাররা আর কোথায় পাবে?

 দেখ, অতি জঘন্য পাপ না করলে কেউ কাচারিতে যান না। নিজের টাকা খরচ করে, মিথ্যা কথা বলা, আর অন্যকে ‘বাবু’ ‘বাবু’ ‘মশায়’ ‘মশায়’ করা যে কত বড় পাপের প্রায়শ্চিত্ত তা বুঝতেই পারিস। সবাই যদি সৎ হতো, তবে কি কাচারি থাকত? লোকের অসৎ কাজের জন্য কাচারির সৃষ্টি, বুঝতেই পারিস, সেখানে কেমন সব লোকের আনাগোনা হয়। (চলবে)