দয়ালের উপদেশ – ১৯

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৬৪: শরীরের জন্য যেমন আহারের দরকার, আত্মার পুষ্টির জন্যও তেমনই আহারের দরকার। আত্মার আহার – সৎ চিন্তা, সৎ আলোচনা, উপসনা, জপ, ধ্যান, ধারণা প্রভৃতি।

দেখ! যে যার বেশি চিন্তা করে, তার প্রতিই মনের টান হয়। টান ও ভালোবাসা বৃদ্ধির সাথে সাথে চিন্তাও বেড়ে ওঠে। ফাঁক না দিয়ে ইষ্টকে চিন্তা করার নামই ধ্যান।

সাধারণত এক মিনিট পর্যন্ত ফাঁক না দিয়ে ইষ্টকে চিন্তা করার নাম ধারণা। পাঁচ মিনিট পর্যন্ত এমনি ফাঁক না দিয়ে চিন্তা করার নাম ধ্যান। ধ্যান গাঢ় হলেই সমাধি। কমপক্ষে আধঘন্টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন গভীর চিন্তাধারা প্রবাহিত থাকলে সমাধি হয়।

ধ্যান গাঢ় হওয়ার সাথে সাথেই বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলোর কাজ কমতে থাকে। সমাধি অবস্থায় বাহ্য ইন্দ্রিয়ে খিলি পড়ে। বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলো কোন কাজই করতে পারে না।

সমাধি দুই প্রকার-সবিকল্প ও নির্বিকল্প। যখন পর্যন্ত আমি ও তুমি থাকে তখন সবিকল্প, আর যখন এক হয়ে যায় তখন নির্বিকল্প।

উপদেশ-৬৫: ওরে! স্বর্গ ও নরক, এ দুটি সাধারণ লোকে, দুটি স্থান মনে করে। বাহ্যিকভাবে স্থান মনে করলেও এগুলো কোন স্থান নয়, এগুলো মনের স্তর মাত্র।

যখন দুঃখ, কষ্ট, শোক, অশান্তি ভোগ করে তা-ই নরক। আর যখন সুখভোগ করে, তা-ই স্বর্গ। দেখ, এমন একটা স্তর আছে, যেখানে দুঃখভোগ নেই আবার সুখভোগও নেই। এককথায় সেই স্তরে ভোগ বলে কোন জিনিসই নেই। শুধু শান্তি-পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন, দয়ালের সাথে ভক্তের মিলন। একমাত্র দয়ালের প্রেমিক ছাড়া আর কারও ইহা বুঝবার বা অনুভব করার শক্তি নেই। দয়ালের প্রেমিক স্বর্গ-নরকের বহু উপরে।

ওরে! দয়াল কখনও নিষ্ঠুর হতে পারেন না। মানুষ নিজ নিজ কর্মফলেই স্বর্গ ও নরক ভোগ করে।

পাপে যখন মানুষের মন সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে, দুর্বল চঞ্চল হয়ে পড়ে, তখন আনন্দ উপভোগ করবার স্তরে সে আর থাকে না। জ¦র হলে দুধ পর্যন্ত ভালো লাগে না। সৎ কর্ম দ্বারা মন পবিত্র হলে সবকিছুতেই সে আনন্দ পায়। প্রকৃত স্বাস্থ্যবানের নিকট সবকিছুই ভালো লাগে।

ওরে! জীবাত্মা আর পরমাত্মায় কোন প্রভেদ নেই, মাত্র খন্ড অহংরূপ মোহের আবরণ কল্পনা করে পরমাত্মাই জীবাত্মা হয়েছেন। এই আবরণ তুলে দিলেই এক। সাধন, ভজন যাই করিস শুধু সেই আবরণ তুলবার জন্য।

উপদেশ-৬৬ : নামাজ কাকে বলে? যা দ্বারা মন পবিত্র হয়ে দয়ালকে স্মরণ হয় তা-ই নামাজ। দয়ালকে স্মরণ করাই নামাজের উদ্দেশ্য। মনকে দয়ালের কাছ হতে দূরে রাখলে নামাজের উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। প্রবৃত্তির বিষয়ে উচ্ছৃঙ্খল থেকে শুধু অজু গোছলের পবিত্রতা লয়ে লাফালাফি করে এবং কেবল অঙ্গভঙ্গি দ্বারা নামাজ আদায় হয় না। নামাজ হৃদয়ের জিনিস।

রোজা কাকে বলে? রোজা তিন প্রকারের – নিকৃষ্ট, মধ্যম ও উৎকৃষ্ট। আহার না করা নিকৃষ্ট শ্রেণীর রোজা। ইন্দ্রিয় সংযমী হওয়া, প্রবৃত্তিকে বশে আনা মধ্যম শ্রেণীর রোজা। একমাত্র দয়ালের- প্রেমময়ের চিন্তা ছাড়া অন্য চিন্তা না করা, অর্থাৎ দয়ালে মজনু হয়ে থাকাই প্রকৃত রোজা। জাকাত কাকে বলে? জাকাত অর্থ পবিত্র হওয়া, চক্ষে কু-দর্শন না করা, কানে কু-শ্রবণ না করা, মুখে কু-কথা, মিথ্যা কথা না বলা অর্থাৎ দয়ালের দেয়া জিনিসের অপব্যবহার না করা- সদ্ব্যবহার করাই জাকাত।

হজ্ব কাকে বলে? সৎ হয়ে, পবিত্র হয়ে দয়ালের কাছে যাওয়াই হজ্ব। হজ্বে যাওয়ার পূর্বে সকলের কাছে বিদায় নিতে হয়। তেমনি নিজের সমস্ত কিছু ভুলে দয়ালের সমাধিতে মগ্ন হওয়াই হজ্ব। দয়ালের নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণই হজ¦।

দেখ! দয়ালের প্রেমিকের নিকট সকল স্থানই সমজিদ, সকল দিনই শুক্রবার, সকল মাসই রমজান মাস। (চলবে)