দয়ালের উপদেশ – ১৭

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৫৫: ভোগীর কাছে প্রথমে ত্যাগের কথা বললে, তোর উপর রাগই শুধু হবে না টিটকারিও কিছু দেবে। সংসারে দুঃখে-কষ্টে, রোগে-শোক, অশান্তিতে একবারে অস্থির হয়ে পড়ে, তবুও ভোগের ইচ্ছা ছাড়তে চায় না। ভোগে কি তৃপ্তি আছে রে, না তার শেষ আছে? উট কাঁটাযুক্ত ঘাস খায়, মুখ হতে রক্ত পড়ে কিন্তু ক্ষান্ত দিতে চায় না।

দেখ, পিতা হয়তো চিরজীব, ভোগ করেও দেখল ভোগে সুখ নেই, শান্তি নেই, শুধু অশান্তি-দুঃখ, কষ্ট, তবুও ছেলেকে অল্প বয়সেই বিবাহ দিয়ে সংসারে ঢুকিয়ে ভোগের রাস্তা খুলে দিল। বিবেক জন্মবার জ্ঞান হবার সময় পর্যন্ত দিল না। বিবেক নিয়ে, জ্ঞান নিয়ে ভোগ করলে তবে ত্যাগ আসে। আর ত্যাগ না আসা পর্যন্ত শান্তির আশা করা যায় না। সংসারে থেকেই মনে ত্যাগ আনতে হবে।

রামসুন্দরবাবু একজন অত্যাচারী নায়েব। এক বয়স্ক বিধবার নিকট হতে খাজনা বাবদ কিছু বেশি টাকাই আদায় করলেন। ভয়ে বিধবাটি তখন বেশি কোন কথা বলেনি। একদিন ঘরে বসেই অন্য একজনের নিকট জোরে জোরে বলছে, ‘রামা গোলামের জ¦ালায়, এ দেশে আর থাকবার জোঁ নেই।’ ঠিক সে সময়েই ঘরের পাশ দিয়ে রামসুন্দরবাবু যাচ্ছিলেন! তিনি শুনে চিৎকার করে বললেন, ‘তুই কি বললি শালী।’ বিধবাটি বলল, ‘না বাবু, আমি বলি, রামসুন্দরবাবু থাকাতেই আমি এদেশে আছি। তিনি দয়ার মানুষ, না হলে কবেই এদেশ থেকে চলে যেতে হতো।’ রামসুন্দরবাবু এত অত্যাচারী তবুও তাকে ভালোই বলতে হবে।

ভোগে এত দুঃখ আনে তবুও ইহা ছাড়াবার ইচ্ছা হয় না, বরং ভালোই লাগে, ভালোই বলে। ভোগেই ত্যাগ আনে ঠিক কথা, কিন্তু বিবেক দিয়ে, জ্ঞান নিয়ে ভোগ করলে, নতুবা নয়।

উপদেশ-৫৬: দেখ! স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাই, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন কেউই তোকে চায় না। চায় শুধু তোর কাজ করার ক্ষমতা-উপার্জিত অর্থ। একমাত্র দয়াল সৎগুরু শুধু তোকে চায়, তোর উপার্জিত কোন কিছুই চায় না। তুই যাদের আপন মনে করিস, বাস্তবিকই তারা তোর আপন কি-না চিন্তা করে দেখ। পাপের ফলে যখন রোগ হয়, সে রোগের ভাগী তো কেউ হয় না।

এক গৃহস্থের তিন বন্ধু ছিল। প্রথম বন্ধুর সাথেই প্রায় সব সময় থাকতেন। দ্বিতীয় বন্ধুর সাথে প্রায় সময়ই দেখা হতো,-খুব খাতির। তৃতীয় বন্ধুর সাথে ছয় মাস, বছরে একবার দেখা হতো। দেখা হলেই এই বন্ধু অনেক উপদেশ দিতেন।

