‘দয়ালের উপদেশ – ২৭

উপদেশ-৯৬: দান গ্রহণ করা উচিত নয়। দান গ্রহণ করলে দাতার পাপরাশি গ্রহণ করতে হয়। কারও কাছে কিছু চাইলেই নিজে ছোট হতে হয়, মন সংকীর্ণ হয়ে যায়।

সৎপথে থেকে, অর্থ উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা উচিত, তাতে মন দুর্বল হয় না- পবিত্র থাকে। দেখ! নিজের উপার্জিত অর্থের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে যদি সাধন-ভজন করিস, তবে তার শরিক আর কেউ হয় না, কোন পাপও এসে এই সাধন-ভজনের ক্ষতি করতে পারে না।

দয়াল প্রত্যেককেই হাত-পা দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন। নিজের জীবিকা অর্জন করতে যে সময়টুকু যায়, তা বাদ দিয়ে বাকি সময়টুকুও সাধন-ভজন করলে, দয়ালকে প্রত্যক্ষ করা বাকি থাকবে না। পরগাছার মতো পরের উপর খাওয়া-পরা নির্ভর করা অত্যন্ত পাপ জানবি।

একটা কথা আছে, যদি দয়াল-প্রেমে এমনঅবস্থা হয় যে, খাওয়া-পরার খবর নেই, শীত-গ্রীষ্ম বোধ নেই, সে অবস্থায় দয়ালই তার জীবিকার উপায় করে দেন। যেমন ছোট শিশু, মা-বাপের উপর নির্ভর করে থাকে, তার কোন কিছুই করতে হয় না।

দান গ্রহণ করবার একমাত্র অধিকারী তিনি, যিনি এক হাতে গ্রহণ করে অন্য হাতে গরিব, দুঃখীদের বা সৎকাজে সমস্ত বিলিয়ে দেন। মনে একটু দ্বিধা হয় না ও নিজে ভোগ করেন না। যে দান গ্রহণ করে, কিন্তু দান করে না, সে অধম মানুষ। যিনি দান গ্রহণ করেন ও নিজে দান করেন তিনি মধ্যম মানুষ। আর যিনি শুধু দান করেন, দান গ্রহণ করেন না-তিনি উত্তম পুরুষ।

কেউ যদি কোন হেতু কারণ শূন্যভাবে তোকে কোন কিছু দেয়, আর তুই যদি এ জিনিসের কোন আকাক্সক্ষা না করে থাকিস, তবে মনে করবি ইহা দয়ালের দান। ইহা কৃতজ্ঞতার সাথে করলে ক্ষতি হয় না বরং গ্রহণ না করলে অন্যায় হয়।

উপদেশ-৯৭: মৃত্যু কিছুই নয়’রে মাত্র পঞ্চভৌতিক দেহটা ত্যাগ করা। কর্মফল বা সংস্কার অনুযায়ী সূক্ষ্মদেহ ধারণ ও স্থুল দেহ ত্যাগই মৃত্যু। সাপের ছলম বদলানোর মতো।

সুপারি শুকালে ছোলা হতে আলগা হয়ে থাকে। তেমনি প্রকৃত সাধকেরাও জীবিত থাকতেই এই পঞ্চভৌতিক দেহ হতে আলগা হবার অভ্যাস করে নেয়। ধ্যান-ধারণা দ্বারা যতই দেহাত্মবোধ কমতে থাকে, ততই ভিতরে একটি সূক্ষ্ম দেহ তৈরি হতে থাকে এবং স্থুল দেহ থেকে পৃথক হতে থাকে। মৃত্যুর সময়ে তাদের কোন কষ্ট হয় না, বরং আনন্দই হয়।

সাধারণ লোকের মৃত্যু ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। কাঁচা সুপারি খুলতে বেশ শক্তি লাগে। তেমনি সাধারণ লোকেরও শক্তি যখন শরীরের প্রতি অংশ হতে চলে আসে তখন ভীষণ যন্ত্রণা হয় এবং প্রায় লোকই শেষ সময়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সাধকদের প্রায় সব সময়ই পূর্ণ জ্ঞান থাকে।

