দয়ালের উপদেশ – ২০

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৬৭: সাধক জীবনের চারটি অবস্থা-স্থুল, প্রবর্তক, সাধক, সিদ্ধি,নাছুত, মালাকুত, জবরুত ও লাহুত।

প্রথম, স্থুল বা নাছুত অবস্থায় সাধক সামজিক নিয়ম প্রণালী অনুযায়ী সাধন-ভজন করে। সন্ধ্যা, পূজা, শরিয়ত পালন এ অবস্থার কাজ। দ্বিতীয়, প্রবর্তক বা মালাকুত অবস্থায় সাধক ঘরে ঢুকে মুরশিদের চরণে আশ্রয় নেয়। এই অবস্থায় সাধক মনের মলিনতা পরিষ্কার করে পবিত্র হয়। পাপ হতে দূরে সরে দাঁড়ায়। তৃতীয়, সাধক বা জবরুত অবস্থায় সাধকের পবিত্র হৃদয়ে আধ্যাত্মিক তত্ত্ব বা মারফতি জ্ঞান জেগে ওঠে। দয়ালের প্রতি প্রেম জন্মে। চতুর্থ-সিদ্ধি বা লাহুত অবস্থায় সাধক নির্বাণ বা সাযুজ্য লাভ করে। এই অবস্থায় প্রেমিক সাধক, প্রেমময়ের প্রেমে সমাধি লাভ করে। সাধক জগৎ ভুলে যায়, এমনকি নিজের অস্তিত্ব পর্যন্ত ভুলে একমাত্র প্রেমময়কে ছাড়া আর কিছুই দেখে না, বুঝে না। প্রেমময়ের ধ্যানে এমন অবস্থা হয় যে, শুধু যে খাওয়া-পরার খবর থাকে তা নয়, নিজের ব্যক্তিত্ব পর্যন্ত থাকে না-আকাশে-বাতাসে, জলে-স্থলে, বিশ্বজগতের প্রতি রেণুতে পর্যন্ত একমাত্র প্রেমময়ের সত্তাই দেখে-উপলব্ধি করে! এই অবস্থার কোন তুলনা নেই। এই অবস্থাই এই অবস্থার তুলনা। এই স্তরে সাধক আর প্রেমময়ে পৃথক থাকে না রে-এক হয়ে যায়। ভক্ত জলবিন্দু আর দয়াল মহাসাগর। জলবিন্দু মহাসাগরে মিশে যায়।

উপদেশ-৬৮:  দেখ! মানুষ সৃষ্টির পূর্বেই ধর্ম সৃষ্টি হয়েছে। চক্রে পড়ার আগেই চক্র হতে বের হবার পথ তৈরি করা হয়েছে।

এ জগতে মূল ধর্ম মাত্র একটি। বাংলা ভাষায় তাকে বলে সনাতন ধর্ম, আরবি ভাষায় বলে ইসলাম। সনাতন অর্থ সত্য আর ইসলাম অর্থ শান্তি। সত্য যেখানে, সেখানেই শান্তি, আর শান্তি যেখানে, সেখানেই সত্য। দুটি শব্দেরই মূলগত অর্থ এক।

যখন মানুষ এই মূল ধর্মের মৌলিক নীতি ছেড়ে দিয়ে কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও মূল জিনিস বাদ দিয়ে পথকেই মূল জিনিস মনে করে, শুধু আচারকেই সব মনে করে, তখনই ধর্ম প্রবর্তক বা অবতার। সেই বিকৃত ধর্মকে যুগোপযোগী ও দেশোপযোগী করবার জন্য আসেন।

দেখ! সেই সৃষ্টি হতে আরম্ভ করে দাউদ, সোলেমান, ইশা, মুসা, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, হযরত মোহাম্মদ কত প্রবর্তকই না এসে ধর্মকে রিফাইন করে গেছেন।

হিন্দু ধর্ম, মুসলমান ধর্ম, ইহুদি, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রভৃতি প্রত্যেকটি ধর্মই সেই মূল ধর্ম হতে প্রবর্তিত। মূলধর্ম একটি গাছ আর প্রবর্তিত প্রত্যেকটি ধর্ম এক একটি ডালা।

প্রত্যেক ধর্মেরই মূলগত নীতি এক, কি প্রকারে সত্যে পৌঁছানো যায়, শান্তির ক্রোড়ে বিশ্রাম লওয়া যায়।

উপদেশ-৬৯:  দেখ! যদি শান্তি পেতে চাস তবে তা সংসার করেও পাওয়া যায়। তবে প্রথমেই সৎসঙ্গ করে একটু শক্ত হয়ে নিতে হয়। যদি শান্তিতে ও নিশ্চিন্তে জীবনটা কাটাতে চাস, তবে বৃথা কাজ বাড়াবি না। যা না করলেই নয়, মাত্র তাই করবি।

ওরে! নিস্কামভাবে অর্থাৎ ফলের দিকে লক্ষ্য না করে কাজ করা কঠিন, যদিও মুখে বলা সহজ। মূল তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, একটা উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করা হয়।

বাহাদুরি দেখাবার জন্য অথবা অন্যের উপকার করবে, এই মনে করে অনেকে অনেক কিছুর মেম্বার, প্রেসিডেন্ট হয়ে কাজ বাড়িয়ে ফেলে। দেখ, তাতে অন্যের উপকার হোক বা না হোক, নিজের যে সর্বনাশ হয়, তা ভাববার ফুরসৎ পর্যন্ত নেই।

যাঁর সৃষ্টি সেই রক্ষা করবে, তোদের আর বাহাদুরি দেখাতে হবে না। অন্যের উপকার করবি, অমুক করবি, তমুক করবি, সে সব বাদ দিয়ে, এখন দয়ালকে লাভ করবার চেষ্টা কর। তাঁকে পেলে তখন যা করবার করিস। যতই বৃথা কাজ বাড়াবি, ততই জালের ভিতর গিয়ে পড়বি। তখন বাইরে আসা কঠিন হবে।

যদি দয়ালকে পেতে চাস, শান্তির আশা করিস তবে দয়ালের কাছে, কাজ কমিয়ে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করবি।

কোথায় কাজ কমাবার চেষ্টা করবি- তা না, শুধু বাজে কাজ বাড়িয়ে জীবনটাও বাজে করে ফেলিস। মনে রাখবি, জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য দয়ালকে লাভ করা – শান্তি পাওয়া। বাজে কাজের বাহাদুরির মোহে পড়ে, মনটার আর বাজে খরচ করিস্ না। (চলবে)