কয়দিন পর হঠাৎ ঋণের দায়ে, পুলিশ এসে গৃহস্থকে জেলে নিয়ে চলল। সাহায্যের আশায় প্রথম বন্ধুর নিকট গেলেন। কিন্তু বন্ধু দেখাই দিল না, ঘরের ভেতর লুকিয়ে রইল। দ্বিতীয় বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন। দ্বিতীয় বন্ধু বলল, ‘আমার কোন ক্ষমতা নেই তোকে সাহায্য করি। তোকে ভালোবাসি তাই, জেলখানার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’ গৃহস্থ চিন্তা করতে লাগল, যাদের সাথে দিনরাত দেখা হয়, সেই বন্ধুরাই যখন সাহায্য করতে অপারগ, তখন তৃতীয় বন্ধুর কাছে গিয়ে আর লাভ কি? তবুও যাবে বলে সে অগ্রসর হলো। তৃতীয় বন্ধু দৌড়ে এসে দেখা করে বলল, ‘তোর কোন ভয় নেই। আমার সম্পত্তি আছে, আমি আছি। আমার সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ শোধ করব। যদি না কুলায়, তোর ঋণের দায় নিজের উপর নিয়ে, আমি জেলে যাব, তোকে মুক্ত করবই।’ দেখ, প্রথম বন্ধু মানে-টাকা-পয়সা, জায়গা-সম্পত্তি, মৃত্যুর সময় এগুলো কোন কাজেই আসে না – দূরে পড়ে থাকে। দ্বিতীয় বন্ধু মানে – স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাই, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন প্রভৃতি শ্মশান ঘাট বা সমাধিক্ষেত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে। আর তৃতীয় বন্ধু – দয়াল- প্রেমময় গুরু।

উপদেশ-৫৭: কয়েকজন একত্র হয়েছিস, কোথায় ধর্ম আলাপ, আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের জীবনী আলোচনা করবি, তা না শুধু বাজে আলাপ, আর পরনিন্দা। ওরে! বাজে আলাপে মন অত্যন্ত মলিন ও নিস্তেজ হয়ে যায়। পরনিন্দা ত্যাগ কর। নিন্দা দ্বারা নিজের চিত্তই যে শুধু মলিন হয়, তা নয়-পরের পাপ নিজের উপর আকর্ষণ করাও হয়। নিজে পাপ না করেও নিন্দার ফলে অন্যের পাপের ভাগী হতে হয়।

এক রাজার কুষ্ঠ রোগ। কোন কিছুতেই আর সারে না। এক মহাপুরুষকে ধরলেন। মহাপুরুষ বললেন, ‘খুব বেশি পাপ না করলে কুষ্ঠ রোগ হয় না। এক কাজ কর, একটি পৃথক বাড়িতে ছয় মাসের খোরাক ও তোর বয়স্কা মেয়েকে সেবার জন্য সঙ্গে নিয়ে বাস কর। অন্য কেউ যেন সে বাড়িতে না যেতে পারে। ছয় মাস পর আমি যাব।’

রাজা সেইমতো কাজ করলেন। এক মাস পরেই রানীর মন কচ্ কচ্ করতে লাগল। তিনি দাসীদের সাথে বলাবলি করতে লাগলেন, ‘উপযুক্তা মেয়ে, না জানি কি?’ ক্রমে দেশের লোক রাজাকে নিন্দা করতে লাগল,- ‘যার স্বভাব এত খারাপ, তার কুষ্ঠ হবে না তো কার কুষ্ঠ হবে ?’ ছয় মাস পর মহাপুরুষ এসে উপস্থিত। রাজা সেই বাড়ি হতে বের হয়ে আসলেন-দিব্যি চেহারা-কুষ্ঠের চিহ্নও নেই।

রাজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রভু! এ কেমন করে হলো? মহাপুরুষ বললেন, ‘তোর স্বভাব ভালো ছিল, কিন্তু লোকের মিথ্যা সন্দেহ, তোর নিন্দা করে সমস্ত পাপ নিয়ে গেছে। এখন তুই পাপমুক্ত, তাই কুষ্ঠ রোগও নেই।’

দেখ! যার নিন্দা করবি তার পদানত না হওয়া পর্যন্ত নিস্তার নেই। পর নিন্দায় অল্প সময়ে, কম মেহনতে পাপ সংগ্রহের বড় পথ। (চলবে)