দেখ, জীবিত থাকতে তোর দয়ালের সম্বন্ধে যতটুকু অনুভূতি হবে মৃত্যুর পরও ঠিক ততটুকুই থাকবে-একটুও কমবে না বা বাড়বে না। অনেকে বলে মৃত্যুর পর দয়ালকে পাবে। সে ভুল। দেখ! যার এখানে যতটুকু শান্তি-আনন্দ, সেখানেও ততটুকু – কম-বেশি নয়।

তোরা শুধু দয়ালকে চিন্তা কর, আপনি ধ্যান হবে, -ধ্যান গাঢ় হলে সমাধি হবে। সমাধি অবস্থায় ওই পঞ্চভৌতিক দেহ হতে বেশ কিছু আলগা হয়ে যায়। দেখ! মৃত্যু অভিশাপ নয়, -মৃত্যু দয়ালের অতি আদরের একটি দান। ওরে! ধ্যান, সমাধিতে যতই সূক্ষ্মতম দেশে যাবি, ততই ইচ্ছাশক্তি ও অনুভূতি বৃদ্ধি পাবে।

উপদেশ-৯৮: পঞ্চভৌতিক দেহ ত্যাগের অল্প কিছু পূর্বে, কর্মফল অনুযায়ী একটি সূক্ষ্ম দেহ তৈরি হতে থাকে। সমস্ত শক্তি পঞ্চভৌতিক দেহ হতে নিঃশেষিত হয়ে সেই সূক্ষ্ম দেহে যায়। জ্ঞান, বুদ্ধি, মন ও মনের সংস্কার সমস্তই সেই সূক্ষ্ম দেহে থাকে।

যদি একটি পাথরে দাগ দিস, তারপর সে পাথর ঘষা আরম্ভ করিস দেখবি, আস্তে আস্তে সমস্ত দাগই ক্রমে মুছে যাবে, যেটা গভীর সেই দাগটাই শেষ পর্যন্ত থাকে। সেই প্রকার মনে যতগুলো সংস্কারের দাগ জীবনে পড়ে সমস্তগুলোই মৃত্যু সময়ে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যায়। সেইগুলোর মধ্যে যে সংস্কারের দাগটি সবচেয়ে গভীর, শেষ পর্যন্ত একমাত্র সেই সংস্কার অনুযায়ীই চিন্তা আসবে। সে অনুযায়ীই সূক্ষ্ম দেহ তৈরি হবে ও গতি হবে।

যারা প্রকৃত সাধক তাদের মনে দয়ালের সংস্কারই গভীর হয়। মৃত্যু সময়ে তারা দয়ালের চিন্তা করতে করতে দয়ালের কাছে চলে যায়। বিষয়ী ও ভোগী লোকেরা মৃত্যু সময়েও বিষয় এবং ভোগের চিন্তাই করে। ফলও তেমনি হয়। দেখ! চিরজীবন দয়ালের চিন্তা না করলে মৃত্যু সময়ে তাঁর কথা মনে আসতে পারে না। মৃত্যুর সময়ে যখন সমস্ত ইন্দ্রিয় শিথিল হয়ে যায়, সাধকরা তখনও অন্তরে সেই দয়ালকে নিয়েই থাকেন।

মৃত্যু সাধারণ লোকের জন্য কষ্টকর হলেও সাধকদের জন্য আশীর্বাদ, -বিদেশ হতে বাড়ি যাওয়া।

মৃত্যু কেমন করে হয়? মৃত্যুর পর কি অবস্থা? এই নিয়ে মন অস্থির না করে, শুধু দয়ালকে চিন্তা কর, তাঁকে ভালোবাসতে শেখ তোদের কোন চিন্তাই করতে হবে না, দয়াল আছেন, ভয় কি? মৃত্যুর পর শান্তি হবে কি না হবে, সে সবের চিন্তা করবি কেন? দয়ালকে চিন্তা করলে-ভালোবাসলে তো নগদই শান্তি মিলে, বাকি খবরের কাজ কি?