দয়ালের উপদেশ – ১৯

উপদেশ-৬১: আচ্ছা বল দেখি! শরিয়ত কাকে বলে? অর্থ সৎপথ। দেখ! যে হিংসা, নিন্দা করে না, মিথ্যা বলে না, অন্যের ক্ষতি করে না, ইন্দ্রিয়ের অধীন নয়, লোভী নয়, দয়াল ভক্ত-এক কথায় যে সৎ, সে-ই প্রকৃত শরিয়তী। যেখানে শরিয়ত সেখানে বিবাদ নেই, বিসংবাদ নেই, বিচারেরও দরকার পড়ে না. -দলাদলি-ফালাফালি নেই।

দেখ, তুই যদি দাড়ি রেখে, মাথায় টুপি দিয়ে, নামাজ পড়িস, রোজা করিস কিন্তু যদি দলাদলি, হিংসা, টুরি, লোভ, নিন্দা করিস, মিথ্যা কথা বলিস, তবে তোর শরিয়তী কোথায়’রে! তুই একজন বড় শরিয়তী বলে লম্বা লম্বা কথা বলিস। আচ্ছা জিজ্ঞেস করি, তোর নামে এত মামলা কেন? তোর আমার দল কেন? অমুকের উন্নতিতে, হিংসায় তোর পেট ফেটে যেতে চায় কেন?

বাজারে বেশ্যাদের দেখছিস না কেমন শক্ত বেড়া দিয়ে আব্রু তৈরি করে। কিন্তু সেই বেড়ার ভেতর নরকের খেলা। তেমনি যদি বাহ্যিকভাবে সাধু হস, শরিয়তী হস, তবে বেশ্যাদের চেয়ে আর বেশি ভালো কিসে?

উপদেশ-৬২: খাওয়ানোতে একটা পুণ্য আছে। কোন কিছুতেই ‘না’ নেই, কিন্তু খাওয়ায় ‘না’ আছে। দেখ! যাকে খাওয়াবি, এই খাওয়ার ফলে তার যে শক্তি হয়, সেই শক্তি দ্বারা সে যে কাজ করে, তার ফলের ভাগী তুইও হবি। যদি সৎ কাজ করে, তারও ভাগী হবি। তাই সাধু, মহাপুরুষ, অলি-আওলিয়া, দরবেশদের দেখা পেলে খাওয়াবার চেষ্টা করতে হয়।

তবে কি ক্ষুধায় কাতর অপরিচিত লোককে খাওয়াবি না? নিশ্চয় খাওয়াবি। তবে একটা ভাব নিয়ে। মনে করবি, এই লোকটির ভেতর দিয়ে তোর দয়ালকে খাওয়াচ্ছিস! দেখ! জামাই যদি আসে, তখন কত বাজার খরচ? বড় মাছ, দুধ, দই আনিস কিন্তু অতিথিরূপে তোর দয়ালকে খাওয়াবার সময় কি করিস ? ফলও তেমনি হয়। খাওয়াবার সময় যখনই দয়ালকে খাওয়াচ্ছিস্ মনে না করবি, তখনই যাকে খাওয়াবি তার কৃতকর্মের ফল, সে ভালোই হোক আর মন্দই হোক-অংশী হবি।

যারা বেশি খায়, তাদের আয়ু কম হয় প্রায়ই বেশি খানেওয়ালা গরিব হয়। যারা বেশি মেহনতের কাজ করে, তারা হয়তো কিছু বেশি খায়, তাই বলে কি দুই-তিন জনের খাদ্য খাবে?

বেশি খানেওয়ালা কখনও দয়াল ভক্ত হতে পারে না, তাদের কাম, ক্রোধ, লোভ এগুলো বেশি হয়। বেশি খেলে সমস্ত শক্তি হজম করতেই চলে যায়, -আলস্য হয়, সাধন-ভজন কি প্রকারে হবে?

বেশি উপবাস থাকাও উচিত নয়। পেট যদি চো চো করে, তখন ভালো-মন্দ জ্ঞান থাকে না, অল্পতেই তেতে ওঠে, দয়ালের চিন্তা করবে কি?

উপদেশ-৬৩: স্বজাতি, স্বজাতিকেই আকর্ষণ করে। গাঁজাখোর আর এক গাঁজাখোরকে দেখলে কেমন আনন্দ করে! দয়ালভক্ত, আর এক দয়ালভক্তকে দেখলে আপন মনে করে,- আনন্দ পায়।

কোথায়ও দয়ালের আলোচনা হচ্ছে, সেখানে যদি কোন সংসারী, বদ্ধ-জীব যায়, তার একটুও ভালো লাগবে না। হয়তো ঘুমিয়েই পড়বে, নয়তো একটা ছুতা ধরে চলে আসবে। কারণ সে যে সেখানে একটুও আনন্দ পায় না। আবার যদি কোন ত্যাগী ভক্ত, কোন কারণে বদ্ধ সংসারী লোকের সংস্পর্শে আসে, তবে তার নিকট নরকবৎ মনে হয়।

এক ভক্ত, আর এক ভক্তের আপদে-বিপদে সাহায্য করতে ছুটে আসে। গাঁজাখোর হয়তো নিজের ভাইকে দু’পয়সা দিয়ে সাহায্য করবে না, আবার অন্য এক গাঁজাখোরকে দশ টাকা দিয়ে দেবে।

এক রাজার অতি প্রিয় একটি তোতাপাখি ছিল। একবার বিদেশে যাওয়ার সময় রাজা তোতাকে বলল, ‘তোমার যদি কোন কিছু বলবার থাকে তবে বল।’ তোতা বলল ‘অমুক দেশে অমুক বনে আমার স্বজাতিরা বাস করে, তাদের নিকট বলবেন যে, আমি সোনার খাঁচায় আপনার বাড়িতে আছি।’

বহুদিন ঘুরতে ঘুরতে রাজা সেই বনে তোতার স্বজাতিদের দেখতে পেলেন এবং বললেন, ‘তোমাদের এক ভাই, আমার বাড়িতে সোনার খাঁচায় আছে। তোমাদের এ সংবাদ বলতে বলেছে।’ একথা শুনা মাত্রই সর্দার তোতাটি গাছ হতে পড়ে মরে গেল। অন্য তোতাগুলোও এক এক করে পড়ে মরে গেল। রাজা আশ্চর্য হয়ে, বাড়ি ফিরে এসে তোতাকে সে কথা জানালেন। তোতা সে কথা শুনেই পড়ে মরে গেল। রাজা অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। চাকরকে মৃত পাখিটাকে ফেলে দিতে বললেন। খাঁচা হতে খুলে ফেলে দেয়ার সাথে সাথে তোতা জীবিত হয়ে বনের দিকে উড়ে চলল। রাজাকে ডেকে বলল, ‘আমি বদ্ধ ছিলাম, এই সংবাদ আমার স্বজাতিরা জানতে পেরেই মুক্তির পথ আপনাকে দিয়েই ইঙ্গিতে পাঠিয়ে দিল।’ ‘জীবিত থাকতেই মরতে হবে।’

দেখ, যখনই কেউ তাঁকে পাওয়ার জন্য সাধন, ভজন করে বা তাঁর জন্য কাঁদে তখনই সমস্ত সাধকের-ভক্তের মহাপুরুষদের আর্কষণ তার উপর এসে পড়ে, আশীর্বাদ আসতে থাকে। (চলবে)